ইরানে ভয়াবহ হামলার পর ইসরায়েলজুড়ে জরুরি অবস্থা: উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্যে আরও এক অশান্তির সূচনা
- Update Time : ১১:০৩:২২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ জুন ২০২৫
- / ৩০১ Time View

ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যাপক আক্রমণের পর সারা ইসরায়েলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তেহরানের প্রতিশোধের আশঙ্কায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। তেল আবিব, হাইফা, এবং জেরুজালেমসহ বিভিন্ন শহরে উচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে এবং জনসাধারণকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই জেরুজালেমে সতর্কতা সাইরেন বেজে উঠেছে।
ইসরায়েলি সরকার একে একটি “প্রতিরোধমূলক অভিযান” বলে উল্লেখ করেছে। ‘রাইজিং লায়ন’ নামের এই সামরিক অভিযানে ইরানের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সুবিধা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং পারমাণবিক বোমা নির্মাণে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় বলেন, “আমরা আমাদের অস্তিত্বের সংকটে আছি। এটি ইসরায়েলের ইতিহাসে একটি নির্ণায়ক মুহূর্ত। ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলে, তবে এটি শুধু ইসরায়েলের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।” তিনি আরও বলেন, “এই অভিযান চলবে যতক্ষণ না আমাদের লক্ষ্য পূর্ণ হয়।”
নাতাঞ্জে হামলা ও বিস্ফোরণের শব্দ: তেহরানে নিরাপত্তা বৈঠক
ইরানের নাতাঞ্জ শহরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলোর কাছে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, রাজধানী তেহরানেও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে এবং দেশজুড়ে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, “এই হামলার পরপরই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বৈঠকে বসেছেন। আমরা কৌশলগত জবাব দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছি।” এখন পর্যন্ত ইরান আনুষ্ঠানিক প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু না করলেও, প্রস্তুতি ও হুঁশিয়ারির ইঙ্গিত স্পষ্ট।
ইসরায়েল বলছে, ইরানের আছে ১৫টি বোমার উপাদান
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, “আমরা ইরানের ডজনখানেক সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছি। আমাদের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে এমন উপাদান রয়েছে যার সাহায্যে তারা কয়েক দিনের মধ্যে ১৫টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে সক্ষম।”
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কার্টজ বলেন, “এই হামলা ইসরায়েলের জনগণ ও রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। তবে আমরা জানি, এর জবাবে ইরান আমাদের বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্যবস্তু করবে, সেজন্যই দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: দূরত্ব বজায় রেখে সতর্ক বার্তা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, “ইসরায়েল একতরফাভাবে এ হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এতে জড়িত নয়। আমাদের অগ্রাধিকার হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।” তিনি সতর্ক করে বলেন, “ইরানের উচিত যুক্তরাষ্ট্র বা আমাদের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু না করা।”
রুবিও আরও বলেন, “আমরা ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সম্মান করি, তবে এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চায় না।”
উত্তেজনা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে: মধ্যপ্রাচ্য অস্থিরতার দ্বারপ্রান্তে
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হামলা ও পাল্টা পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারে। গাজা, লেবানন, সিরিয়া এবং ইয়েমেনে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা প্রবল। হিজবুল্লাহ বা হুতি বিদ্রোহীরা ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে নতুন হামলা চালাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি শুধু ইসরায়েল-ইরান দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর অভিঘাত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে গোটা বিশ্বের নজর তেহরান ও তেল আবিবের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। সময়ই বলে দেবে—এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি অবশেষে কোথায় গড়ায়।











