সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিল পেতে চাও যদি দাও ঘড়ি কিংবা নারী:ওবায়দুল কাদেরের ঘড়ি, নারী ও দুর্নীতির গল্প

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৫৭:০৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ জুন ২০২৫
  • / ৬০৬ Time View

Obaidul kader 1

Obaidul kader 1
 

দীর্ঘদিন রাজনীতি ও মন্ত্রীত্বের পটভূমিতে থাকা ওবায়দুল কাদের একসময় ছিলেন অতি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন সাংবাদিক। ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকায় কাজ করতেন, রাতের পর রাত কাটাতেন অফিসের মেঝেতে, বিছানার বদলে নিউজপ্রিন্ট। দুই বেলার খাবার জোটাতে হিমশিম খাওয়া সেই কাদের আজ বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং বিতর্কিত আচরণে পরিচিত এক রাজনৈতিক চরিত্র।

ক্ষমতার আসনে বসার পর যেন হঠাৎই তার জীবনে আসে আকাশছোঁয়া পরিবর্তন। শুরু হয় বিলাসিতার অতি প্রকাশ—দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি, চোখ ধাঁধানো স্যুট, সুরভিত পারফিউম, বিলাসবহুল জুতা ও রাজকীয় ভ্রমণ। তিনি নিজেই বলেছিলেন, “১০ লাখ টাকার নিচে কোনো ঘড়ি আমি পরি না। একই ঘড়ি এক মাসে দুইবার পরি না।” রাজধানীর নিজস্ব বাসায় তৈরি করেছিলেন একটি ঘড়ির শোকেস, যাতে শোভা পেত রোলেক্স, পাটেক ফিলিপ, শেফার্ড, উলিস নাদা, লুই ভিটনের মতো বিশ্বের খ্যাতনামা ব্র্যান্ডের ঘড়ি।

2906
 

তদন্তসূত্রে জানা গেছে, এই ঘড়িগুলোর বেশিরভাগই উপহারস্বরূপ পেয়েছিলেন বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছ থেকে। টেন্ডার পাস, বিল অনুমোদনের বিনিময়ে এসব উপঢৌকন ছিল যেন অলিখিত নিয়ম। ঠিকাদারদের মধ্যেও চালু হয়েছিল একটি ব্যঙ্গাত্মক ছড়া—বিল পেতে চাও যদি, দাও ঘড়ি কিংবা নারী।

শুধু ঘড়ি নয়, কাদেরের পোশাক ও চেহারার যত্নেও ছিল বিলাসিতার ছাপ। ব্যক্তিগত ডিজাইনের আরমানি স্যুট যার একেকটির দাম ছিল প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩৮ লাখ)। চোখের চশমার ফ্রেম ১৫ লাখ টাকা, একেকটি টাই বা পারফিউমেও খরচ হতো লাখ টাকার কাছাকাছি।

তবে বিতর্কের কেন্দ্রে কেবল বিলাসিতা নয়, নারীঘটিত অভিযোগও রয়েছে বিস্তর। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নেতার নারীদের প্রতি দুর্বলতা ছিল সুপরিচিত। সরকারি দফতরে পুরুষ কর্মীরা বহুবার ফিরে গেলেও নারী কর্মীরা সহজেই তার সাক্ষাৎ পেতেন। বিভিন্ন কলেজের ছাত্রীরা, এমনকি চলচ্চিত্র জগতের নায়িকারা—এদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, ছবি ও কার্যকলাপ সোশ্যাল মিডিয়ায় বারবার আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশেষভাবে আলোচিত হয় চিত্রনায়িকা পূর্ণিমার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। “গাঙচিল” নামে একটি সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে তিনি অভিনেত্রী পূর্ণিমা ও অভিনেতা ফেরদৌসকে যুক্ত করেন। সিনেমার নামে ঘন ঘন দেখা-সাক্ষাৎ, অনুষ্ঠান-উপস্থিতি ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগ উঠতে থাকে। আরও কিছু নায়িকা—যেমন মাহিয়া মাহি প্রমুখের সঙ্গেও তার সখ্যতা ছিল ওপেন সিক্রেট। অভিযোগ রয়েছে, তাদের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কমিটিতে জায়গা পাওয়া যেত সহজেই।

এই সখ্যতার কেন্দ্রস্থল ছিল গাজীপুরের প্রাক্তন মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বাগানবাড়ি, যেখানে কাদের নিয়মিত সময় কাটাতেন। বিভিন্ন সফরের অজুহাতে সেই বাড়িতে গিয়ে নির্দিষ্ট নারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হতো। না থাকলে তার মেজাজ হতো খারাপ—সহকর্মীদের ওপর চলত চিৎকার-গালাগালি।

