সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরাইলি অবরোধে গাজার শিশুদের অনাহার

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৩৯:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ জুলাই ২০২৫
  • / ১৫৩ Time View

clean 1751205004 20250701200256

clean 1751205004 20250701200256

ইসরাইলি অবরোধে গাজার শিশুদের অনাহার—‘এক কার্টন দুধও নেই’, চিকিৎসকদের হৃদয়বিদারক সতর্কতা
অবরুদ্ধ গাজায় তীব্র অপুষ্টিতে ৬০ হাজার শিশু, মানবিক বিপর্যয় নিয়ে চিকিৎসকদের হুঁশিয়ারি

ইসরাইলি অবরোধ ও লাগাতার হামলার কারণে গাজা উপত্যকায় মানবিক বিপর্যয় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সবচেয়ে সংকটময় অবস্থায় রয়েছে শিশুরা। গাজার চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, অবরোধের কারণে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় ফর্মুলা দুধের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বুকের দুধ দিতে অক্ষম ক্ষুধার্ত মায়েরা চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন, এই অব্যাহত সংকটে হাজার হাজার শিশু অনাহারে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে।

গাজার আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের মুখপাত্র খলিল আল-দাকরান আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানান,

“অবরোধের ফলে গাজার বাজারে একটি কার্টন দুধও পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা শিশুদের চোখের সামনে ক্ষুধায় কাতরাতে দেখছি। এটা নিঃসন্দেহে এক নীরব গণহত্যা।”

তিনি বলেন,

“বর্তমানে কমপক্ষে ৬০ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। এই সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। চিকিৎসা ও পুষ্টিসেবা দেওয়ার মতো কোনো সক্ষমতা আমাদের আর নেই।”

চিকিৎসকরা অভিযোগ করেছেন, ইসরাইল কেবল সাধারণ খাদ্যপণ্য নয়, পরিকল্পিতভাবে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। এতে শিশুদের জন্য চিকিৎসা, ওষুধ, পুষ্টি সরবরাহ—সবকিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় পৌঁছেছে। দুধ, ওষুধ, পানি, বিদ্যুৎ—সব কিছুরই চরম সংকট চলছে।

শিশুর জন্মদিনে মৃত্যুইসরাইলি হামলার নির্মমতা

গাজা জুড়ে ইসরাইলি বিমান হামলায় গত কয়েকদিনে অন্তত ৯৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সেই সময় নিহত হন, যখন তারা মার্কিন-ইসরাইল-সমর্থিত একটি সাহায্য বিতরণ কেন্দ্র থেকে খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন।

আরও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে একটি ইন্টারনেট ক্যাফেতে, যেখানে শিশুদের জন্মদিনের ছোট্ট পার্টি চলছিল। ঠিক তখনই ইসরাইলি যুদ্ধবিমান সেখানে বোমা হামলা চালায়, যাতে কমপক্ষে ৩৯ জন নিহত হন। এই ঘটনাটি গাজার মানুষের কাছে শোক, ক্ষোভ ও অসহায়ত্বের এক নির্মম স্মারক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটা যুদ্ধবিরতিরও অধিকার নেই?’—হামাসের প্রশ্ন

এই ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতিতে হামাসের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা আল-জাজিরাকে বলেন,

“আমরা এমন একটি যুদ্ধবিরতি চাইছি, যা আমাদের সাধারণ নাগরিকদের জীবন বাঁচাবে। কিন্তু ইসরাইল আলোচনা ও সমঝোতার পথ ধ্বংস করছে।”

তিনি দাবি করেন, ইসরাইলের চলমান অবরোধ ও বেসামরিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ প্রমাণ করে যে দেশটি কোনো মানবিক সহানুভূতির ধার ধারে না।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কোথায়?

গাজার এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘ বহুবার গাজায় ‘মানবিক করিডোর’ চালুর আহ্বান জানালেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন হয়নি। শিশুরা দিন দিন অনাহারে ভুগছে, অপুষ্টিতে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে—তবুও বড় শক্তিগুলো কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে।

গাজার চিকিৎসকরা যে ‘নীরব বিপর্যয়’-এর কথা বলছেন, তা আর নীরব নেই—তা এখন চিৎকার করে পুরো বিশ্বের সামনে মানবিকতার প্রশ্ন তুলছে। শিশুরা যুদ্ধ করেনি, তবু তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন একটাই: মানবতার এই বিপর্যয়ে বিশ্ব আর কতকাল চুপ থাকবে?

