সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অর্থপাচার এখন জাতীয় দুর্যোগ

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১২:১১:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ জুন ২০২৫
  • / ৩৬৫ Time View

ORTHO PACHAR

ORTHO PACHAR

বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত সংকট এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য গভীর হুমকি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুইস ব্যাংকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি ধনীদের গোপন সম্পদ এবং অর্থ গচ্ছিত থাকার যে তথ্য প্রকাশ হয়েছে, তা দেশবাসীকে হতবাক ও শঙ্কিত করেছে।

সুইস ব্যাংকে আমানত ৩৩ গুণ বৃদ্ধি: কিসের ইঙ্গিত?

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক Swiss National Bank (SNB) সম্প্রতি যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় হাজার ৯৭২ কোটি টাকা, যেখানে ২০২৩ সালে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ২৭০ কোটি টাকা (সূত্র: কালের কণ্ঠ, ২০২৫)। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ৩৩ গুণ বৃদ্ধি অর্থপাচারের ভয়াবহতা প্রকাশ করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হঠাৎ উল্লম্ফন কেবলমাত্র বৈধ বাণিজ্যিক লেনদেন নয় বরং অর্থপাচার ও দুর্নীতির চোরাপথকেই ইঙ্গিত করে। Transfer Pricing, Over-Invoicing, Under-Invoicing, হুন্ডি এবং ফেক কোম্পানি খুলে বিনিয়োগের নামে টাকা বিদেশে সরিয়ে নেওয়া—এসবই অর্থপাচারের পরিচিত কৌশল।

বিদেশে বাড়িসম্পদ গোল্ডেন ভিসা ট্র্যাপ

বাংলাদেশিদের মধ্যে ‘গোল্ডেন ভিসা’ বা বিদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, কানাডা, দুবাই, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের কয়েকটি দেশ—এসব স্থানে বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যবসা ও ব্যাংক একাউন্ট খোলা এখন নতুন ধনী শ্রেণির নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

Global Financial Integrity (GFI)–এর ২০১৭ সালের এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে ৭৫ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় হাজার কোটি টাকা) পাচার হয়েছে। পরবর্তীতে ২০২০ সালে সিপিডি এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণাতেও দেখা যায়, অর্থপাচারের মূল চালিকাশক্তি হলো—দুর্নীতি, অবৈধ আর্থিক প্রবাহ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

ব্যাংকিং খাতে বিপর্যয়: অনিয়মই কি পাচারের পথ খুলছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ ফেরত না দিয়ে তা বিদেশে পাচার বা অন্য কাজে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।

এত বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের পিছনে দায়ী কিছু ব্যাংক মালিক, বড় ব্যবসায়ী রাজনীতিকদের মধ্যে গড়ে ওঠা ‘কার্টেল’। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ১০টি ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে চাইলেও, সরকারের উচ্চমহল থেকে চাপের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অভিযোগ উঠে (সূত্র: প্রথম আলো, ডেইলি স্টার)।

টাস্কফোর্স তদন্তের সীমাবদ্ধতা

সরকার ২০২৩ সালে অর্থপাচার ঠেকাতে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেড় হাজারেরও বেশি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে, যেখানে রয়েছে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার সম্পদ শেয়ার। কিন্তু বিদেশ থেকে এখনো এক টাকাও ফেরত আসেনি (সূত্র: দুর্নীতি দমন কমিশন – দুদক, জুন ২০২৫)।

অর্থ ফেরত না আসার পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে ‘লেয়ারিং’—অর্থ পাচারের আন্তর্জাতিক কৌশল যেখানে বিভিন্ন ব্যাংক, অফশোর একাউন্ট ও ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে অর্থ এমনভাবে স্থানান্তর করা হয়, যাতে এর উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্লেষকদের অভিমত: আস্থা সুশাসনের সংকট

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন, নির্বাহী পরিচালক, সিপিডি, বলেন—

“অর্থপাচারের মূল কারণ হলো, দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ লুকানোর চেষ্টা এবং দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্বল আইনের শাসনের কারণে নিরাপত্তাহীনতা।”

ড. জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক, বলেন—

“বিদেশে অর্থ চলে যাওয়ার মানে হলো দেশে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং উৎপাদনের ক্ষতি। এটা শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের লক্ষণ।”

সমাধানের পথ: কঠোর পদক্ষেপ রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন

এই ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত:

  1. বাংলাদেশ ব্যাংক এনবিআরসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।
  2. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
  3. আন্তর্জাতিক চুক্তি সহযোগিতার মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
  4. অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবেতাঁরা যত বড় রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাবশালীই হোন না কেন।
  5. দেশে আস্থা ফিরিয়ে আনতে আইনের শাসন গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা জরুরি।

অর্থপাচার কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনগত ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যতদিন এ ব্যর্থতা চলবে, ততদিন দেশের অর্থনীতি রক্তক্ষরণে জর্জরিত থাকবে। উন্নয়নের মিথ্যা গল্প দিয়ে এই ক্ষত ঢেকে রাখা সম্ভব নয়।

অতএব, এখনই সময়অর্থপাচারের লাগাম টানুন। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এই সংকটে নিষ্ক্রিয়তা আর নয়।

তথ্যসূত্র:

  • Swiss National Bank Annual Report 2024
  • Global Financial Integrity Report (2017)
  • Transparency International Bangladesh (TIB) 2020 Report
  • Center for Policy Dialogue (CPD) Economic Review 2024
  • দৈনিক কালের কণ্ঠ (মে ২০২৫), প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার
  • বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ প্রতিবেদন ২০২৫
  • দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জুন ২০২৫

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

অর্থপাচার এখন জাতীয় দুর্যোগ

Update Time : ১২:১১:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ জুন ২০২৫

ORTHO PACHAR

বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত সংকট এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য গভীর হুমকি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুইস ব্যাংকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি ধনীদের গোপন সম্পদ এবং অর্থ গচ্ছিত থাকার যে তথ্য প্রকাশ হয়েছে, তা দেশবাসীকে হতবাক ও শঙ্কিত করেছে।

সুইস ব্যাংকে আমানত ৩৩ গুণ বৃদ্ধি: কিসের ইঙ্গিত?

