‘ওড়না কেড়ে নিয়ে হাত বেঁধে ঝুলিয়ে রাখতো, বলতো—এখন পর্দা ছুটে গেছে।’- গুম কমিশনের দ্বিতীয় প্রতিবেদন
- Update Time : ১০:৫৯:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ জুলাই ২০২৫
- / ২২৬ Time View

ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, শরীরজুড়ে নির্যাতনের দাগ আর গভীর মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে ফিরে এসেছেন শত শত মানুষ। আবার অনেকে আর ফিরেই আসেননি—চিরতরে হারিয়ে গেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে গুম, অপহরণ ও নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ এখন আর কেবল পরিবারের কান্নার ভেতর সীমাবদ্ধ নয়—এগুলো স্থান পেয়েছে গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে।
‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: এ স্ট্রাকচারাল ডায়াগনসিস অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স ইন
এই প্রতিবেদনে যেমন রয়েছে শরীরের ওপর নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা, তেমনি উঠে এসেছে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক নিপীড়নের করুণ চিত্র। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো যে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, তাও তুলে ধরা হয়েছে এই রিপোর্টে। গোপন বন্দিশালায় চালানো ভয়াবহ নির্যাতনের বিবরণ ভুক্তভোগীদের বয়ানে উঠে এসেছে হৃদয়বিদারকভাবে।
২০১৭ সালে অপহৃত হাবিব জানান, ‘গ্রিলের সঙ্গে হাতকড়া পরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখত, যেন বসতে না পারি। পা ফুলে যেত, হাত রক্তাক্ত হতো। টেবিলের ওপর হাত রেখে আঙুলে প্লাস দিয়ে চেপে ধরত, আরেকজন সুচ ঢুকাত।’ মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি ১১৩ দিন ‘গুম’ অবস্থায় ছিলেন।
হাবিবের অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রম নয়। তদন্ত কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই শত শত ভয়াবহ ঘটনার বিবরণ, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আটক ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের ওপর চালানো হয়েছে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
‘গুমের’ নামে ভয়াবহ নির্যাতন
প্রতিবেদনটি জানায়, র্যাব–২ ও সিপিসি–৩ ইউনিটের হেফাজতে ছিল নির্যাতনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ঘূর্ণায়মান চেয়ার, পুলি সিস্টেম এবং সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ। সেখানে বন্দিদের ঝুলিয়ে রাখা হতো, মেঝেতে গড়াগড়ি দিতে বাধ্য করা হতো, বৈদ্যুতিক শক ও ওয়াটারবোর্ডিংয়ের মতো নির্মম পদ্ধতিতে দিনের পর দিন চালানো হতো নির্যাতন।

প্রতিবেদন বলছে, গুমের শিকার অনেককে জনসমক্ষে হাজির করার আগে তাদের শরীর থেকে নির্যাতনের চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করা হতো। কিন্তু তবুও কেউ কেউ স্পষ্ট নির্যাতনের দাগ নিয়েই আদালতে হাজির হতেন। অনেক সময় বিচার বিভাগও এসব চিহ্ন বা অভিযোগ উপেক্ষা করত।
নারীদের ‘বিশেষ শাস্তি’
গুম কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ২৫ বছর বয়সী এক নারীকে পুলিশ অপহরণ করে। তিনি টানা ২৪ দিন নিখোঁজ ছিলেন। পরে গুম কমিশনে তিনি জানান, ‘আমাকে অনেকটা ক্রুসিফাইড করার মতো করে দুই হাত দুই দিকে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখত। আমাদের ওড়না কেড়ে নেয়, আমার গায়ে তখন ওড়না ছিল না। জানালার দিকে মুখ করে ঝুলিয়ে রাখত, ফলে অনেক পুরুষ এসে তাকিয়ে দেখত। এটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না! তারা যেন মজা পেত, বলাবলি করত—“এমন পর্দা করত, এখন সব পর্দা ছুটে গেছে।”’
তিনি আরও জানান, ‘আমার পিরিয়ড হওয়ার তারিখ অনেক দেরিতে ছিল। কিন্তু যে পরিমাণ নির্যাতন করেছে, তাতে আমি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়ি যে সঙ্গে সঙ্গেই পিরিয়ড শুরু হয়ে যায়। তখন আমি ওদের বলি—‘আমার তো প্যাড লাগবে’। এ কথাতেও ওরা হাসাহাসি করে, ঠাট্টা করে।’
শারীরিক নির্যাতনের ভয়াবহতা
প্রতিবেদন জানায়, বন্দিদের ছাদের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে চালানো হতো ভয়ঙ্কর শারীরিক নির্যাতন। সিটিটিসি কর্তৃক ২০২৩ সালে অপহৃত ৪৭ বছর বয়সী এক যুবক, যিনি ১৬ দিন ‘গুম’ ছিলেন, তার অভিজ্ঞতার বিবরণে বলা হয়—নির্যাতনকারীরা বলছিল, ‘এভাবে হবে না। এরে লটকা। টানাইতে হবে।’ তখন একজন এএসআই বলেন, ‘হবে।’ এরপর সে আমার দুই হাতে রশি বেঁধে ফ্যানের হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়। শুধু পায়ের বুড়ো আঙুলটা মেঝেতে ছুঁয়ে থাকত, পুরো শরীর ঝুলে থাকত।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অনেক গুম হওয়া ব্যক্তি নির্যাতনের তীব্রতায় অজ্ঞান হয়ে যেতেন, কেউ কেউ বমি করতেন। আবার কারও কারও অভিজ্ঞতা এমন ছিল—চোখ বাঁধা অবস্থাতেই তারা নিজের শরীরের মাংস পোড়ার গন্ধ পেতেন। নারীরাও এই ভয়ঙ্কর নির্যাতনের বাইরে ছিলেন না। তাদেরও ঝুলিয়ে রাখা হতো, আর বাহিনীর সদস্যরা বিকৃত উল্লাসে অট্টহাসিতে ফেটে পড়তেন।

