গাজায় ফের ভয়াবহ বিমান হামলা: একদিনেই নিহত অন্তত ৮১ ফিলিস্তিনি, নারী ও শিশুর মৃত্যুতে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ
- Update Time : ১০:৪৬:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫
- / ১৫৯ Time View

ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বর বিমান হামলায় রক্তাক্ত হলো আবারও অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা। গত রোববার (৬ জুলাই) একদিনে ভয়াবহ বোমা বর্ষণে নিহত হয়েছেন অন্তত ৮১ জন ফিলিস্তিনি, যাদের অধিকাংশই নারী, শিশু এবং বেসামরিক নাগরিক। আহত হয়েছেন বহু মানুষ। বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র, ত্রাণ সংগ্রহের লাইনে দাঁড়ানো অসহায়দের ওপরও সরাসরি হামলার অভিযোগ উঠেছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা ইসরায়েলি আগ্রাসনের অংশ হিসেবে রোববার গাজা শহরের শেখ রাদওয়ান, আল-নাসর, শাতি শরণার্থী শিবির, নুসেইরাত, খান ইউনিস, আল-তুফাহ, আল-দারাজসহ অন্তত এক ডজন এলাকায় চালানো হয় একের পর এক বিমান ও ড্রোন হামলা। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান বারবার উপেক্ষা করে নির্বিচারে চালানো এসব হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন শিশুসহ অসংখ্য নিরীহ ফিলিস্তিনি।
রাতের আঁধারে ঘুমন্ত মানুষের ওপর বোমা
আনাদোলু এজেন্সি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গাজা শহরের ঘনবসতিপূর্ণ শেখ রাদওয়ান ও আল-নাসর এলাকায় দুইটি ভবনে যখন পরিবারগুলো ঘুমিয়ে ছিল, তখনই বিমান থেকে বোমা ফেলা হয়। এতে অন্তত ২৫ জন নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণে পুরো ভবন ধসে পড়ে। নিহতদের মধ্যে শিশু ও নারী রয়েছেন।
ত্রাণের লাইনে দাঁড়ানো মানুষের ওপর হামলা
গাজার দক্ষিণে ওয়াদি এলাকায় একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে গোলাবর্ষণে মারা যান ৪ জন এবং আহত হন ২৫ জন। এ সময় তারা খাদ্য সংগ্রহের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। একই দিন খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় দুটি পৃথক ত্রাণ শিবিরে বিমান হামলায় নিহত হন অন্তত ১০ জন, যাদের মধ্যে একজন গর্ভবতী নারীও ছিলেন।
শিশু হত্যার মর্মান্তিক চিত্র
ড্রোন হামলায় নিহতদের মধ্যেও শিশুদের সংখ্যা বেশি। গাজার আল-আলবানী মসজিদের কাছে ড্রোন হামলায় নিহত চারজনের তিনজনই শিশু। নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে এক পরিবারের আট সদস্য এবং আরেক ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন প্রাণ হারান। আল-সাফতাওয়ি এলাকায় একটি বেসামরিক গাড়িতে হামলায় নিহত হন তিন ভাই।
আশ্রয়কেন্দ্রের ওপর সরাসরি হামলা
শেখ রাদওয়ান ও শাতি শরণার্থী শিবিরের আশ্রয়কেন্দ্রের তাবুগুলোর ওপরও বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এতে কয়েকজন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
মানবিক বিপর্যয়, আন্তর্জাতিক নিন্দা
গাজায় চলমান এই হামলা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন খাদ্য, পানি, ওষুধসহ সব ধরনের ন্যূনতম চাহিদার অভাবে মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। আল-জাজিরার বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েলের এসব হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘন করে।
আল-শিফা হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের অনেকেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে এবং হাসপাতালে চিকিৎসার উপযোগী পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই। মরদেহগুলো খণ্ডবিখণ্ড অবস্থায় আসছে, অনেককে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
ইসরায়েলের এই আগ্রাসন ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত অন্তত ৫৭ হাজার ৪০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের এক-তৃতীয়াংশই শিশু।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
বিশ্ব নীরব, গাজা জ্বলছে
মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ এবং বিশ্বের বিভিন্ন শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্র বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও ইসরায়েল তাতে কর্ণপাত করছে না। একের পর এক হামলায় পুরো গাজা যেন মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। খাদ্য, নিরাপত্তা, আশ্রয়—কিছুই নেই।
এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে এখনই বিশ্ববাসীর আরও জোরালো অবস্থান প্রয়োজন—এমনটাই বলছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীরা। কেননা প্রতিদিন যে শিশুরা মারা যাচ্ছে, তারা কোনো রাজনীতি জানে না—তারা শুধু বেঁচে থাকার অধিকার চায়।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, আল জাজিরা, গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।





allah help filistine