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক Swiss National Bank (SNB) সম্প্রতি যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় হাজার ৯৭২ কোটি টাকা, যেখানে ২০২৩ সালে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ২৭০ কোটি টাকা (সূত্র: কালের কণ্ঠ, ২০২৫)। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ৩৩ গুণ বৃদ্ধি অর্থপাচারের ভয়াবহতা প্রকাশ করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হঠাৎ উল্লম্ফন কেবলমাত্র বৈধ বাণিজ্যিক লেনদেন নয় বরং অর্থপাচার ও দুর্নীতির চোরাপথকেই ইঙ্গিত করে। Transfer Pricing, Over-Invoicing, Under-Invoicing, হুন্ডি এবং ফেক কোম্পানি খুলে বিনিয়োগের নামে টাকা বিদেশে সরিয়ে নেওয়া—এসবই অর্থপাচারের পরিচিত কৌশল।

বিদেশে বাড়িসম্পদ গোল্ডেন ভিসা ট্র্যাপ

বাংলাদেশিদের মধ্যে ‘গোল্ডেন ভিসা’ বা বিদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, কানাডা, দুবাই, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের কয়েকটি দেশ—এসব স্থানে বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যবসা ও ব্যাংক একাউন্ট খোলা এখন নতুন ধনী শ্রেণির নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

Global Financial Integrity (GFI)–এর ২০১৭ সালের এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে ৭৫ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় হাজার কোটি টাকা) পাচার হয়েছে। পরবর্তীতে ২০২০ সালে সিপিডি এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণাতেও দেখা যায়, অর্থপাচারের মূল চালিকাশক্তি হলো—দুর্নীতি, অবৈধ আর্থিক প্রবাহ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

ব্যাংকিং খাতে বিপর্যয়: অনিয়মই কি পাচারের পথ

খুলছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ ফেরত না দিয়ে তা বিদেশে পাচার বা অন্য কাজে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।

এত বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের পিছনে দায়ী কিছু ব্যাংক মালিক, বড় ব্যবসায়ী রাজনীতিকদের মধ্যে গড়ে ওঠা ‘কার্টেল’। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ১০টি ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে চাইলেও, সরকারের উচ্চমহল থেকে চাপের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অভিযোগ উঠে (সূত্র: প্রথম আলো, ডেইলি স্টার)।

টাস্কফোর্স তদন্তের সীমাবদ্ধতা

সরকার ২০২৩ সালে অর্থপাচার ঠেকাতে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেড় হাজারেরও বেশি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে, যেখানে রয়েছে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার সম্পদ শেয়ার। কিন্তু বিদেশ থেকে এখনো এক টাকাও ফেরত আসেনি (সূত্র: দুর্নীতি দমন কমিশন – দুদক, জুন ২০২৫)।

অর্থ ফেরত না আসার পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে ‘লেয়ারিং’—অর্থ পাচারের আন্তর্জাতিক কৌশল যেখানে বিভিন্ন ব্যাংক, অফশোর একাউন্ট ও ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে অর্থ এমনভাবে স্থানান্তর করা হয়, যাতে এর উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্লেষকদের অভিমত: আস্থা সুশাসনের সংকট

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন, নির্বাহী পরিচালক, সিপিডি, বলেন—

“অর্থপাচারের মূল কারণ হলো, দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ লুকানোর চেষ্টা এবং দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্বল আইনের শাসনের কারণে নিরাপত্তাহীনতা।”

ড. জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক, বলেন—

“বিদেশে অর্থ চলে যাওয়ার মানে হলো দেশে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং উৎপাদনের ক্ষতি। এটা শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের লক্ষণ।”

সমাধানের পথ: কঠোর পদক্ষেপ রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন

এই ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত:

  1. বাংলাদেশ ব্যাংক এনবিআরসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।
  2. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
  3. আন্তর্জাতিক চুক্তি সহযোগিতার মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
  4. অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবেতাঁরা যত বড় রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাবশালীই হোন না কেন।
  5. দেশে আস্থা ফিরিয়ে আনতে আইনের শাসন গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা জরুরি।

অর্থপাচার কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনগত ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যতদিন এ ব্যর্থতা চলবে, ততদিন দেশের অর্থনীতি রক্তক্ষরণে জর্জরিত থাকবে। উন্নয়নের মিথ্যা গল্প দিয়ে এই ক্ষত ঢেকে রাখা সম্ভব নয়।

অতএব, এখনই সময়অর্থপাচারের লাগাম টানুন। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এই সংকটে নিষ্ক্রিয়তা আর নয়।

তথ্যসূত্র:

  • Swiss National Bank Annual Report 2024
  • Global Financial Integrity Report (2017)
  • Transparency International Bangladesh (TIB) 2020 Report
  • Center for Policy Dialogue (CPD) Economic Review 2024
  • দৈনিক কালের কণ্ঠ (মে ২০২৫), প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার
  • বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ প্রতিবেদন ২০২৫
  • দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জুন ২০২৫