খামেনির অনুপস্থিতি ঘিরে ইরানে উদ্বেগ ও রাজনৈতিক টানাপড়েন–নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট
- Update Time : ১১:৪৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন ২০২৫
- / ৩৫৫ Time View

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কয়েক দিনের অনুপস্থিতি ঘিরে গোটা ইরানে জল্পনা-কল্পনার ঝড় উঠেছে। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল পর্যন্ত একটাই প্রশ্ন— “তিনি কোথায়?” এবং “তিনি কেমন আছেন?”
মঙ্গলবার ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে একটি আলোচনায় উপস্থাপক সরাসরি খামেনির কার্যালয়ের আর্কাইভস বিভাগের প্রধান মেহদি ফাযায়েলিকে প্রশ্ন করেন: “আপনি কি আমাদের সর্বোচ্চ নেতার বর্তমান অবস্থার বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন?” উত্তরে ফাযায়েলি সরাসরি কোনো তথ্য না দিয়ে কেবল বলেন, তিনিও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে উদ্বেগপূর্ণ প্রশ্ন পাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলার প্রেক্ষাপটে সবাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তিনি শুধু বলেন, “সকলের উচিত প্রার্থনা করা,” এবং যোগ করেন যে, খামেনির নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে।
অনুপস্থিতি ও জনচিন্তার আবর্ত
গত এক সপ্তাহে ইরানে ঘটে গেছে কয়েকটি নজিরবিহীন ঘটনা:
- যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালিয়েছে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায়
- ইরান পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে
- এবং ইরান-ইসরায়েল সম্মত হয়েছে যুদ্ধবিরতিতে, যা কার্যকর হয় মঙ্গলবার
এই পরিস্থিতির মাঝেও খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি, যা এক অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক অবস্থা তৈরি করেছে।
স্থানীয় দৈনিক খানেমান-এর প্রধান সম্পাদক মোহসেন খালিফেহ বলেন, “এই দীর্ঘ নীরবতা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। দু’সপ্তাহ আগেও যা অকল্পনীয় ছিল, এখন সেটিই ঘুরেফিরে আলোচনায়— যদি সত্যিই তিনি মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় জানাজা।”
নিরাপত্তা, বিচ্ছিন্নতা ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, খামেনি এখন একটি নিরাপদ বাংকারে আশ্রয় নিয়েছেন এবং কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যোগাযোগ করছেন না।
ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর (IRGC) এর সাবেক কমান্ডার ইয়াহিয়া সাফাভির ছেলে হামজেহ সাফাভি বলেন, ইসরায়েল এখনও খামেনিকে হত্যার প্রচেষ্টা চালাতে পারে—এই আশঙ্কায় তাকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।
এই অবস্থায় নেতৃত্বের ব্যাকআপ হিসেবে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সামনে চলে এসেছেন। বিচারপতি গোলাম-হোসেন মোহসেনি-ইজেই এবং সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আবদোররহিম মুসাভিও এই বাস্তববাদী শিবিরের অংশ। প্রেসিডেন্ট বুধবার মন্ত্রিসভায় বলেন, “এই যুদ্ধ এবং জনগণের ঐক্য আমাদের সামনে এক ‘সোনালি পরিবর্তনের সুযোগ’ তৈরি করেছে।”
পাল্টা চাপ ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীর তৎপরতা
অন্যদিকে, কট্টরপন্থী রক্ষণশীল একটি গোষ্ঠী, যার নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক পরমাণু আলোচক সাঈদ জালিলি, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তারা এটিকে অবৈধ বলছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো আলোচনা বাতিল করার দাবি তুলেছেন।
জালিলির ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক ফোয়াদ ইজাদি বলেন, “এই ধরনের আলোচনার প্রস্তাব এনে প্রেসিডেন্ট প্রমাণ করছেন, তিনি নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য উপযুক্ত নন।” পাল্টা জবাবে প্রেসিডেন্টের যোগাযোগ প্রধান আলি আহমাদনিয়া টুইটে লেখেন, “আমরা ১২ দিন ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে লড়ছি, এখন আপনাদের মতো লোকদের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হচ্ছে।”
জাতীয় আবেগ ও জনমত ব্যবহার
ইসরায়েলি হামলায় ৬০০ জনের বেশি নিহত হওয়ার পর সৃষ্ট জাতীয়তাবাদী আবেগকে কাজে লাগাতে চাইছে সরকার। মঙ্গলবার তেহরানের আজাদি স্কয়ারে আয়োজন করা হয় একটি উন্মুক্ত সিম্ফনি কনসার্ট এবং আলো-প্রদর্শনী, যেখানে উদ্ধারকর্মীদের সম্মান জানানো হয়।
ভবিষ্যৎ ও পারমাণবিক প্রশ্ন
ইরানের ধ্বংসপ্রাপ্ত পরমাণু স্থাপনাগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ ইসলামী জানিয়েছেন, দেশ তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুনরায় শুরু করবে।
বিশিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান Chatham House-এর বিশেষজ্ঞ সানাম ভাকিল বলেন, “খামেনির অনুপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ইঙ্গিত দেয়, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এখন অতিমাত্রায় সতর্ক। যদি আশুরা পর্যন্ত খামেনিকে প্রকাশ্যে না দেখা যায়, তবে সেটি হবে ভয়ানক সংকেত।”
খামেনির নীরবতা ইরানের রাজনীতি, জনমত এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি—তিন দিকেই এক অস্থিরতা তৈরি করেছে। নেতৃত্বের এই অনিশ্চয়তা কেবল বর্তমান যুদ্ধপরিস্থিতিকেই নয়, বরং ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস, ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম, চ্যাথাম হাউস