সাংগঠনিক সফরে, বিদেশ ভ্রমণে, মন্ত্রণালয়ের কাজে প্রায়শই এসব নায়িকা ও নারীসঙ্গী থাকতেন। বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে জানা যায়, একাধিকবার নারীসঙ্গীদেরও তিনি বিদেশে নিয়ে গেছেন নিজের সফরের অংশ হিসেবে। তাদেরকে দিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করানো হতো, যেন একটি সাংগঠনিক সৌন্দর্যের প্রদর্শনী।

মূল প্রশ্ন থেকে যায়—একজন রাজনীতিক, যিনি পেশাগতভাবে কখনো কোনো ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে জড়িত ছিলেন না, কীভাবে এসব বিলাসবহুল জীবনযাপন সম্ভব করলেন? তার সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীর আয় দিয়ে এত ব্যয়বহুল জীবন চালানো অসম্ভব।

বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, পাচার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের তদন্ত চলছে। দেশে তার ব্যাংক হিসাব জব্দ হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিদেশেও তার নামে বিপুল সম্পদ রয়েছে। এইসব অর্থ তিনি দেশ থেকে পাচার করেছেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

একসময় গণমাধ্যমের ছায়ায় জীবন শুরু করা মানুষটি আজ হাজার হাজার কোটি টাকার বিত্তশালী—যার সম্পদ ব্যবহৃত হয়েছে নারীবিলাস, বিলাসদ্রব্য ও রাজনীতিকে বিকৃত করে তোলার পেছনে। দুর্নীতির টাকায় মোড়ানো এই জীবনযাত্রা শুধু রাজনৈতিক দুর্বলতার চিত্র নয়, এটি এক প্রজন্মের নেতৃত্বের ব্যর্থতার জ্বলন্ত নিদর্শন।

এখন দেশের জনগণ এবং সচেতন মহলের একটাই প্রত্যাশা—ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত যেন নিরপেক্ষ ও যথাযথভাবে সম্পন্ন হয় এবং তার ঘুষ, দুর্নীতি, নারী কেলেঙ্কারির পূর্ণ সত্য জাতির সামনে উন্মোচিত হয়। রাষ্ট্র যদি চায়, তবে আজও সময় আছে এসব লুটপাটকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করার।

সুত্রঃবাংলাদেশ প্রতিদিন  

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বিল পেতে চাও যদি দাও ঘড়ি কিংবা নারী:ওবায়দুল কাদেরের ঘড়ি, নারী ও দুর্নীতির গল্প

Update Time : ১০:৫৭:০৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ জুন ২০২৫
Obaidul kader 1
 

দীর্ঘদিন রাজনীতি ও মন্ত্রীত্বের পটভূমিতে থাকা ওবায়দুল কাদের একসময় ছিলেন অতি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন সাংবাদিক। ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকায় কাজ করতেন, রাতের পর রাত কাটাতেন অফিসের মেঝেতে, বিছানার বদলে নিউজপ্রিন্ট। দুই বেলার খাবার জোটাতে হিমশিম খাওয়া সেই কাদের আজ বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং বিতর্কিত আচরণে পরিচিত এক রাজনৈতিক চরিত্র।

ক্ষমতার আসনে বসার পর যেন হঠাৎই তার জীবনে আসে আকাশছোঁয়া পরিবর্তন। শুরু হয় বিলাসিতার অতি প্রকাশ—দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি, চোখ ধাঁধানো স্যুট, সুরভিত পারফিউম, বিলাসবহুল জুতা ও রাজকীয় ভ্রমণ। তিনি নিজেই বলেছিলেন, “১০ লাখ টাকার নিচে কোনো ঘড়ি আমি পরি না। একই ঘড়ি এক মাসে দুইবার পরি না।” রাজধানীর নিজস্ব বাসায় তৈরি করেছিলেন একটি ঘড়ির শোকেস, যাতে শোভা পেত রোলেক্স, পাটেক ফিলিপ, শেফার্ড, উলিস নাদা, লুই ভিটনের মতো বিশ্বের খ্যাতনামা ব্র্যান্ডের ঘড়ি।

2906
 

তদন্তসূত্রে জানা গেছে, এই ঘড়িগুলোর বেশিরভাগই উপহারস্বরূপ পেয়েছিলেন বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছ থেকে। টেন্ডার পাস, বিল অনুমোদনের বিনিময়ে এসব উপঢৌকন ছিল যেন অলিখিত নিয়ম। ঠিকাদারদের মধ্যেও চালু হয়েছিল একটি ব্যঙ্গাত্মক ছড়া—বিল পেতে চাও যদি, দাও ঘড়ি কিংবা নারী।

