Advertisement
সময়: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৎ আমল এবং সফলতার সাথে সম্পর্ক

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ০৬:৩০:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ জুন ২০২৫
  • / ৩৯৩ Time View

22

22

সৎ আমল (পূণ্যময় কর্ম) ও সাফল্য (ফলাহ্‌) — এই দুইটি শব্দ কুরআন–সুন্নাহ্‌র ভাষায় ঘনিষ্ঠভাবে গাঁথা। কুরআন যেমন মানুষের ‘ইমান ও সৎ আমল’-কে প্রকৃত সফলতার শর্তরূপে ঘোষণা করেছে, তেমনি আল্লাহ্‌র রাসূল (সা.) ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন সৎ আমলের বহুমাত্রিক ফলাফল—দুনিয়ায় প্রশান্তি, জীবিকায় বরকত, মহল্লা–সমাজে মর্যাদা এবং আখিরাতে চূড়ান্ত মুক্তি। নিচের আলোচনা কুরআনের আয়াত ও ছহীহ হাদীসের আলোকে এই সম্পর্কটি বিশদভাবে তুলে ধরে।

প্রথম পরিচ্ছেদ: সফলতার কুরআনি সংজ্ঞা

/> আল–ফালাহ্‌ শব্দটি কুরআনে ৪০–এর বেশিবার এসেছে। সূরা আল–মু’মিনূন–এর প্রথম আয়াতেই ঘোষণা—‘নিশ্চয়ই সফল হল (قَدْ أَفْلَحَ) সে সব মু’মিন, যারা সালাতে বিনয়–নম্র থাকে…’ (২৩ : ১–১১)। এখানে ‘সফলতা’ বলতে দুনিয়া–আখিরাত উভয় জগতের কল্যাণ বোঝানো হয়েছে; আর শর্ত হিসেবে সৎ আমল–নির্ভর চরিত্রের তালিকা তুলে ধরা হয়েছে। একইভাবে সূরা আল–আ’লা–য় বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সে সফল, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করল এবং তার রবের নাম স্মরণ করে সালাত কায়েম করল’ (৮৭ : ১৪–১৫)। কুরআনের ভাষায় সৎ আমল মানেই ঈমানকে বাস্তবে রূপ দেওয়া—যার ফল সরাসরি সফলতা।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: সৎ আমল মানুষকে দুনিয়াতেও ‘হায়াতুন তায়্যিবাহ্‌’ দান করে
আল্লাহ্‌ বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান আনে এবং সৎ কর্ম করে—পুরুষ হোক বা নারী—আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদের কর্ম অনুসারে উত্তম প্রতিদান দেব’ (সূরা আন–নাহ্‌ল ১৬ : ৯৭)। ইবনে আব্বাস (র.) ব্যাখ্যা করেন—হায়াতুন তায়্যিবাহ্‌ এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত দুনিয়ার স্বচ্ছ–পরিতৃপ্ত রিযিক, হৃদয়ের প্রশান্তি এবং সমাজে সৌভ্রাত্র্য। সৎ আমলের কারণে মানুষ অর্থ, সম্মান ও মানসিক স্বস্তি—তিনটি স্তরেই নিরাপদ হয়।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: সৎ আমল ও জীবিকার সম্প্রসারণ
রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার জীবিকা প্রশস্ত হোক এবং আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে’ (বুখারী, কিতাবুল আদব, হাদীস ৫৯৮৬)। আত্মীয়তার হক আদায় একটি সৎ আমল; এর প্রতিদান সরাসরি দুনিয়ার রিযিক বাড়ার রূপে প্রকাশিত হয়। একই সূত্রে, অন্য হাদীসে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ অল্প আমলের মাধ্যমেও বান্দাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেন, যদি তা খালিস নেকনিয়তে হয়’ (মুসলিম, কিতাবুয–যুহ্‌দ, হাদীস ২৯৮৬)।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ: আখিরাতের চূড়ান্ত সফলতা
কুরআন বলে, ‘যাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা হল ও জান্নাতে প্রবেশ করানো হল—সেই তো প্রকৃত সফল’ (সূরা আল–ইমরান ৩ : ১৮৫)। এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম কুরতুবী উল্লেখ করেন—সৎ আমল ব্যতীত কাউকে জান্নাত দান করা হবে না, কেননা জান্নাতের চাবিই হল কর্ম। রাসূল (সা.)-ও বলেন, ‘আরশের ছায়া পাওয়ার যোগ্য সাত শ্রেণির মানুষ… যাদের একজন হল এমন যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থেকে বড় হয়েছে’ (বুখারী ৬৬০, মুসলিম ১০৩১)। সদা–ইবাদতনিষ্ঠ তরুণের এ সফলতা তার সৎ আমলের ফলেই।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ: সৎ আমলের আত্মিক লাভ—তাকওয়া ও স্থায়ী আত্ম–উন্নতি
সুরা আল–বাকারার সূচনায়ই বলা হয়েছে, ‘এই কিতাব সন্দেহহীন; এটা মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত’ (২ : ২)। মুত্তাকি হলেন তাঁরা, ‘যারা গায়েবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, সালাত কায়েম করে, আমাদের দেয়া রিযিক থেকে ব্যয় করে…’ (২ : ৩)। পবিত্রতা ও পরিমিতিবোধ—তাকওয়া—সৎ আমলের স্থায়ী ফল, যা মানুষের চরিত্রে স্থায়ী নৈতিক দৃঢ়তা এনে দেয়। ওই তাকওয়া–ই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সফলতার মৌলিক শক্তি।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: সৎ আমল সমাজব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে
রাসূল (সা.) বলেন, ‘সকল তো বিনিয়োগকারী; কেউ নিজেকে মুক্তি দেয়, কেউ নিজের সর্বনাশ ঘটায়’ (মুসলিম, কিতাবে–মুসাকাত, হাদীস ১২৪০)। সমাজে যখন মানুষ সৎ আমলকে জীবনের মূলনীতি করে, তখন অন্যায়, দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয় হ্রাস পায়। কুরআনও ঘোষণা করে, ‘আল্লাহ্‌ এমন কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন না করে’ (১৩ : ১১)। একে সামষ্টিক সফলতার শর্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

