হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর প্রস্তুতি ইরানের, যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ: রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
- Update Time : ১২:৪১:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ জুলাই ২০২৫
- / ১৩৬ Time View

পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক মাইন বসানোর প্রস্তুতি নিয়েছে ইরান, এমন খবর পেয়ে গভীর উদ্বেগে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, গত মাসে ইরানের নৌবাহিনী কিছু জাহাজে সামুদ্রিক মাইন উঠিয়ে রেখেছে, যা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইসরায়েলের সামরিক হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালি অবরোধের পরিকল্পনা করছিল তেহরান।
এই তথ্য দিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তারা জানান, ১৩ জুন ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরই এই গোপন প্রস্তুতির তথ্য পাওয়া যায়। যদিও এসব মাইন এখনো ব্যবহৃত হয়নি, তবুও এমন পদক্ষেপ ইরানের পক্ষ থেকে এ পথটি বন্ধ করার মতো উচ্চমাত্রার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। পরিসংখ্যান বলছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ প্রণালি হয়ে যায়। ফলে এটি বন্ধ হলে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালিটি অবরুদ্ধ না হওয়ার আশ্বাসেই এ স্বস্তি ফিরে এসেছে।
তবে রয়টার্স নিশ্চিত হতে পারেনি, ঠিক কবে ইরান মাইনগুলো বহন করে এবং পরে সেগুলো নামানো হয়েছে কি না। যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে মাইন বোঝাইয়ের বিষয়টি শনাক্ত করেছে—এ সম্পর্কেও বিস্তারিত জানায়নি মার্কিন দুই কর্মকর্তা। ধারণা করা হচ্ছে, স্যাটেলাইট চিত্র অথবা মানব গোয়েন্দার মাধ্যমে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামক সামরিক অভিযান চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানি পার্লামেন্ট হরমুজ প্রণালি বন্ধের বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাশ করে, যদিও তা ছিল প্রতীকী এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, “প্রেসিডেন্টের (ট্রাম্প) চমৎকার নেতৃত্বে পরিচালিত সফল হামলা, হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের কৌশলের ফলে হরমুজ প্রণালি এখন উন্মুক্ত ও নিরাপদ। ইরান এই মুহূর্তে প্রচণ্ড দুর্বল।”
পেন্টাগন বা জাতিসংঘে ইরানি প্রতিনিধি মিশন এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
কৌশলগত তাৎপর্য ও ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি
যুক্তরাষ্ট্রের ওই দুই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইরানের এই মাইনবহনের কৌশল হয়তো সামরিক চাতুর্যের অংশ। তেহরান সম্ভবত বিশ্ববাসীকে বোঝাতে চেয়েছে যে, তারা প্রণালি বন্ধে সক্ষম ও প্রস্তুত, যদিও কার্যত এমন কিছু করতে চায়নি। আবার এটা হতে পারে, ইরানের সেনাবাহিনী শুধু শীর্ষ নেতাদের চূড়ান্ত নির্দেশনার অপেক্ষায় প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
হরমুজ প্রণালি ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী একটি সরু জলপথ, যা পারস্য উপসাগরকে গালফ অব ওমান ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে প্রস্থ মাত্র ২১ মাইল, যার মধ্যে দুইপাশে মাত্র দুই মাইল করে জাহাজ চলাচলের পথ রয়েছে।
ওপেকভুক্ত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাক তাদের বেশিরভাগ অপরিশোধিত তেল এই পথেই রপ্তানি করে, বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে। কাতারও তার প্রায় সব তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথেই পাঠায়। এমনকি ইরান নিজেও তাদের তেলের রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রণালি বন্ধ করা ইরানের জন্য দ্বিমুখী ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবুও, গত এক দশকে ইরান এই প্রণালিকে নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যাপক প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে।
২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে অন্তত ৫,০০০টি সামুদ্রিক মাইন ছিল, যেগুলো তারা দ্রুতগামী ছোট নৌযানের মাধ্যমে খুব দ্রুত স্থাপন করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি ও সামরিক তৎপরতা
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে রয়েছে বাহরাইনে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহর। এই নৌবহরে সাধারণত চারটি মাইন পরিষ্কারকারী (Mine Countermeasure) জাহাজ মোতায়েন থাকে। তবে বর্তমানে এসব জাহাজের বদলে নতুন প্রজন্মের ‘লিটোরাল কমব্যাট শিপ’ (LCS) আনা হচ্ছে, যেগুলো মাইনবিরোধী অপারেশনেও সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর আগে সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় বাহরাইন থেকে তাদের মাইন-পরিষ্কারকারী জাহাজ সরিয়ে নেয়। কিন্তু ইরান কেবল কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে সীমিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যা প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে ধারণা রয়েছে, ইরান ভবিষ্যতে আরও আক্রমণাত্মক ও পরিকল্পিত পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। ফলে হরমুজ প্রণালি এবং এর নিরাপত্তা ঘিরে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
এই প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট যে, হরমুজ প্রণালি শুধু একটি নৌপথ নয়, এটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল মধ্যকার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এ প্রণালির নিরাপত্তা বিশ্বের জ্বালানি বাজার এবং কৌশলগত ভারসাম্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্যই এর প্রতিটি ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নজরদারির মধ্যে রয়েছে।










