সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মামলা পরিচালনায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের ফান্ড সংগ্রহের উদ্যোগ

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৩০:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ জুন ২০২৫
  • / ২২৮ Time View

1749898865 22c9e405064e94a2dff4fc56ec010e2c

1749898865 22c9e405064e94a2dff4fc56ec010e2c

বাংলাদেশের পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে নতুন গতি আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের মধ্যে ৩০টি বড় মামলার খরচ চালাতে ১০০ মিলিয়ন ডলারের লিটিগেশন ফান্ড গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। গত ১০–১৩ জুন লন্ডনে চার দিনের সরকারি সফরে থাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ‘ডিএলএ পাইপার’ আয়োজিত একটি উচ্চ পর্যায়ের গোলটেবিল আলোচনায় এ তথ্য জানান। আলোচনায় বিশ্বখ্যাত লিটিগেশন ফান্ডিং প্রতিষ্ঠান ও তদন্ত সংস্থাগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টাকে নয়া মাত্রা দেয়।

গোলটেবিল বৈঠকে ‍ওমনি ব্রিজওয়ে, বেঞ্চওয়াক ক্যাপিটাল, আলভারেজ অ্যান্ড মার্সাল ও ইউনিটাস গ্লোবালসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা গোপনীয়তা চুক্তি (NDA) স্বাক্ষর করে দ্রুত তথ্য আদান–প্রদানের ওপর জোর দেন। তাঁদের মতে, ঋণখেলাপি ও অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা নিতে এ ধারাবাহিক সমন্বয় জরুরি।

ড. মনসুর জানান, বিদেশে থাকা পাচারকৃত সম্পদ ফেরত আনতে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের মতো প্রধান অর্থপাচার গন্তব্যে ‘স্পেশাল পারপাস ভেহিকল’ (SPV) গঠন করা হবে। এ ব্যবস্থা মামলা পরিচালনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে, দীর্ঘস্বত্ব বজায় রাখবে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাবে। একই সঙ্গে লিটিগেশন ফান্ডিং ও বিশেষজ্ঞ তদন্ত সংস্থার সহায়তায় প্রমাণ সংগ্রহ, স্বল্পসময়ে মামলা নিষ্পত্তি ও আদায়-পরবর্তী সম্পদ হস্তান্তর—সব কিছুকেই এক ছাতার নিচে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র জানায়, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও জব্দে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি এসেছে। যুক্তরাজ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ১৭০ মিলিয়ন ও বেক্সিমকো গ্রুপের শায়ান ও শাহরিয়ার রহমানের ৯০ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এসব সাফল্য দেশে যেমন আস্থা বাড়িয়েছে, তেমনি অন্য অর্থপাচার গন্তব্য দেশগুলোকেও সহযোগিতায় আগ্রহী করছে।

১১ জুন গভর্নর ও দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন ব্রিটিশ ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (NCA) সদরদপ্তর পরিদর্শন করেন এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বর্পূর্ণ সম্পদ পুনরুদ্ধার দলে যুক্তরাজ্যের সহায়তা জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করেন। সেখানে আন্তর্জাতিক সচিবালয় ফর রিকভারি অ্যান্ড রিটার্ন অব এসেটস (ISCCC) প্রধান ড্যানিয়েল মারফির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের সম্পদ পুনরুদ্ধার টাস্কফোর্স ও NCA‑র চলমান সহযোগিতা আরও দৃঢ় করার আহ্বান জানান গভর্নর।

বিশ্লেষকদের মতে, ১০০ মিলিয়ন ডলারের লিটিগেশন ফান্ড গঠন শুধু মামলাগুলোর আর্থিক চাহিদা পূরণই করবে না, বরং বহুপাক্ষিক অংশীদারিত্ব ও প্রযুক্তিগত সমর্থন সুনিশ্চিত করে তুলবে। এতে করে আন্তর্জাতিক আদালত ও মধ্যস্থতা কাঠামোয় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে, যা ভবিষ্যতে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি মামলাগুলোর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ নজির গড়ে দেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, লন্ডন বৈঠকের ফলশ্রুতি হিসেবে শিগগিরই বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময় চুক্তি চূড়ান্ত হবে। এর মাধ্যমে পাচারকৃত সম্পদ শনাক্ত, আইনি সতর্কতা জারি এবং আদালতের নির্দেশে দ্রুত জব্দ কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হবে।

সব মিলিয়ে, ড. আহসান এইচ মনসুরের এ ঘোষণাকে দেশের সম্পদ পুনরুদ্ধার অভিযানের নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১০০ মিলিয়ন ডলারের লিটিগেশন ফান্ড— SPV‑ভিত্তিক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক অংশীদার—একত্রে বাংলাদেশের আর্থিক স্বার্থ রক্ষায় বহির্বিশ্বে শক্ত অবস্থান তৈরি করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

