চট্টগ্রামে আলোচিত আইনজীবী আলিফ হত্যা মামলায় ইসকনের চিন্ময়সহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল
- Update Time : ০৭:১১:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ জুলাই ২০২৫
- / ২০৩ Time View

চট্টগ্রামে আলোচিত আইনজীবী আলিফ হত্যা মামলায় ইসকনের চিন্ময়সহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল মামলায় ইসকনের চিন্ময়সহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল
চট্টগ্রামে আলোচিত সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর ও তরুণ আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড়ের পর শেষ পর্যন্ত ইসকনের বিতর্কিত নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারীসহ মোট ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ। গতকাল (মঙ্গলবার, ১ জুলাই) চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালী জোন) মাহফুজুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ অভিযোগপত্র জমা দেন।
অভিযোগপত্রের প্রধান তথ্য:
- চার্জশিটভুক্ত আসামি: ৩৮ জন
- মূল আসামি: চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারী (ইসকন নেতা)
- এজাহারভুক্ত আসামি: ৩১ জন, এদের মধ্যে ৩ জনকে অব্যাহতির আবেদন
- নতুন করে অভিযুক্ত: ১০ জন, যাদের নাম তদন্তে উঠে এসেছে
- গ্রেফতার: ২০ জন, পলাতক: ১৮ জন
ঘটনার পটভূমি:
২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। এরপর আদালত প্রাঙ্গণে তার অনুসারীরা প্রিজন ভ্যান ঘিরে উত্তেজনাকর বিক্ষোভ শুরু করে। সেখানেই চিন্ময় ভ্যানে দাঁড়িয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন, যার প্রভাবে ইসকনের উগ্রবাদী সমর্থকরা তা-ব শুরু করে। আদালত চত্বরের পাশের কোর্ট হিল মসজিদে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তখন আইনজীবী ও সাধারণ মুসল্লিরা প্রতিরোধে এগিয়ে এলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যেই তরুণ আইনজীবী আলিফকে প্রকাশ্যে খুন করা হয়। তাকে রাস্তায় ফেলে খঞ্জর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, যা সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে আসে।
তদন্তে কী উঠে এসেছে?
তদন্তকারী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, চিন্ময় দাশই ছিলেন মূল হুকুমদাতা। তার প্রকাশ্য বক্তব্য অনুসারীদের উত্তেজিত করে তোলে এবং তাদের মধ্য থেকেই একদল সশস্ত্র উগ্রবাদী আলিফের ওপর হামলা চালায়। ইতোমধ্যে একাধিক আসামির ১৬৪
এজাহারভুক্ত ৩১ জনের মধ্যে ২৮ জনকে অভিযোগপত্রে রাখা হয়েছে, আর তদন্তে নতুনভাবে আসা ১০ জনকে যুক্ত করে মোট আসামি করা হয়েছে ৩৮ জনকে। আসামিদের সবাই নগরীর বান্ডেল সেবক কলোনি ও রঙ্গম কনভেনশন হল সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী, যারা ঘটনার সময় সংগঠিতভাবে সহিংসতায় জড়িত ছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
আদালত ও মামলার বর্তমান অবস্থা:
মামলাটি বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। সহকারী পিপি মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, অভিযোগপত্র গ্রহণ ও শুনানির জন্য আদালত নির্ধারিত তারিখে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এই মামলার শুনানি শুরুর মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
গ্রেফতার ও স্বীকারোক্তি:
এখন পর্যন্ত ২০ জন আসামি গ্রেফতার হলেও বাকি ১৮ জন পলাতক রয়েছে। গ্রেফতার হওয়া তিনজন—চন্দন দাস, রাজীব ভট্টাচার্য্য ও রিপন দাশ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা হামলা ও হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং সরাসরি অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করেছেন।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া:
আলিফের পরিবার দাবি করছে, এটি ছিল পরিকল্পিত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উগ্রবাদ দ্বারা পরিচালিত একটি হত্যাকাণ্ড। তাদের মতে, শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যেই আলিফকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে। গত বছরের ২৯ নভেম্বর আলিফের বাবা জামাল উদ্দিন কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন, যেখানে ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ১৫-১৬ জনকে আসামি করা হয়।
চট্টগ্রামের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তিগত হত্যার ঘটনা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় আইনের শাসন, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও বিচার বিভাগের নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। মামলার চার্জশিট দাখিলের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ার সূচনা হলেও জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন—আলিফ হত্যার প্রকৃত ন্যায়বিচার কি আদৌ নিশ্চিত হবে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিচারক ও আইনজীবীদের ওপর হামলার ঘটনা বাংলাদেশে বিরল নয়, তবে আদালত চত্বরে এমন বর্বর ঘটনা জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এবার জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে আদালতের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করাই হবে সরকারের এবং বিচার বিভাগের প্রধান দায়িত্ব।










