সময়: শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যদের বিক্ষোভে পুলিশের জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড, উত্তপ্ত পরিস্থিতি যমুনা চত্বরে

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০২:৫৬:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫
  • / ২১৯ Time View

c0645c029f63a1962e8b3d45efd98cf0 686b742d6cd1f

c0645c029f63a1962e8b3d45efd98cf0 686b742d6cd1f

চাকরিচ্যুত সাবেক বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদস্যদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজধানীর কাকরাইল ও যমুনা সরকারি বাসভবন এলাকায় সোমবার (৭ জুলাই) দুপুরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার ও পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনরত এই চাকরিচ্যুত সদস্যদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে এবং একাধিক সাউন্ড গ্রেনেড (শব্দ বোমা) নিক্ষেপ করে। এতে পুরো এলাকা রীতিমতো থমথমে হয়ে পড়ে।

সকাল থেকেই জমায়েত, তিন দফা দাবি

সকাল থেকেই জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান নিতে শুরু করেন চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যরা। তাদের মূল দাবি ছিল—
১. বিনা বিচারে চাকরিচ্যুতি বাতিল,
২. পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার ও পুনর্বহাল,
৩. পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।

দাবি আদায়ের অংশ হিসেবে বেলা ১১টার দিকে বিক্ষোভকারীরা শাহবাগ থেকে ‘যমুনা’ অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। তাদের ঠেকাতে শুরুতে মৎস্য ভবনের সামনে ব্যারিকেড দেয় পুলিশ। কিন্তু ব্যারিকেড ভেঙে কিংবা পাশ কাটিয়ে তারা কাকরাইল মোড়ে পৌঁছে যান এবং সেখানে বসে পড়েন। এতে যানচলাচল বিঘ্নিত হয়, রাস্তায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

পুলিশের হুঁশিয়ারি, তারপর অভিযান

দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে যমুনা চত্বরে প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবনের সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের মুখোমুখি অবস্থা তৈরি হয়। পুলিশ তাদের দশ মিনিটের সময় দিয়ে জানিয়ে দেয়—এই সময়ের মধ্যে যদি তারা এলাকা না ছাড়েন, তবে ‘আইনানুগ ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে।

তবে বিক্ষোভকারীরা অনড় থাকেন। এরপরই শুরু হয় পুলিশের অভিযান। প্রথমে জলকামান ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হয়। পরে একাধিকবার সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়। এসব শব্দবোমার প্রচণ্ড শব্দে আশপাশের এলাকাগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, পথচারীরা ছুটোছুটি শুরু করেন এবং অনেক অফিস কর্মী নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটেন।

আটক টানটান

উত্তেজনা

ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ। তবে কতজনকে আটক করা হয়েছে, বা তাদের পরিচয় কী, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

বিক্ষোভের নেতৃত্বে থাকা সাবেক এক বিডিআর সদস্য বলেন,

“২০০৯ সালের ঘটনার পর আমাদের অনেককে কোনো বিচার ছাড়াই চাকরিচ্যুত করা হয়। আমরা বারবার সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি—ন্যায়বিচার চাই। আমাদের পরিবার-পরিজন অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছে। সরকার বারবার আমাদের উপেক্ষা করেছে বলেই আজ আমরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছি।”

তারা আরও অভিযোগ করেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা। অনেকেই হতাশায় আত্মহত্যা করেছেন, অনেকে দিনমজুর বা রিকশাচালক হয়ে বেঁচে আছেন।

অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কাকরাইল ও যমুনা এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এলাকা জুড়ে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, গাড়ি তল্লাশি চলছে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে যমুনা সরকারি বাসভবন ও আশপাশে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং উচ্চ পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষই আলোচনায় বসার কথা ঘোষণা করেনি।

প্রেক্ষাপট: ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ বহু মানুষ নিহত হন। এই ঘটনায় ব্যাপক ধরপাকড় ও বিচারের পর অনেক সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়, যাদের অনেকেই অভিযোগ করেন—তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই তারা চাকরি হারান।

চাকরিচ্যুত সেই সদস্যদের একটি অংশ নিয়মিতভাবে সরকারের কাছে পুনর্বহাল ও ন্যায়বিচারের আবেদন জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়া ছিল একপাক্ষিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

সোমবারের বিক্ষোভ ও পুলিশের ব্যবস্থাপনায় আবারও স্পষ্ট হয়েছে—চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এখন বিস্ফোরণের মুখে। তারা দাবি করছেন, “আমরা অপরাধী নই, আমরা বিচার চাই।” অথচ সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সংলাপ বা সমঝোতার ইঙ্গিত নেই। বিষয়টি এখন একটি মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সংলাপ ও গঠনমূলক পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা। যত দ্রুত সম্ভব একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান ছাড়া এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যদের বিক্ষোভে পুলিশের জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড, উত্তপ্ত পরিস্থিতি যমুনা চত্বরে

