গাজায় ইসরাইল সমর্থিত হামাসবিরোধী ‘পপুলার ফোর্সেস’ জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান
- Update Time : ০৯:৪০:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫
- / ১৬৬ Time View

গাজা উপত্যকার রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে ‘পপুলার ফোর্সেস’ নামের এক হামাসবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর আবির্ভাব। এই গোষ্ঠীকে ঘিরে সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো—তাদের সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে ইসরাইলের সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি, যা ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে গভীর বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কারা এই ‘পপুলার ফোর্সেস‘?
প্রায় ১০০ সদস্যের এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন ইয়াসির আবু শাবাব—এক সময়ের কুখ্যাত মাদক চোরাকারবারি এবং ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গাজায় পরিচিত মুখ। তিনি রাফাহ শহরের তারাবিন বেদুঈন গোত্রের সদস্য, তবে গাজাবাসীর কাছে ‘ইসরাইলি এজেন্ট’ ও ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে অধিক পরিচিত। তার প্রতি ক্ষোভ এতটাই তীব্র যে, সামাজিক মাধ্যমে তাকে “গাজার ঘরের শত্রু বিভীষণ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর আগে শাবাব গাজায় হামাস পরিচালিত একটি কারাগারে বন্দি ছিলেন মাদক চোরাচালানের দায়ে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই রহস্যজনকভাবে কারামুক্ত হন তিনি। মুক্তির পর প্রায় দুই মাস গা-ঢাকা দিয়ে ছিলেন এবং এই সময় তার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী গাজায় মানবিক সহায়তার ট্রাক লুট, মাদক চোরাচালান ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ উঠে।
ইসরাইলের ভূমিকা ও স্বীকৃতি
২০২৪ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে তারা গাজায় হামাসবিরোধী এক গোষ্ঠীকে সশস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে। ৬ জুন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরাসরি ঘোষণা দেন—“নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের পরামর্শে গাজায় হামাসবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করেছে ইসরাইল সরকার। এতে আমাদের সেনাদের জীবন রক্ষা পাবে, এতে ক্ষতি কী?” (সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস)।
এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই একে ইসরাইলের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বা ‘বিভক্ত করে শাসন’ নীতির আধুনিক সংস্করণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই গোষ্ঠীকে একদিকে সমর্থন দিয়ে আবার তাদের ‘জঙ্গি’ তকমা দেওয়ার এই দ্বিচারিতা নজিরবিহীন বলেও অনেকে মনে করছেন।
আবু শাবাবের আত্মপক্ষ সমর্থন
ইসরাইলের আর্মি রেডিও ও কান ব্রডকাস্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইয়াসির আবু শাবাব নিজেকে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী নন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা হামাসের অত্যাচার সহ্য করেছি। এখন প্রতিরোধ করা আমাদের দায়িত্ব।”
তবে, একই সঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) সঙ্গে প্রশাসনিক পর্যায়ে সমন্বয় করছি, যদিও কোনো সামরিক সমন্বয় নেই।” শাবাব আরও জানান, তাঁর দল বিভিন্ন উৎস থেকে লজিস্টিক ও আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে, যদিও নির্দিষ্ট করে কোনো উৎসের নাম তিনি বলেননি।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের গাজা বিষয়ক কর্মকর্তা জর্জিওস পেট্রোপোলোস এক সাক্ষাৎকারে তাকে “পূর্ব রাফাহের স্বঘোষিত ক্ষমতার দালাল” হিসেবে অভিহিত করেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাবাবও এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান না করে বলেন, “আমরা ট্রাক নিচ্ছি যাতে আমরা খেতে পারি, বিক্রির জন্য নয়। আমার পরিবার ও প্রতিবেশীদের খাবার দিতেই এসব সহায়তা নিয়েছি।” তবে হামাসের অভিযোগ অনুযায়ী, তারা অনেক বেশি সহায়তা লুট করেছে, যেটি শাবাব অস্বীকার করে বলেছেন, “মাত্র অর্ধ ডজন ট্রাক নিয়েছি।”
হামাসের হুঁশিয়ারি
সম্প্রতি হামাসের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইয়াসির আবু শাবাব ও তাঁর দলের সদস্যদের আত্মসমর্পণের জন্য ১০ দিনের আলটিমেটাম দিয়েছে। আলটিমেটাম অমান্য করলে শাবাব ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে ‘আন্তর্জাতিক বিচার’ ও ‘সামরিক পদক্ষেপ’ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ইঙ্গিত
এই মুহূর্তে গাজা উপত্যকা এক অভূতপূর্ব দ্বৈরথের মঞ্চ হয়ে উঠেছে। একদিকে হামাস, যারা একসময় পুরো গাজায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চালাত, আর অন্যদিকে, ইয়াসির আবু শাবাবের নেতৃত্বাধীন ‘পপুলার ফোর্সেস’—যাদের উত্থান অনেকটাই ইসরাইলের তৈরি করা এক কৌশলগত পাল্টা চাল।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে? হামাস পরবর্তী গাজায় কি ‘পপুলার ফোর্সেস’ সত্যিই প্রভাব বিস্তার করতে পারবে? আর এই সংঘাতের মাঝে যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তারা হলো সাধারণ গাজাবাসী, যারা এখন দুই শক্তির দ্বন্দ্বে আটকে পড়ে ক্ষুধা, সহিংসতা আর অনিশ্চয়তার জীবন কাটাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইয়াসির আবু শাবাবের মতো বিতর্কিত ব্যক্তির উত্থান কেবল গাজার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়, বরং গোটা ফিলিস্তিনি জাতিসত্তার মধ্যে বিভক্তির নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই বিভাজন ইসরাইলের জন্য তাৎক্ষণিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে পুরো অঞ্চলে আরও রক্তপাত, বিশৃঙ্খলা এবং মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিতে পারে।





Iran should end they