মামলা পরিচালনায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের ফান্ড সংগ্রহের উদ্যোগ

Update Time : ১০:৩০:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ জুন ২০২৫

1749898865 22c9e405064e94a2dff4fc56ec010e2c

বাংলাদেশের পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে নতুন গতি আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের মধ্যে ৩০টি বড় মামলার খরচ চালাতে ১০০ মিলিয়ন ডলারের লিটিগেশন ফান্ড গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। গত ১০–১৩ জুন লন্ডনে চার দিনের সরকারি সফরে থাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ‘ডিএলএ পাইপার’ আয়োজিত একটি উচ্চ পর্যায়ের গোলটেবিল আলোচনায় এ তথ্য জানান। আলোচনায় বিশ্বখ্যাত লিটিগেশন ফান্ডিং প্রতিষ্ঠান ও তদন্ত সংস্থাগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টাকে নয়া মাত্রা দেয়।

গোলটেবিল বৈঠকে ‍ওমনি ব্রিজওয়ে, বেঞ্চওয়াক ক্যাপিটাল, আলভারেজ অ্যান্ড মার্সাল ও ইউনিটাস গ্লোবালসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা গোপনীয়তা চুক্তি (NDA) স্বাক্ষর করে দ্রুত তথ্য আদান–প্রদানের ওপর জোর দেন। তাঁদের মতে, ঋণখেলাপি ও অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা নিতে এ ধারাবাহিক সমন্বয় জরুরি।

ড. মনসুর জানান, বিদেশে থাকা পাচারকৃত সম্পদ ফেরত আনতে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের মতো প্রধান অর্থপাচার গন্তব্যে ‘স্পেশাল পারপাস ভেহিকল’ (SPV) গঠন করা হবে। এ ব্যবস্থা মামলা পরিচালনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে, দীর্ঘস্বত্ব বজায় রাখবে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাবে। একই সঙ্গে লিটিগেশন ফান্ডিং ও বিশেষজ্ঞ তদন্ত সংস্থার সহায়তায় প্রমাণ সংগ্রহ, স্বল্পসময়ে মামলা নিষ্পত্তি ও আদায়-পরবর্তী সম্পদ হস্তান্তর—সব কিছুকেই এক ছাতার নিচে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র জানায়, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও জব্দে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি এসেছে। যুক্তরাজ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ১৭০ মিলিয়ন ও বেক্সিমকো গ্রুপের শায়ান ও শাহরিয়ার রহমানের ৯০ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এসব সাফল্য দেশে যেমন আস্থা বাড়িয়েছে, তেমনি অন্য অর্থপাচার গন্তব্য দেশগুলোকেও সহযোগিতায় আগ্রহী করছে।

১১ জুন গভর্নর ও দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন ব্রিটিশ ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (NCA) সদরদপ্তর পরিদর্শন করেন এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বর্পূর্ণ সম্পদ পুনরুদ্ধার দলে যুক্তরাজ্যের সহায়তা জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করেন। সেখানে আন্তর্জাতিক সচিবালয় ফর রিকভারি অ্যান্ড রিটার্ন অব এসেটস (ISCCC) প্রধান ড্যানিয়েল মারফির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের সম্পদ পুনরুদ্ধার টাস্কফোর্স ও NCA‑র চলমান সহযোগিতা আরও দৃঢ় করার আহ্বান জানান গভর্নর।

বিশ্লেষকদের মতে, ১০০ মিলিয়ন ডলারের লিটিগেশন ফান্ড গঠন শুধু মামলাগুলোর আর্থিক চাহিদা পূরণই করবে না, বরং বহুপাক্ষিক অংশীদারিত্ব ও প্রযুক্তিগত সমর্থন সুনিশ্চিত করে তুলবে। এতে করে আন্তর্জাতিক আদালত ও মধ্যস্থতা কাঠামোয় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে, যা ভবিষ্যতে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি মামলাগুলোর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ নজির গড়ে দেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, লন্ডন বৈঠকের ফলশ্রুতি হিসেবে শিগগিরই বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময় চুক্তি চূড়ান্ত হবে। এর মাধ্যমে পাচারকৃত সম্পদ শনাক্ত, আইনি সতর্কতা জারি এবং আদালতের নির্দেশে দ্রুত জব্দ কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হবে।

সব মিলিয়ে, ড. আহসান এইচ মনসুরের এ ঘোষণাকে দেশের সম্পদ পুনরুদ্ধার অভিযানের নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১০০ মিলিয়ন ডলারের লিটিগেশন ফান্ড— SPV‑ভিত্তিক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক অংশীদার—একত্রে বাংলাদেশের আর্থিক স্বার্থ রক্ষায় বহির্বিশ্বে শক্ত অবস্থান তৈরি করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।