বাঁশ দিয়ে নির্যাতন (বাঁশডলা)
২০১৭ সালে র্যাব–১০ কর্তৃক ২৭ বছর বয়সী এক যুবককে অপহরণ করা হয়। তিনি টানা ৩৯ দিন ‘গুম’ ছিলেন। সেই সময়কার ভয়ঙ্কর নির্যাতনের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “শোয়ানোর পর আমার এই দুই হাতের উপর দিয়ে আর ঘাড়ের নিচ দিয়ে একটা বাঁশ দিছে। পরে পায়ের নিচ দিয়ে আর রানের নিচ দিয়ে একটা দিছে। আবার রানের উপর দিয়াও একটা দিছে। দেওয়ার পর ওইভাবেই আমাকে কিছুক্ষণ রাখল। পরে বলল, ‘বড় স্যার আসতেছে না।’ কিছুক্ষণ পর সে আসে। আসার পর হঠাৎ করেই বলল, ‘এই উঠ।’ বলার সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল আমি আর দুনিয়ার মধ্যে নাই। এমন যন্ত্রণা আমার দুই হাতের বাহুতে শুরু হইল, আর দুই পায়ের ভেতরেও শুরু হইল… মনে হইতেছিল কেউ আমার হাত আর পায়ের গোশত ছিঁড়ে ফেলতেছে…”

অভিনব পদ্ধতিতে নির্যাতন
২০১৭ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে এক যুবককে অপহরণ করে র্যাব। পরে তাকে বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার জেআইসি (জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার)-তে আটক রাখা হয়। নির্যাতনের বর্ণনায় তিনি জানান, ‘আমার পা বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখে—মাথা নিচে, পা উপরে। তখন আমার গায়ে কোনো পোশাক ছিল না। এরপর দুজন একসঙ্গে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে, সম্ভবত বেতের লাঠি দিয়ে। পরে অসংখ্যবার নির্যাতন করেছে, মারতে মারতে এমন অবস্থায় পৌঁছাই যে, চোখে বাঁধা কাপড়ও খুলে গেছে। নাক–মুখে থাপ্পড়, ঘুষি… পিঠে এত মারছে যে চামড়া ফেটে রক্ত ঝরেছে।’ তিনি ৭২ দিন নিখোঁজ ছিলেন।
নতুন নতুন পদ্ধতিতে নির্যাতন চলত এইসব টর্চার সেলে। প্রায়ই বন্দিদের আঙুলের নখ উপড়ে ফেলা হতো। ২০১৭ সালে র্যাব–১১ কর্তৃক অপহৃত ৫৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তি জানান, ‘পরে জেনেছি তার নাম আলেপ উদ্দিন। সে লাঠি দিয়ে খুব নির্যাতন করত। একদিন আমাকেও অনেক মারল। মারতে মারতে বলছিল, “তাকে ঝুলায় রাখ।” এরপর সেলের গ্রিলের সঙ্গে আমাকে হাতকড়া পরিয়ে ঝুলিয়ে রাখে। অনেক ঘণ্টা এভাবে রাখার পর সহ্য করতে পারছিলাম না। পরে যখন আবার মারল, তখন আমার এক আঙুলের নখ সম্পূর্ণ উঠে যায়।’

একজন ৪৬ বছর বয়সী ভুক্তভোগী, যিনি ৩৯১ দিন গুম ছিলেন, তুলে ধরেন বন্দিশালার ভয়াবহ পরিবেশের বর্ণনা। তিনি বলেন, ‘ঘুমাতে গেলে একজন এসে বলত, “এই ঘুমাইতেছেন ক্যান?” মানে ঘুমাতে দিত না। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে বালিশ–কম্বল সব সরিয়ে ফেলত, শীতের মধ্যেও। খালি পায়ের ওপর বসিয়ে রাখত। আবার হ্যান্ডকাফ পরিয়ে বিছানার পাশে আটকে রাখত। এক হাতে মশা মারতেও পারতাম না—অসহ্য যন্ত্রণা হতো।’
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এসব সেল ছিল অত্যন্ত ছোট ও সংকীর্ণ। টয়লেট ব্যবহারের জন্য নিচু বিল্ট–ইন প্যান বসানো ছিল, কিন্তু মাঝখানে কোনো দেয়াল ছিল না। ফলে বন্দিরা যখন শুয়ে থাকতেন, তখন প্রায়শই শরীর ওই প্যানের ওপর পড়ে থাকত—প্রস্রাব, মল ও ময়লার মধ্যে। আরও ভয়াবহ ছিল, এসব সেলে স্থাপন করা ছিল সিসিটিভি ক্যামেরা। যার মাধ্যমে বন্দিদের প্রতিটি কর্মকাণ্ড, এমনকি ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো পর্যন্ত নজরদারিতে রাখা হতো। ফলে বন্দিদের সম্মানবোধ, গোপনীয়তা ও মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হতো।
‘বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ’
গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর গঠিত হয় গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন—দ্য কমিশন অব এনকোয়ারি অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স। কমিশন বলপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান, তাদের শনাক্তকরণ এবং কোন পরিস্থিতিতে তাঁরা গুম হয়েছিলেন—তা নির্ধারণের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে।
তবে কমিশনের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, বাস্তব পরিস্থিতি কাগজে কলমে পাওয়া তথ্যের চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ ও বিস্তৃত।














