বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে: প্রায় ৩০ কোটি মানুষ চরম ক্ষুধার ঝুঁকিতে- জাতিসংঘ
- Update Time : ১১:০৯:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ মে ২০২৫
- / ৩৩৩ Time View

বিশ্ব এখন এক ভয়াবহ খাদ্য সঙ্কটের মুখোমুখি, যা কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে ফেলেছে। জাতিসংঘের অধীনস্থ সংস্থা গুলোর সহযোগিতায় প্রকাশিত ২০২৪ সালের গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস (GRFC) অনুযায়ী, ৫৩টি দেশ ও অঞ্চলে প্রায় ২৯৮ মিলিয়ন মানুষ বর্তমানে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে—যা বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুরতার জ্বলন্ত প্রমাণ।
এই বিশ্লেষণটি পরিচালনা করেছে Global Network Against Food Crises, এবং এতে অংশগ্রহণ করেছে Food and Agriculture Organization (FAO), World Food Programme (WFP) ও UNICEF। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ছয় বছর ধরেই খাদ্য সংকটে (IPC Phase 3 বা তদূর্ধ্ব) মানুষের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
শুধু ২০২৩ সালেই, আরও ১ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ চরম ক্ষুধার কবলে পড়ে, যা সংকটের ব্যাপকতা ও দ্রুততা নির্দেশ করে।
কেন বাড়ছে খাদ্য সংকট: চারটি মূল কারণ
GRFC এই বৈশ্বিক সংকটের পেছনে চারটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে:
১. সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা
খাদ্য সংকটের সবচেয়ে বড় কারণ যুদ্ধ ও সহিংসতা। যুদ্ধ মানুষের বাসস্থান ধ্বংস করে, কৃষিজমি পরিত্যক্ত হয়, বাজার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, এবং মানবিক সাহায্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
উদাহরণস্বরূপ, সুদানের গৃহযুদ্ধে ২ কোটিরও বেশি মানুষ চরম ক্ষুধায় পড়েছে। গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ২০২৪ সালের মার্চে পূর্ণ অবরোধের কারণে ২১ লাখ মানুষের কাছে খাদ্য ও ওষুধ পৌছানো বন্ধ হয়ে গেছে। IPC-এর বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার প্রায় পুরো জনসংখ্যাই এখন অনাহারের মুখোমুখি।
২. মানবিক সাহায্যের ঘাটতি
যখন প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, তখনই আর্থিক সহায়তা হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে USAID-এর বাজেট কাটছাঁট অনেক দেশের খাদ্য ও পুষ্টি কর্মসূচি বন্ধ বা সীমিত করে দিয়েছে।
ইয়েমেন, হাইতি, এবং সুদানে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ শিশু তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা হারিয়েছে, যার ফলে অপুষ্টি, বিকলাঙ্গতা, ও মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণে বেড়েছে।
৩. জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত চাপ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ—এই ত্র্যহস্পর্শে বিধ্বস্ত হচ্ছে কৃষি ব্যবস্থা। বিশেষত পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটে রয়েছে।
ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, ও কেনিয়া—একাধিক বছরের খরায় কৃষি ধ্বংসপ্রায়। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান একই সঙ্গে খরা ও আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত।
৪. বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা
কোভিড–১৯, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, এবং বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির কারণে খাদ্যদ্রব্যের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে দরিদ্র মানুষ খাবার কিনতেই পারছে না।
অনেক দেশে মানুষ তাদের ৭০% আয় শুধু খাবারে ব্যয় করছে, ফলে একবেলা খাওয়ার ব্যবস্থাও করা যাচ্ছে না।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো: কাছ থেকে নজর
গাজা: ২১ লাখ মানুষের খাদ্য সরবরাহ বন্ধ। শিশুরা মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে।
সুদান: ২ কোটির বেশি মানুষ ক্ষুধায়। যুদ্ধ কৃষি ব্যবস্থা ও সরবরাহ চেইন ধ্বংস করে দিয়েছে।
হাইতি: গ্যাং সহিংসতা ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় নগরগুলো খাদ্য মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণ সুদান ও মালি: দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতায় গ্রামের মানুষদের জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে।
ডিআর কঙ্গো, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া: সহিংসতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে খাদ্য সংকট ক্রমেই বাড়ছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু জনগোষ্ঠী
এই সংকটে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। যেসব অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা নেই, সেখানে তীব্র অপুষ্টি, সংক্রমণ, এবং বাঁচার সম্ভাবনা হ্রাস পাচ্ছে। UNICEF জানায়, লাখ লাখ শিশু মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যাদের মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য।
সুদান, ইয়েমেন ও সোমালিয়ার শিশু হাসপাতালে জায়গা নেই, ওষুধ নেই, আর চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন।
সমাধানের পথ: জরুরি পদক্ষেপ ও জবাবদিহিতা
এই রিপোর্টে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যে, দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া ২০২৫ সালের মধ্যেই একাধিক অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে।
প্রধান সুপারিশগুলো হলো:
- খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা দ্রুত পুনরুদ্ধার ও বাড়ানো
- জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ঝুঁকি সতর্কতা ব্যবস্থা গঠন
- সশস্ত্র সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধান এবং মানবিক করিডোর তৈরিতে চাপ প্রয়োগ
- সতর্কতামূলক তথ্যসংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার
- অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণ ও মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সহায়তা প্রদান
খাদ্য সংকট শুধু মানবিক নয়, এটি বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। এই সংকট দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে এবং আমাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত দুর্বলতা উন্মোচন করছে।
যদি এখনই বিশ্বব্যাপী পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়বে এবং মানবিক বিপর্যয় এক ভয়াবহ চেহারা ধারণ করবে।
২০২৪ সালের গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস একটি কঠিন সতর্কবার্তা—বিশ্বনেতা, মানবিক সংস্থা ও সমাজের সকল স্তরের জন্য। এখনো সময় আছে, তবে তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।











