সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্যালেস্টাইনপন্থি সংগঠন নিষিদ্ধে টিউলিপ সিদ্দিকের ভোট: সমর্থনে সমালোচনা ও বিতর্ক

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০২:১৫:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫
  • / ১৮৪ Time View

image 202683 1751868830

image 202683 1751868830

 

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে বিতর্কিত এক প্রস্তাবে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নামের একটি ফিলিস্তিনপন্থি সংগঠনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগকে ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক, বিশেষত মানবাধিকার সংগঠন ও প্রগতিশীল রাজনীতিকদের মধ্যে।

বুধবার (২ জুলাই) অনুষ্ঠিত এ ভোটে ৩৮৫ জন সংসদ সদস্য প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন, বিপক্ষে ভোট দেন মাত্র ২৬ জন। মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত কিছু এমপি—including টিউলিপ সিদ্দিক—এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম এমপি ভোটে অংশ নেননি। ব্রিটিশ ইসলামপন্থি সংবাদমাধ্যম ফাইভ পিলারস বলছে, মুসলিম সমাজে এ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।

কেন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতেপ্যালেস্টাইন অ্যাকশন’?

২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ সংগঠনটি মূলত যুক্তরাজ্যে অবস্থিত ইসরায়েলি অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানি এলবিট সিস্টেমসসহ যুদ্ধসম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরব রয়েছে। এরা বিভিন্ন সময় রাসায়নিক রঙ ছিটিয়ে বা ভবনের ছাদে উঠে প্রতিবাদ জানিয়েছে। গত মাসেই সংগঠনটি একটি সামরিক ঘাঁটিতে ঢুকে দুটি বিমানে লাল রঙ ছিটিয়ে ‘গাজা গণহত্যার’ প্রতিবাদ জানিয়েছিল। এসব কর্মকাণ্ডে ব্রিটিশ সরকারের দাবি অনুযায়ী কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতি হয়েছে।

এই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার ফলে এখন থেকে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ সংগঠনটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বা সমর্থন প্রকাশ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে—আল-কায়েদা কিংবা আইএসের মতোই আইনি অবস্থানে চলে গেছে এই সংগঠনটি। মানবাধিকারকর্মীরা একে “চরম মাত্রার সিদ্ধান্ত” বলেই আখ্যা দিয়েছেন।

সমালোচনার ঝড়

সংসদের স্বাধীন এমপি জারা সুলতানা এই নিষেধাজ্ঞাকে ভীষণভাবে সমালোচনা করে বলেন,

“একটি স্প্রে ক্যানকে আত্মঘাতী বোমার সঙ্গে তুলনা করা কেবল হাস্যকরই নয়, বরং এটি আইনকে বিকৃত করার নিকৃষ্ট উদাহরণ।”

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইউকের প্রধান নির্বাহী সাচা দেশমুখ বলেন,

“এটি ব্রিটিশ আইনের নজিরবিহীন অপব্যবহার। সরকার এখন এই ক্ষমতা ব্যবহার করে যাকে ইচ্ছা তাকে গ্রেপ্তার করতে, নজরদারিতে রাখতে ও বাকস্বাধীনতা দমন করতে পারবে।”

জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের নিযুক্ত বিশেষজ্ঞরাও যুক্তরাজ্য সরকারকে এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে,

“যেখানে কোনো প্রাণহানির উদ্দেশ্য নেই, কেবল সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছে, তাকে সন্ত্রাসবাদ বলা আইনসঙ্গত নয়।”

সরকারের অবস্থান

ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াভেট কুপার এ প্রস্তাবের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন,

“জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করতে হবে। সহিংসতা ও অপরাধমূলক ক্ষতিসাধনের কোনো জায়গা বৈধ প্রতিবাদের মধ্যে থাকতে পারে না।”

তবে সমালোচকরা বলছেন, এই বক্তব্য ব্রিটিশ সরকারের ‘ইসরায়েলপন্থী’ অবস্থানকে লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।

সংসদে ভোট নিয়ে জটিলতা

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংসদীয় কৌশলগত জটিলতার কারণে অনেক এমপি এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেননি। তিনটি আলাদা সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার একটি যৌথ প্রস্তাব ছিল এটি। এর একটি অংশের বিপক্ষে ভোট দিলে পুরো প্রস্তাবই বাতিল হয়ে যেত। ফলে বিরোধিতা সত্ত্বেও অনেকেই নিরুপায়ভাবে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের প্রতিক্রিয়া

এই সিদ্ধান্তকে অন্যায় ও রাজনৈতিক দমনমূলক পদক্ষেপ আখ্যা দিয়ে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ সংগঠনটি ইতোমধ্যে আইনি লড়াই শুরু করেছে। তারা বলছে,

“সরকার অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মুনাফাবাজ কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে মতপ্রকাশের অধিকার দমিয়ে দিচ্ছে।”

তাদের কর্মীরা বর্তমানে ব্রিস্টলে এলবিট সাইটের প্রবেশপথ অবরোধ করে রেখেছে এবং সাফোকের একটি ভবনের ছাদ দখলে রেখেছে—যার মাধ্যমে তারা এ নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

এই পরিস্থিতি যুক্তরাজ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, ও ফিলিস্তিন সংহতির মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। টিউলিপ সিদ্দিকের অবস্থান বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, কারণ তিনি একজন মুসলিম পটভূমি থেকে উঠে আসা এমপি হিসেবে পরিচিত। তাঁর ভোটের এই সিদ্ধান্ত শুধু মুসলিম ভোটারদের নয়, বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যেও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—একটি রঙ ছিটানো প্রতিবাদ কি সত্যিই ‘সন্ত্রাসবাদ’?

