১৯৭৩ সালের পর ডলারের সবচেয়ে বড় পতন: অর্থনৈতিক নেতৃত্ব হারানোর দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র
- Update Time : ০৬:৩৩:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ জুলাই ২০২৫
- / ৩০৯ Time View

১৯৭৩ সালের পর ডলারের সবচেয়ে বড় পতন: অর্থনৈতিক নেতৃত্ব হারানোর দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের বিপর্যয়জনক দরপতন আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ডলারের মান কমেছে ১০ শতাংশেরও বেশি—যা ১৯৭৩ সালের পর সবচেয়ে বড় পতন হিসেবে উল্লেখযোগ্য। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র স্বর্ণমান (Gold Standard) থেকে সরে এসেছিল, কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে গ্রহণ করা আগ্রাসী অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক নীতিই এই সংকটের মূল চালিকাশক্তি।
বিশ্লেষকদের মতে, একতরফা শুল্কনীতি, বাণিজ্যযুদ্ধের হুমকি, চীনের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি, ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, এবং আন্তর্জাতিক জোট ও বাণিজ্য চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক সরে আসা—সবকিছু মিলে বিনিয়োগকারীদের মনে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে অনাস্থা তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে সরকারিভাবে ঋণ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনাও ডলারের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
বিশ্লেষক স্টিভ ইংল্যান্ডারের মতে, “ডলার শক্তিশালী কি না, সেটি মুখ্য নয়। আসল প্রশ্ন হলো, বিশ্ব ডলারের ভূমিকাকে এখন কীভাবে দেখছে।” অর্থাৎ, বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে ডলারের গ্রহণযোগ্যতা, নির্ভরযোগ্যতা ও প্রভাব নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন ঘটেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় ডলার সূচক ছিল এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ চূড়ায়। কিন্তু এরপর থেকেই তার ঘোষিত অর্থনৈতিক নীতি—বিশেষ করে ২ এপ্রিলের ঘোষণায় ইউরোপ, চীন, কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর একাধিক পণ্যে শুল্ক আরোপের ফলে—বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-সম্পর্ক অবনতি হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ডলার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, এবং বিকল্প মুদ্রা ও সম্পদে বিনিয়োগ শুরু করে।
ডলারের এই ধারাবাহিক পতনের ফলে মার্কিন নাগরিকদের জন্য বিদেশ ভ্রমণ ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, পাশাপাশি আমদানি নির্ভর খাতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সাধারণ ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও প্রকট হয়েছে। যদিও দুর্বল ডলার কিছুটা রপ্তানিকারকদের জন্য উপকারী, কারণ এতে আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য সস্তা হয়ে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পায়—তবে সামগ্রিকভাবে এটি অর্থনীতির জন্য আশঙ্কাজনক।
বিশ্ববাজারে এই পতন ডলারের আধিপত্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। গত কয়েক দশক ধরে ডলার বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা উপভোগ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চীন, রাশিয়া, ভারতসহ বেশ কিছু দেশ বিকল্প মুদ্রা ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। চীন-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ইউয়ান ও রুবল ব্যবহার বাড়িয়েছে এবং ব্রিকস জোটের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে একটি বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থাপনার কথা ভাবছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের এই দুর্বলতা একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। এটি কেবল বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় ক্রমশ পরিবর্তনের প্রতিফলন। অনেকেই বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একচেটিয়া আধিপত্যের যুগ শেষ হতে যাচ্ছে এবং বহু-মুদ্রাভিত্তিক একটি নতুন আর্থিক কাঠামোর সূচনা ঘটতে পারে।
এছাড়া, আন্তর্জাতিক অর্থভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফও এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্রুত তার আর্থিক ও কূটনৈতিক নীতিতে পরিবর্তন না আনে, তবে ডলারের পতন আরও গভীর হবে এবং বিশ্বব্যাপী আর্থিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে।
অর্থনীতিবিদরা এখনই সতর্ক করে দিচ্ছেন—যুক্তরাষ্ট্র যদি তার অভ্যন্তরীণ ঋণ সংকট, শুল্ক-যুদ্ধ, এবং বৈদেশিক কূটনীতিতে আস্থার সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়, তবে এই পতন শুধু আর্থিক নয়, বরং ভূরাজনৈতিক অবস্থানেও যুক্তরাষ্ট্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ডলারের এই পতন নিছক মুদ্রাবাজারের সংকট নয়—এটি মার্কিন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি বৈশ্বিক আস্থাহীনতার প্রতিচ্ছবি। ১৯৭৩ সালে স্বর্ণমান থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যেমন একটি যুগান্তকারী ঘটনা ছিল, তেমনি ২০২৫ সালের এই পতনও বিশ্ব অর্থনীতির গতি ও দিক নির্ধারণে একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হয়ে থাকতে পারে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস











