রণক্ষেত্র লস অ্যাঞ্জেলেস: অভিবাসন অভিযানের জেরে উত্তাল শহর, সংঘর্ষে আহত বহু, মোতায়েন ন্যাশনাল গার্ড
- Update Time : ০২:১৬:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ জুন ২০২৫
- / ২৯৭ Time View

লস অ্যাঞ্জেলেসে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) কর্তৃক পরিচালিত ব্যাপক অভিবাসন প্রয়োগ অভিযানের পর, শহরজুড়ে বিক্ষোভের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। এই বিক্ষোভ ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে সংঘর্ষে, আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শহরে মোতায়েন করা হয়েছে ন্যাশনাল গার্ড।
শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন সপ্তাহান্তে চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। রবিবার বিকেলে ডাউনটাউন লস অ্যাঞ্জেলেসের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারের আশপাশে জড়ো হওয়া হাজারো বিক্ষোভকারীর সঙ্গে সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ন্যাশনাল গার্ড কাঁদানে গ্যাস এবং অহিংস রাউন্ড ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে চেষ্টা করে।
বিশেষ করে ওয়েস্টলেক, ডাউনটাউন এল.এ. এবং প্যারামাউন্ট এলাকায় বিক্ষোভ সবচেয়ে তীব্র ছিল। শহরের বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় আগুন, যানবাহন ভাঙচুর, সরকারবিরোধী স্লোগান এবং সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার ও শনিবার সংঘর্ষে একাধিক ফেডারেল এজেন্ট আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন এক কর্মকর্তা।
রবিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এলএপিডি প্রধান জিম ম্যাকডোনেল জানান, সহিংসতার জেরে শনিবার ২৯ জন এবং রবিবার ১০ জন সহ মোট ৩৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পুলিশ যথাসময়ে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ক্যালিফোর্নিয়া ভ্যালুস অ্যাক্ট অনুযায়ী স্থানীয় সংস্থা কোনোভাবে ফেডারেল অভিবাসন প্রয়োগে সহায়তা করতে পারে না।
শনিবার রাতে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে বলেন, “লস অ্যাঞ্জেলেসে দুই দিনের সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা এবং জননিরাপত্তাহীনতা চলমান দাঙ্গায় রূপ নিয়েছে।” তিনি গভর্নর গ্যাভিন নিউজম ও মেয়র কারেন বাসকে জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশের আহ্বান জানান এবং বলেন, “জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমি ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করছি।”
এক সরকারি স্মারকলিপি অনুযায়ী, অন্তত ২,০০০ ন্যাশনাল গার্ড সেনা মোতায়েন করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত সেনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইউএস নর্দার্ন কমান্ড নিশ্চিত করেছে, টোয়েন্টি নাইন পামসে অবস্থানরত ৫০০ জন ইউএস মেরিন সেনা মোতায়েনের নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
গভর্নর গ্যাভিন নিউজম এই মোতায়েনকে “উসকানিমূলক পদক্ষেপ” হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্পকে এর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “ট্রাম্প নিজেই পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছেন।” রবিবার তিনি এলএপিডি প্রধান এবং এলএ কাউন্টি শেরিফের সাথে এক জরুরি বৈঠকে বসেন।
মেয়র কারেন বাসও ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের সিদ্ধান্তকে তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “এই পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।” সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস এটিকে একটি “বিপজ্জনক উসকানি” বলে আখ্যায়িত করেন।
রবিবার দুপুর পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে চলা বিক্ষোভ হঠাৎ করেই সহিংস রূপ নেয়। বিকেল ৩টার দিকে একটি মিছিল ফেডারেল ডিটেনশন সেন্টারের দিকে এগিয়ে গেলে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ হয়। এলএপিডি জানায়, বিক্ষোভকারীরা প্রজেক্টাইল ও কংক্রিটের টুকরা নিক্ষেপ করলে তারা কৌশলগত সতর্কতা জারি করে এবং টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এই সংঘর্ষে দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন এবং দুজন মোটরসাইকেল আরোহীকে আটক করা হয়। সিবিএস নিউজ জানায়, কয়েকটি ওয়েমো চালকবিহীন গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ে এবং ছোট ছোট বিস্ফোরণ ঘটে।
বিক্ষোভকারীরা টেম্পল ও মেইন স্ট্রিটে রাস্তা অবরোধ করে চেয়ার, আবর্জনার বাক্স, ট্র্যাফিক সাইন দিয়ে ব্যারিকেড গড়ে তোলে। একটি মেট্রো বাসও অবরুদ্ধ হয় এবং তাতে আইসিই বিরোধী বার্তা স্প্রে করা হয়। ১০১ ফ্রিওয়েতে ঢুকে পড়ে বিক্ষোভকারীরা ব্যাপক যানজট সৃষ্টি করে, যার ফলে ক্যালিফোর্নিয়া হাইওয়ে পেট্রোল ডাউনটাউন এলাকার ফ্রিওয়ে বন্ধ করে দেয়।
পুলিশ জানায়, পরবর্তীতে কিছু বিক্ষোভকারী ওভারপাস থেকে আতশবাজি, স্কুটার এবং কংক্রিটের টুকরা ছুড়লে একটি সিএইচপি গাড়িতে আগুন ধরে যায়। ১০১ ফ্রিওয়ের দক্ষিণমুখী লেন বন্ধ রাখা হয়েছে যতক্ষণ না এলাকা সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ ও পরিষ্কার ঘোষণা করা যায়।
এদিকে, মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ন্যানেট ব্যারগান জানান, আগামী ৩০ দিন ধরে লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টিতে প্রতিদিন আইসিই-এর অভিবাসন ও অপসারণ অভিযান চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফেডারেল সূত্রে জানা গেছে, এলএ কাউন্টি শেরিফ ডিপার্টমেন্ট শুধুমাত্র পেরিমিটার নিরাপত্তায় সহায়তা দিচ্ছে; তারা সরাসরি কোনো অভিবাসন অভিযানে অংশ নিচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে লস অ্যাঞ্জেলেসে এক অস্থির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। রাজ্য ও ফেডারেল প্রশাসনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব যেমন প্রকাশ পাচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষ ও অভিবাসীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে গভীর উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এমন কঠোর অবস্থান ও সামরিক মোতায়েন কেবল উত্তেজনা বাড়াবে এবং একটি গৃহবিরোধী পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।