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

প্যালেস্টাইনপন্থি সংগঠন নিষিদ্ধে টিউলিপ সিদ্দিকের ভোট: সমর্থনে সমালোচনা ও বিতর্ক

Update Time : ০২:১৫:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫

image 202683 1751868830

 

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে বিতর্কিত এক প্রস্তাবে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নামের একটি ফিলিস্তিনপন্থি সংগঠনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগকে ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক, বিশেষত মানবাধিকার সংগঠন ও প্রগতিশীল রাজনীতিকদের মধ্যে।

বুধবার (২ জুলাই) অনুষ্ঠিত এ ভোটে ৩৮৫ জন সংসদ সদস্য প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন, বিপক্ষে ভোট দেন মাত্র ২৬ জন। মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত কিছু এমপি—including টিউলিপ সিদ্দিক—এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম এমপি ভোটে অংশ নেননি। ব্রিটিশ ইসলামপন্থি সংবাদমাধ্যম ফাইভ পিলারস বলছে, মুসলিম সমাজে এ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।

কেন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতেপ্যালেস্টাইন অ্যাকশন’?

২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ সংগঠনটি মূলত যুক্তরাজ্যে অবস্থিত ইসরায়েলি অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানি এলবিট সিস্টেমসসহ যুদ্ধসম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরব রয়েছে। এরা বিভিন্ন সময় রাসায়নিক রঙ ছিটিয়ে বা ভবনের ছাদে উঠে প্রতিবাদ জানিয়েছে। গত মাসেই সংগঠনটি একটি সামরিক ঘাঁটিতে ঢুকে দুটি বিমানে লাল রঙ ছিটিয়ে ‘গাজা গণহত্যার’ প্রতিবাদ জানিয়েছিল। এসব কর্মকাণ্ডে ব্রিটিশ সরকারের দাবি অনুযায়ী কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতি হয়েছে।

এই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার ফলে এখন থেকে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ সংগঠনটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বা সমর্থন প্রকাশ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে—আল-কায়েদা কিংবা আইএসের মতোই আইনি অবস্থানে চলে গেছে এই সংগঠনটি। মানবাধিকারকর্মীরা একে “চরম মাত্রার সিদ্ধান্ত” বলেই আখ্যা দিয়েছেন।

সমালোচনার ঝড়

সংসদের স্বাধীন এমপি জারা সুলতানা এই নিষেধাজ্ঞাকে ভীষণভাবে সমালোচনা করে বলেন,

“একটি স্প্রে ক্যানকে আত্মঘাতী বোমার সঙ্গে তুলনা করা কেবল হাস্যকরই নয়, বরং এটি আইনকে বিকৃত করার নিকৃষ্ট উদাহরণ।”

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইউকের প্রধান নির্বাহী সাচা দেশমুখ বলেন,

“এটি ব্রিটিশ আইনের নজিরবিহীন অপব্যবহার। সরকার এখন এই ক্ষমতা ব্যবহার করে যাকে ইচ্ছা তাকে গ্রেপ্তার করতে, নজরদারিতে রাখতে ও বাকস্বাধীনতা দমন করতে পারবে।”

জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের নিযুক্ত বিশেষজ্ঞরাও যুক্তরাজ্য সরকারকে এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে,

“যেখানে কোনো প্রাণহানির উদ্দেশ্য নেই, কেবল সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছে, তাকে সন্ত্রাসবাদ বলা আইনসঙ্গত নয়।”

সরকারের অবস্থান

ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াভেট কুপার এ প্রস্তাবের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন,

“জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করতে হবে। সহিংসতা ও অপরাধমূলক ক্ষতিসাধনের কোনো জায়গা বৈধ প্রতিবাদের মধ্যে থাকতে পারে না।”

তবে সমালোচকরা বলছেন, এই বক্তব্য ব্রিটিশ সরকারের ‘ইসরায়েলপন্থী’ অবস্থানকে লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।

সংসদে ভোট নিয়ে জটিলতা

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংসদীয় কৌশলগত জটিলতার কারণে অনেক এমপি এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেননি। তিনটি আলাদা সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার একটি যৌথ প্রস্তাব ছিল এটি। এর একটি অংশের বিপক্ষে ভোট দিলে পুরো প্রস্তাবই বাতিল হয়ে যেত। ফলে বিরোধিতা সত্ত্বেও অনেকেই নিরুপায়ভাবে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের প্রতিক্রিয়া

এই সিদ্ধান্তকে অন্যায় ও রাজনৈতিক দমনমূলক পদক্ষেপ আখ্যা দিয়ে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ সংগঠনটি ইতোমধ্যে আইনি লড়াই শুরু করেছে। তারা বলছে,

“সরকার অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মুনাফাবাজ কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে মতপ্রকাশের অধিকার দমিয়ে দিচ্ছে।”

তাদের কর্মীরা বর্তমানে ব্রিস্টলে এলবিট সাইটের প্রবেশপথ অবরোধ করে রেখেছে এবং সাফোকের একটি ভবনের ছাদ দখলে রেখেছে—যার মাধ্যমে তারা এ নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

এই পরিস্থিতি যুক্তরাজ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, ও ফিলিস্তিন সংহতির মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। টিউলিপ সিদ্দিকের অবস্থান বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, কারণ তিনি একজন মুসলিম পটভূমি থেকে উঠে আসা এমপি হিসেবে পরিচিত। তাঁর ভোটের এই সিদ্ধান্ত শুধু মুসলিম ভোটারদের নয়, বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যেও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—একটি রঙ ছিটানো প্রতিবাদ কি সত্যিই ‘সন্ত্রাসবাদ’?