সপ্তম পরিচ্ছেদ: সৎ আমল–বিমুখতা ও ব্যর্থতার বাস্তব চিত্র
কুরআন সতর্ক করে, ‘যারা কুফর ও মিথ্যাচারে লিপ্ত, তাদের কর্ম ঝড়ের দিনে উড়ে যাওয়া ধুলোর মতো’ (সুরা ইব্রাহিম ১৪ : ১৮)। রাসূল (সা.) এ শ্রেণিকে ‘মুফলিস’ বা দেউলিয়া বলে আখ্যা দেন—যারা কিয়ামতের ময়দানে ঈমান নিয়ে আসবে, কিন্তু গীবত, অপবাদ, জুলুম ইত্যাদি সৎ আমল–বিরোধী কাজের কারণে তার নেকির পুঁজিই ফুরিয়ে যাবে (মুসলিম, কিতাবুল–বির্র, হাদীস ২৫৮১)। অর্থাৎ সৎ আমল না থাকলে আখিরাতের চূড়ান্ত সফলতা, এমনকি দুনিয়ার সম্মানও ধরে রাখা যায় না।

অষ্টম পরিচ্ছেদ: সৎ আমলের ধারাবাহিকতা—নিয়্যাত ও ইখলাস
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ্‌ বলেন, ‘আমার বান্দা ফরজের পর যে নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন করে, আমি তাকে ভালোবাসি; আর যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার শ্রবণ, দৃষ্টি, হাত, পা সবকিছুর শক্তি হয়ে যায়’ (বুখারী, কিতাবুর–রেকাক, হাদীস ৬৫০২)। এই হাদীস সৎ আমল ধারাবাহিক রাখার মহত্ত্ব বোঝায়। ইখলাস (খাঁটি নিয়্যাত) ছাড়া আমল সম্পূর্ণ হয় না—যার সাক্ষ্য বুখারীর প্রথম হাদীস, ‘সমস্ত কাজেরই মূল্যায়ন নিয়্যাত অনুসারে’ (বুখারী ১)। ধারাবাহিক সৎ আমল আল্লাহ্‌–ভীতি ও ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় করে, যা সবচেয়ে বড় সফলতা।