সূত্র: আল-জাজিরা, গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা রিপোর্ট, ২০২৫

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ইসরাইলি অবরোধে গাজার শিশুদের অনাহার

Update Time : ১০:৩৯:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ জুলাই ২০২৫

clean 1751205004 20250701200256

ইসরাইলি অবরোধে গাজার শিশুদের অনাহার—‘এক কার্টন দুধও নেই’, চিকিৎসকদের হৃদয়বিদারক সতর্কতা
অবরুদ্ধ গাজায় তীব্র অপুষ্টিতে ৬০ হাজার শিশু, মানবিক বিপর্যয় নিয়ে চিকিৎসকদের হুঁশিয়ারি

ইসরাইলি অবরোধ ও লাগাতার হামলার কারণে গাজা উপত্যকায় মানবিক বিপর্যয় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সবচেয়ে সংকটময় অবস্থায় রয়েছে শিশুরা। গাজার চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, অবরোধের কারণে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় ফর্মুলা দুধের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বুকের দুধ দিতে অক্ষম ক্ষুধার্ত মায়েরা চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন, এই অব্যাহত সংকটে হাজার হাজার শিশু অনাহারে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে।

গাজার আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের মুখপাত্র খলিল আল-দাকরান আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানান,

“অবরোধের ফলে গাজার বাজারে একটি কার্টন দুধও পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা শিশুদের চোখের সামনে ক্ষুধায় কাতরাতে দেখছি। এটা নিঃসন্দেহে এক নীরব গণহত্যা।”

তিনি বলেন,

“বর্তমানে কমপক্ষে ৬০ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। এই সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। চিকিৎসা ও পুষ্টিসেবা দেওয়ার মতো কোনো সক্ষমতা আমাদের আর নেই।”

চিকিৎসকরা অভিযোগ করেছেন, ইসরাইল কেবল সাধারণ খাদ্যপণ্য নয়, পরিকল্পিতভাবে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। এতে শিশুদের জন্য চিকিৎসা, ওষুধ, পুষ্টি সরবরাহ—সবকিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় পৌঁছেছে। দুধ, ওষুধ, পানি, বিদ্যুৎ—সব কিছুরই চরম সংকট চলছে।

শিশুর জন্মদিনে মৃত্যুইসরাইলি হামলার নির্মমতা

গাজা জুড়ে ইসরাইলি বিমান হামলায় গত কয়েকদিনে অন্তত ৯৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সেই সময় নিহত হন, যখন তারা মার্কিন-ইসরাইল-সমর্থিত একটি সাহায্য বিতরণ কেন্দ্র থেকে খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন।

আরও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে একটি ইন্টারনেট ক্যাফেতে, যেখানে শিশুদের জন্মদিনের ছোট্ট পার্টি চলছিল। ঠিক তখনই ইসরাইলি যুদ্ধবিমান সেখানে বোমা হামলা চালায়, যাতে কমপক্ষে ৩৯ জন নিহত হন। এই ঘটনাটি গাজার মানুষের কাছে শোক, ক্ষোভ ও অসহায়ত্বের এক নির্মম স্মারক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটা যুদ্ধবিরতিরও অধিকার নেই?’—হামাসের প্রশ্ন

এই ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতিতে হামাসের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা আল-জাজিরাকে বলেন,

“আমরা এমন একটি যুদ্ধবিরতি চাইছি, যা আমাদের সাধারণ নাগরিকদের জীবন বাঁচাবে। কিন্তু ইসরাইল আলোচনা ও সমঝোতার পথ ধ্বংস করছে।”

তিনি দাবি করেন, ইসরাইলের চলমান অবরোধ ও বেসামরিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ প্রমাণ করে যে দেশটি কোনো মানবিক সহানুভূতির ধার ধারে না।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কোথায়?

গাজার এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘ বহুবার গাজায় ‘মানবিক করিডোর’ চালুর আহ্বান জানালেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন হয়নি। শিশুরা দিন দিন অনাহারে ভুগছে, অপুষ্টিতে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে—তবুও বড় শক্তিগুলো কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে।

গাজার চিকিৎসকরা যে ‘নীরব বিপর্যয়’-এর কথা বলছেন, তা আর নীরব নেই—তা এখন চিৎকার করে পুরো বিশ্বের সামনে মানবিকতার প্রশ্ন তুলছে। শিশুরা যুদ্ধ করেনি, তবু তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন একটাই: মানবতার এই বিপর্যয়ে বিশ্ব আর কতকাল চুপ থাকবে?

সূত্র: আল-জাজিরা, গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা রিপোর্ট, ২০২৫