শুধু ঘড়ি নয়, কাদেরের পোশাক ও চেহারার যত্নেও ছিল বিলাসিতার ছাপ। ব্যক্তিগত ডিজাইনের আরমানি স্যুট যার একেকটির দাম ছিল প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩৮ লাখ)। চোখের চশমার ফ্রেম ১৫ লাখ টাকা, একেকটি টাই বা পারফিউমেও খরচ হতো লাখ টাকার কাছাকাছি।

তবে বিতর্কের কেন্দ্রে কেবল বিলাসিতা নয়, নারীঘটিত অভিযোগও রয়েছে বিস্তর। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নেতার নারীদের প্রতি দুর্বলতা ছিল সুপরিচিত। সরকারি দফতরে পুরুষ কর্মীরা বহুবার ফিরে গেলেও নারী কর্মীরা সহজেই তার সাক্ষাৎ পেতেন। বিভিন্ন কলেজের ছাত্রীরা, এমনকি চলচ্চিত্র জগতের নায়িকারা—এদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, ছবি ও কার্যকলাপ সোশ্যাল মিডিয়ায় বারবার আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশেষভাবে আলোচিত হয় চিত্রনায়িকা পূর্ণিমার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। “গাঙচিল” নামে একটি সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে তিনি অভিনেত্রী পূর্ণিমা ও অভিনেতা ফেরদৌসকে যুক্ত করেন। সিনেমার নামে ঘন ঘন দেখা-সাক্ষাৎ, অনুষ্ঠান-উপস্থিতি ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগ উঠতে থাকে। আরও কিছু নায়িকা—যেমন মাহিয়া মাহি প্রমুখের সঙ্গেও তার সখ্যতা ছিল ওপেন সিক্রেট। অভিযোগ রয়েছে, তাদের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কমিটিতে জায়গা পাওয়া যেত সহজেই।

এই সখ্যতার কেন্দ্রস্থল ছিল গাজীপুরের প্রাক্তন মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বাগানবাড়ি, যেখানে কাদের নিয়মিত সময় কাটাতেন। বিভিন্ন সফরের অজুহাতে সেই বাড়িতে গিয়ে নির্দিষ্ট নারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হতো। না থাকলে তার মেজাজ হতো খারাপ—সহকর্মীদের ওপর চলত চিৎকার-গালাগালি।

সাংগঠনিক সফরে, বিদেশ ভ্রমণে, মন্ত্রণালয়ের কাজে প্রায়শই এসব নায়িকা ও নারীসঙ্গী থাকতেন। বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে জানা যায়, একাধিকবার নারীসঙ্গীদেরও তিনি বিদেশে নিয়ে গেছেন নিজের সফরের অংশ হিসেবে। তাদেরকে দিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করানো হতো, যেন একটি সাংগঠনিক সৌন্দর্যের প্রদর্শনী।

মূল প্রশ্ন থেকে যায়—একজন রাজনীতিক, যিনি পেশাগতভাবে কখনো কোনো ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে জড়িত ছিলেন না, কীভাবে এসব বিলাসবহুল জীবনযাপন সম্ভব করলেন? তার সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীর আয় দিয়ে এত ব্যয়বহুল জীবন চালানো অসম্ভব।

বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, পাচার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের তদন্ত চলছে। দেশে তার ব্যাংক হিসাব জব্দ হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিদেশেও তার নামে বিপুল সম্পদ রয়েছে। এইসব অর্থ তিনি দেশ থেকে পাচার করেছেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

একসময় গণমাধ্যমের ছায়ায় জীবন শুরু করা মানুষটি আজ হাজার হাজার কোটি টাকার বিত্তশালী—যার সম্পদ ব্যবহৃত হয়েছে নারীবিলাস, বিলাসদ্রব্য ও রাজনীতিকে বিকৃত করে তোলার পেছনে। দুর্নীতির টাকায় মোড়ানো এই জীবনযাত্রা শুধু রাজনৈতিক দুর্বলতার চিত্র নয়, এটি এক প্রজন্মের নেতৃত্বের ব্যর্থতার জ্বলন্ত নিদর্শন।

এখন দেশের জনগণ এবং সচেতন মহলের একটাই প্রত্যাশা—ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত যেন নিরপেক্ষ ও যথাযথভাবে সম্পন্ন হয় এবং তার ঘুষ, দুর্নীতি, নারী কেলেঙ্কারির পূর্ণ সত্য জাতির সামনে উন্মোচিত হয়। রাষ্ট্র যদি চায়, তবে আজও সময় আছে এসব লুটপাটকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করার।

সুত্রঃবাংলাদেশ প্রতিদিন