Update Time : ০২:৫৬:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫

c0645c029f63a1962e8b3d45efd98cf0 686b742d6cd1f

চাকরিচ্যুত সাবেক বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদস্যদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজধানীর কাকরাইল ও যমুনা সরকারি বাসভবন এলাকায় সোমবার (৭ জুলাই) দুপুরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার ও পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনরত এই চাকরিচ্যুত সদস্যদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে এবং একাধিক সাউন্ড গ্রেনেড (শব্দ বোমা) নিক্ষেপ করে। এতে পুরো এলাকা রীতিমতো থমথমে হয়ে পড়ে।

সকাল থেকেই জমায়েত, তিন দফা দাবি

সকাল থেকেই জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান নিতে শুরু করেন চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যরা। তাদের মূল দাবি ছিল—
১. বিনা বিচারে চাকরিচ্যুতি বাতিল,
২. পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার ও পুনর্বহাল,
৩. পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।

দাবি আদায়ের অংশ হিসেবে বেলা ১১টার দিকে বিক্ষোভকারীরা শাহবাগ থেকে ‘যমুনা’ অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। তাদের ঠেকাতে শুরুতে মৎস্য ভবনের সামনে ব্যারিকেড দেয় পুলিশ। কিন্তু ব্যারিকেড ভেঙে কিংবা পাশ কাটিয়ে তারা কাকরাইল মোড়ে পৌঁছে যান এবং সেখানে বসে পড়েন। এতে যানচলাচল বিঘ্নিত হয়, রাস্তায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

পুলিশের হুঁশিয়ারি, তারপর অভিযান

দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে যমুনা চত্বরে প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবনের সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের মুখোমুখি অবস্থা তৈরি হয়। পুলিশ তাদের দশ মিনিটের সময় দিয়ে জানিয়ে দেয়—এই সময়ের মধ্যে যদি তারা এলাকা না ছাড়েন, তবে ‘আইনানুগ ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে।

তবে বিক্ষোভকারীরা অনড় থাকেন। এরপরই শুরু হয় পুলিশের অভিযান। প্রথমে জলকামান ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হয়। পরে একাধিকবার সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়। এসব শব্দবোমার প্রচণ্ড শব্দে আশপাশের এলাকাগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, পথচারীরা ছুটোছুটি শুরু করেন এবং অনেক অফিস কর্মী নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটেন।

আটক

টানটান উত্তেজনা

ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ। তবে কতজনকে আটক করা হয়েছে, বা তাদের পরিচয় কী, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

বিক্ষোভের নেতৃত্বে থাকা সাবেক এক বিডিআর সদস্য বলেন,

“২০০৯ সালের ঘটনার পর আমাদের অনেককে কোনো বিচার ছাড়াই চাকরিচ্যুত করা হয়। আমরা বারবার সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি—ন্যায়বিচার চাই। আমাদের পরিবার-পরিজন অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছে। সরকার বারবার আমাদের উপেক্ষা করেছে বলেই আজ আমরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছি।”

তারা আরও অভিযোগ করেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা। অনেকেই হতাশায় আত্মহত্যা করেছেন, অনেকে দিনমজুর বা রিকশাচালক হয়ে বেঁচে আছেন।

অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কাকরাইল ও যমুনা এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এলাকা জুড়ে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, গাড়ি তল্লাশি চলছে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে যমুনা সরকারি বাসভবন ও আশপাশে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং উচ্চ পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষই আলোচনায় বসার কথা ঘোষণা করেনি।

প্রেক্ষাপট: ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ বহু মানুষ নিহত হন। এই ঘটনায় ব্যাপক ধরপাকড় ও বিচারের পর অনেক সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়, যাদের অনেকেই অভিযোগ করেন—তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই তারা চাকরি হারান।

চাকরিচ্যুত সেই সদস্যদের একটি অংশ নিয়মিতভাবে সরকারের কাছে পুনর্বহাল ও ন্যায়বিচারের আবেদন জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়া ছিল একপাক্ষিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

সোমবারের বিক্ষোভ ও পুলিশের ব্যবস্থাপনায় আবারও স্পষ্ট হয়েছে—চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এখন বিস্ফোরণের মুখে। তারা দাবি করছেন, “আমরা অপরাধী নই, আমরা বিচার চাই।” অথচ সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সংলাপ বা সমঝোতার ইঙ্গিত নেই। বিষয়টি এখন একটি মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সংলাপ ও গঠনমূলক পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা। যত দ্রুত সম্ভব একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান ছাড়া এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।