নবম পরিচ্ছেদ: সমন্বিত সফলতার মডেল—দুনিয়া ও আখিরাত
কুরআন দোয়া শেখায়, ‘হে আমাদের রব, দুনিয়াতে কল্যাণ দাও, আখিরাতে কল্যাণ দাও এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা কর’ (২ : ২০১)। যুগে–যুগে উম্মাহ্‌র মনীষীরা ব্যাখ্যা করেছেন—‘দুনিয়ার কল্যাণ’ বলতে হায়াতুন তায়্যিবাহ্‌, উপযুক্ত রিযিক, পরিবার–সমাজে শান্তি; আর ‘আখিরাতের কল্যাণ’ বলতে জান্নাত ও আল–মাওয়াকে বোঝানো হয়েছে। এই দুয়ের সেতুবন্ধন হয় সৎ আমলের মাধ্যমে। তাই ইসলামে সফলতার মডেল একপাক্ষিক নয়—এটা সামগ্রিক, পরিপূর্ণ।

শেষকথা
কুরআন ও হাদীসের সমষ্টিগত শিক্ষা স্পষ্ট: সৎ আমল হল সফলতার অবিচ্ছেদ্য পূর্বশর্ত। যার জীবনে নিয়মিত সালাত, সত্যবাদিতা, ইনসাফ, আত্মীয়তার হক আদায়, দান–সদকা, জ্ঞানচর্চা ও মানবকল্যাণ—সেই প্রকৃত সফল। দুনিয়ার স্বস্তি, রিযিকের বরকত, সমাজে মর্যাদা ও আখিরাতে মুক্তি—সবই আল্লাহ্‌ তার জন্য সহজ করেন। তাই যে–ই সফলতা কামনা করি, আমাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের আমলনামা সমৃদ্ধ করা এবং প্রতিটি কাজকে ইখলাস ও সুন্নাহ্‌র মানদণ্ডে শুদ্ধ করা। সৎ আমলের এই ধারাবাহিক ধারাই একাকী ব্যক্তিকে, পরিবারকে, এমনকি একটি জাতিকেও সর্বাঙ্গীণ সফলতার পথে নিয়ে যায়—এটাই কুরআন–সুন্নাহ্‌র চিরন্তন ঘোষণা।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

সৎ আমল এবং সফলতার সাথে সম্পর্ক

Update Time : ০৬:৩০:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ জুন ২০২৫

22

সৎ আমল (পূণ্যময় কর্ম) ও সাফল্য (ফলাহ্‌) — এই দুইটি শব্দ কুরআন–সুন্নাহ্‌র ভাষায় ঘনিষ্ঠভাবে গাঁথা। কুরআন যেমন মানুষের ‘ইমান ও সৎ আমল’-কে প্রকৃত সফলতার শর্তরূপে ঘোষণা করেছে, তেমনি আল্লাহ্‌র রাসূল (সা.) ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন সৎ আমলের বহুমাত্রিক ফলাফল—দুনিয়ায় প্রশান্তি, জীবিকায় বরকত, মহল্লা–সমাজে মর্যাদা এবং আখিরাতে চূড়ান্ত মুক্তি। নিচের আলোচনা কুরআনের আয়াত ও ছহীহ হাদীসের আলোকে এই সম্পর্কটি বিশদভাবে তুলে ধরে।

