জুলাই গণহত্যা মামলা: শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশ ১০ জুলাই
- Update Time : ০৩:১১:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫
- / ২১৫ Time View

জুলাই গণহত্যা মামলা: শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশ ১০ জুলাই
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নজরকাড়া অগ্রগতি
২০০৯ সালের পরে আবারও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে একটি আলোচিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা—জুলাই-আগস্ট গণহত্যা মামলা। এই মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়াও অভিযুক্ত রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
অভিযোগ গঠনের আদেশ: ১০ জুলাই
সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ মামলার অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশ ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন আগামী ১০ জুলাই। আদালতে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন শুনানি করেন।
পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে বিজ্ঞপ্তি ও পরোয়ানা
মামলার অন্যতম দুই আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান বর্তমানে পলাতক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। তাদের অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ পরিচালনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গত ১৬ জুন, ট্রাইব্যুনাল থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়, আসামিদেরকে হাজির করার জন্য দেশের দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। ২৪ জুন শুনানির দিনে দেখা যায়, শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান কেউই ট্রাইব্যুনালে হাজির হননি। এরপরে ১৭ জুন, তাদের নামে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে আনুষ্ঠানিক নোটিশ জারি করা হয়।
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৭ দিনের মধ্যে তারা আদালতে না এলে আইন অনুযায়ী অনুপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম চালানোর অনুমতি রয়েছে। আরেক আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন অবশ্য আদালতে হাজির ছিলেন এবং তার পক্ষে নিয়মিত আইনজীবীরা শুনানিতে অংশ নেন।
পূর্বের আদেশ ও অভিযোগ
২০২৫ সালের ১ জুন, শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং চৌধুরী মামুনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ৫টি পৃথক অভিযোগ আমলে নেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে নতুন করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয় শেখ হাসিনা ও কামালের বিরুদ্ধে।
মামলার শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ছাড়াও প্রসিকিউটর আব্দুস সোবহান তরফদার ও মিজানুল ইসলাম অভিযোগগুলো পড়ে শোনান, যা সরাসরি জাতীয় টেলিভিশন ও অনলাইন মাধ্যমে সম্প্রচারিত হয়।
অভিযোগের সারসংক্ষেপ
মূল অভিযোগ অনুসারে, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র ও নাগরিক আন্দোলনের সময় নিরস্ত্র জনগণের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়। শেখ হাসিনাকে এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার নেতৃত্বে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ছাত্র সংগঠন, এবং সাধারণ নাগরিকদের টার্গেট করে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালায়, যার ফলে আনুমানিক ১,৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয় এবং সহস্রাধিক আহত হন।
তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া
২০২৫ সালের ১২ মে, তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়, যেখানে তাকে মূল অপরাধীরূপে চিহ্নিত করা হয়। এর আগে, ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল সময়সীমা নির্ধারণ করে ২০ এপ্রিলের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়।
এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যম, প্রত্যক্ষদর্শী এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট এবং ভিডিও ফুটেজও প্রমাণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
অতীত নির্দেশনা ও মামলার বিস্তার
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর, শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ মোট ৪৬ জন আওয়ামী লীগ নেতা ও পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুটি মামলায় তদন্ত শেষ করতে দুই মাসের সময় দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। এই মামলাগুলোর প্রেক্ষাপটে বর্তমান মামলাটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও জনমত
এই মামলাকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। বিরোধী দলগুলো বলছে, এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত, যেখানে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ দাবি করছে, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের ফসল, যা শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রণোদিত।
শেখ হাসিনার মতো দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযোগ গঠন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আগামী ১০ জুলাই আদালতের আদেশের পরপরই জানা যাবে, মামলাটি কীভাবে এগোবে এবং কী পরিণতি অপেক্ষা করছে এই মামলার তিন প্রধান অভিযুক্তের জন্য।
এই মামলার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতা কতটুকু কার্যকরভাবে প্রমাণ করতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।