প্রথম পরিচ্ছেদ: সফলতার কুরআনি সংজ্ঞা

/> আল–ফালাহ্‌ শব্দটি কুরআনে ৪০–এর বেশিবার এসেছে। সূরা আল–মু’মিনূন–এর প্রথম আয়াতেই ঘোষণা—‘নিশ্চয়ই সফল হল (قَدْ أَفْلَحَ) সে সব মু’মিন, যারা সালাতে বিনয়–নম্র থাকে…’ (২৩ : ১–১১)। এখানে ‘সফলতা’ বলতে দুনিয়া–আখিরাত উভয় জগতের কল্যাণ বোঝানো হয়েছে; আর শর্ত হিসেবে সৎ আমল–নির্ভর চরিত্রের তালিকা তুলে ধরা হয়েছে। একইভাবে সূরা আল–আ’লা–য় বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সে সফল, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করল এবং তার রবের নাম স্মরণ করে সালাত কায়েম করল’ (৮৭ : ১৪–১৫)। কুরআনের ভাষায় সৎ আমল মানেই ঈমানকে বাস্তবে রূপ দেওয়া—যার ফল সরাসরি সফলতা।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: সৎ আমল মানুষকে দুনিয়াতেও ‘হায়াতুন তায়্যিবাহ্‌’ দান করে
আল্লাহ্‌ বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান আনে এবং সৎ কর্ম করে—পুরুষ হোক বা নারী—আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদের কর্ম অনুসারে উত্তম প্রতিদান দেব’ (সূরা আন–নাহ্‌ল ১৬ : ৯৭)। ইবনে আব্বাস (র.) ব্যাখ্যা করেন—হায়াতুন তায়্যিবাহ্‌ এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত দুনিয়ার স্বচ্ছ–পরিতৃপ্ত রিযিক, হৃদয়ের প্রশান্তি এবং সমাজে সৌভ্রাত্র্য। সৎ আমলের কারণে মানুষ অর্থ, সম্মান ও মানসিক স্বস্তি—তিনটি স্তরেই নিরাপদ হয়।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: সৎ আমল ও জীবিকার সম্প্রসারণ
রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার জীবিকা প্রশস্ত হোক এবং আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে’ (বুখারী, কিতাবুল আদব, হাদীস ৫৯৮৬)। আত্মীয়তার হক আদায় একটি সৎ আমল; এর প্রতিদান সরাসরি দুনিয়ার রিযিক বাড়ার রূপে প্রকাশিত হয়। একই সূত্রে, অন্য হাদীসে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ অল্প আমলের মাধ্যমেও বান্দাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেন, যদি তা খালিস নেকনিয়তে হয়’ (মুসলিম, কিতাবুয–যুহ্‌দ, হাদীস ২৯৮৬)।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ: আখিরাতের চূড়ান্ত সফলতা
কুরআন বলে, ‘যাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা হল ও জান্নাতে প্রবেশ করানো হল—সেই তো প্রকৃত সফল’ (সূরা আল–ইমরান ৩ : ১৮৫)। এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম কুরতুবী উল্লেখ করেন—সৎ আমল ব্যতীত কাউকে জান্নাত দান করা হবে না, কেননা জান্নাতের চাবিই হল কর্ম। রাসূল (সা.)-ও বলেন, ‘আরশের ছায়া পাওয়ার যোগ্য সাত শ্রেণির মানুষ… যাদের একজন হল এমন যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থেকে বড় হয়েছে’ (বুখারী ৬৬০, মুসলিম ১০৩১)। সদা–ইবাদতনিষ্ঠ তরুণের এ সফলতা তার সৎ আমলের ফলেই।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ: সৎ আমলের আত্মিক লাভ—তাকওয়া ও স্থায়ী আত্ম–উন্নতি
সুরা আল–বাকারার সূচনায়ই বলা হয়েছে, ‘এই কিতাব সন্দেহহীন; এটা মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত’ (২ : ২)। মুত্তাকি হলেন তাঁরা, ‘যারা গায়েবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, সালাত কায়েম করে, আমাদের দেয়া রিযিক থেকে ব্যয় করে…’ (২ : ৩)। পবিত্রতা ও পরিমিতিবোধ—তাকওয়া—সৎ আমলের স্থায়ী ফল, যা মানুষের চরিত্রে স্থায়ী নৈতিক দৃঢ়তা এনে দেয়। ওই তাকওয়া–ই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সফলতার মৌলিক শক্তি।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: সৎ আমল সমাজব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে
রাসূল (সা.) বলেন, ‘সকল তো বিনিয়োগকারী; কেউ নিজেকে মুক্তি দেয়, কেউ নিজের সর্বনাশ ঘটায়’ (মুসলিম, কিতাবে–মুসাকাত, হাদীস ১২৪০)। সমাজে যখন মানুষ সৎ আমলকে জীবনের মূলনীতি করে, তখন অন্যায়, দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয় হ্রাস পায়। কুরআনও ঘোষণা করে, ‘আল্লাহ্‌ এমন কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন না করে’ (১৩ : ১১)। একে সামষ্টিক সফলতার শর্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

সপ্তম পরিচ্ছেদ: সৎ আমল–বিমুখতা ও ব্যর্থতার বাস্তব চিত্র
কুরআন সতর্ক করে, ‘যারা কুফর ও মিথ্যাচারে লিপ্ত, তাদের কর্ম ঝড়ের দিনে উড়ে যাওয়া ধুলোর মতো’ (সুরা ইব্রাহিম ১৪ : ১৮)। রাসূল (সা.) এ শ্রেণিকে ‘মুফলিস’ বা দেউলিয়া বলে আখ্যা দেন—যারা কিয়ামতের ময়দানে ঈমান নিয়ে আসবে, কিন্তু গীবত, অপবাদ, জুলুম ইত্যাদি সৎ আমল–বিরোধী কাজের কারণে তার নেকির পুঁজিই ফুরিয়ে যাবে (মুসলিম, কিতাবুল–বির্র, হাদীস ২৫৮১)। অর্থাৎ সৎ আমল না থাকলে আখিরাতের চূড়ান্ত সফলতা, এমনকি দুনিয়ার সম্মানও ধরে রাখা যায় না।

অষ্টম পরিচ্ছেদ: সৎ আমলের ধারাবাহিকতা—নিয়্যাত ও ইখলাস
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ্‌ বলেন, ‘আমার বান্দা ফরজের পর যে নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন করে, আমি তাকে ভালোবাসি; আর যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার শ্রবণ, দৃষ্টি, হাত, পা সবকিছুর শক্তি হয়ে যায়’ (বুখারী, কিতাবুর–রেকাক, হাদীস ৬৫০২)। এই হাদীস সৎ আমল ধারাবাহিক রাখার মহত্ত্ব বোঝায়। ইখলাস (খাঁটি নিয়্যাত) ছাড়া আমল সম্পূর্ণ হয় না—যার সাক্ষ্য বুখারীর প্রথম হাদীস, ‘সমস্ত কাজেরই মূল্যায়ন নিয়্যাত অনুসারে’ (বুখারী ১)। ধারাবাহিক সৎ আমল আল্লাহ্‌–ভীতি ও ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় করে, যা সবচেয়ে বড় সফলতা।

নবম পরিচ্ছেদ: সমন্বিত সফলতার মডেল—দুনিয়া ও আখিরাত
কুরআন দোয়া শেখায়, ‘হে আমাদের রব, দুনিয়াতে কল্যাণ দাও, আখিরাতে কল্যাণ দাও এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা কর’ (২ : ২০১)। যুগে–যুগে উম্মাহ্‌র মনীষীরা ব্যাখ্যা করেছেন—‘দুনিয়ার কল্যাণ’ বলতে হায়াতুন তায়্যিবাহ্‌, উপযুক্ত রিযিক, পরিবার–সমাজে শান্তি; আর ‘আখিরাতের কল্যাণ’ বলতে জান্নাত ও আল–মাওয়াকে বোঝানো হয়েছে। এই দুয়ের সেতুবন্ধন হয় সৎ আমলের মাধ্যমে। তাই ইসলামে সফলতার মডেল একপাক্ষিক নয়—এটা সামগ্রিক, পরিপূর্ণ।

শেষকথা
কুরআন ও হাদীসের সমষ্টিগত শিক্ষা স্পষ্ট: সৎ আমল হল সফলতার অবিচ্ছেদ্য পূর্বশর্ত। যার জীবনে নিয়মিত সালাত, সত্যবাদিতা, ইনসাফ, আত্মীয়তার হক আদায়, দান–সদকা, জ্ঞানচর্চা ও মানবকল্যাণ—সেই প্রকৃত সফল। দুনিয়ার স্বস্তি, রিযিকের বরকত, সমাজে মর্যাদা ও আখিরাতে মুক্তি—সবই আল্লাহ্‌ তার জন্য সহজ করেন। তাই যে–ই সফলতা কামনা করি, আমাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের আমলনামা সমৃদ্ধ করা এবং প্রতিটি কাজকে ইখলাস ও সুন্নাহ্‌র মানদণ্ডে শুদ্ধ করা। সৎ আমলের এই ধারাবাহিক ধারাই একাকী ব্যক্তিকে, পরিবারকে, এমনকি একটি জাতিকেও সর্বাঙ্গীণ সফলতার পথে নিয়ে যায়—এটাই কুরআন–সুন্নাহ্‌র চিরন্তন ঘোষণা।