সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ ২০২৪ সালে বিশ্বের ১৪তম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ: টিআইবি

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৫:১২:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
  • / ২৫৭ Time View

TIB 11

 

২০২৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক (CPI) অনুসারে, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ১৪তম স্থানে রয়েছে। ২০২৩ সালে এই অবস্থান ছিল ১০ম। যদিও তালিকায় বাংলাদেশের চার ধাপ উন্নতি হয়েছে, এটি দুর্নীতি হ্রাসের কারণে নয়; বরং অন্যান্য দেশের অবনতি বাংলাদেশকে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে দিয়েছে।

দুর্নীতির স্কোর অবস্থান পরিবর্তন

২০২৩ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১০০-এর মধ্যে ২৪, যা ২০২৪ সালে কমে ২৩ হয়েছে। অর্থাৎ, দুর্নীতি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা তুলনামূলক ভালো বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এই সূচক অনুসারে, ২০২৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে কম দুর্নীতি হয়েছে ডেনমার্কে, যেখানে স্কোর ৯০। অপরদিকে, দক্ষিণ সুদান সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যার স্কোর মাত্র ৮।

টিআইবি প্রতিবেদন

মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে এই সূচক প্রস্তুত করা হয়েছে। দুর্নীতির ধারণার মাত্রা নির্ধারণে ০ থেকে ১০০ স্কেল ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে ০ সর্বোচ্চ দুর্নীতিপূর্ণ এবং ১০০ সর্বনিম্ন দুর্নীতিপূর্ণ পরিস্থিতিকে নির্দেশ করে। টিআইবির মতে, এই সূচক তৈরিতে ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, বিশ্লেষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের তথ্য ও অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান

২০২৪ সালে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫১তম স্থানে রয়েছে, যা ২০২৩ সালে ১৪৯তম ছিল। অর্থাৎ, দুর্নীতি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের দুই ধাপ অবনতি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম দুর্নীতি হয়েছে ভুটানে, যা ১০০-এর মধ্যে ৭২ স্কোর পেয়ে ১৮তম স্থানে রয়েছে। ভারতের স্কোর ৩৯, পাকিস্তানের ২৯ এবং নেপালের ৩৪, যা বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলক ভালো। তবে দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশেই দুর্নীতির মাত্রা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় বেড়েছে।

সবচেয়ে কম দুর্নীতিপূর্ণ দেশ

CPI অনুসারে, বিশ্বের সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত পাঁচটি দেশ হলো:

  1. ডেনমার্ক (৯০ স্কোর)
  2. ফিনল্যান্ড (৮৮ স্কোর)
  3. সিঙ্গাপুর (৮৪ স্কোর)
  4. নিউজিল্যান্ড (৮৩ স্কোর)
  5. লুক্সেমবার্গ, নরওয়ে সুইজারল্যান্ড (৮১ স্কোর, যৌথভাবে পঞ্চম স্থান)

সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ

২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  1. দক্ষিণ সুদান (৮ স্কোর)
  2. সোমালিয়া
  3. ভেনেজুয়েলা
  4. সিরিয়া

দুর্নীতি বৃদ্ধির কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে দুর্নীতি বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • রাজনৈতিক প্রভাব স্বজনপ্রীতি: সরকারি নিয়োগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দুর্নীতি বেড়েছে।
  • নিয়ন্ত্রণ জবাবদিহিতার অভাব: সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব থাকায় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
  • আইন প্রয়োগের দুর্বলতা: দুর্নীতির ঘটনায় বিচার ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ায় অপরাধীরা শাস্তি থেকে মুক্তি পাচ্ছে, যা দুর্নীতিকে উৎসাহিত করছে।
  • অবৈধ অর্থের প্রবাহ: দেশে কালো টাকার প্রচলন ও মানি লন্ডারিংয়ের কারণে দুর্নীতির মাত্রা আরও বেড়েছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণ

প্রতিবেদন প্রকাশের সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা গভীর উদ্বেগজনক। সরকারের দুর্নীতি দমনের প্রচেষ্টা প্রকৃতপক্ষে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার দিকে ধাবিত হয়েছে। গত ১৩ বছরে বাংলাদেশে দুর্নীতির পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটেছে, যা এই সূচকের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, সরকার যদি দুর্নীতি দমনে আন্তরিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

করণীয়

দুর্নীতি প্রতিরোধে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:

  • স্বাধীন কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠন
  • রাজনৈতিক দল প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
  • গণমাধ্যম নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি
  • দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ শাস্তির বিধান
  • সরকারি বেসরকারি খাতে স্বচ্ছ নীতি প্রযুক্তির ব্যবহার

টিআইবির এই প্রতিবেদন দেশের নীতি-নির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা হিসাবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। দুর্নীতি হ্রাসে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও নাজুক হতে পারে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বাংলাদেশ ২০২৪ সালে বিশ্বের ১৪তম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ: টিআইবি

Update Time : ০৫:১২:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

 

২০২৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক (CPI) অনুসারে, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ১৪তম স্থানে রয়েছে। ২০২৩ সালে এই অবস্থান ছিল ১০ম। যদিও তালিকায় বাংলাদেশের চার ধাপ উন্নতি হয়েছে, এটি দুর্নীতি হ্রাসের কারণে নয়; বরং অন্যান্য দেশের অবনতি বাংলাদেশকে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে দিয়েছে।

দুর্নীতির স্কোর অবস্থান পরিবর্তন

২০২৩ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১০০-এর মধ্যে ২৪, যা ২০২৪ সালে কমে ২৩ হয়েছে। অর্থাৎ, দুর্নীতি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা তুলনামূলক ভালো বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এই সূচক অনুসারে, ২০২৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে কম দুর্নীতি হয়েছে ডেনমার্কে, যেখানে স্কোর ৯০। অপরদিকে, দক্ষিণ সুদান সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যার স্কোর মাত্র ৮।

টিআইবি প্রতিবেদন

মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে এই সূচক প্রস্তুত করা হয়েছে। দুর্নীতির ধারণার মাত্রা নির্ধারণে ০ থেকে ১০০ স্কেল ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে ০ সর্বোচ্চ দুর্নীতিপূর্ণ এবং ১০০ সর্বনিম্ন দুর্নীতিপূর্ণ পরিস্থিতিকে নির্দেশ করে। টিআইবির মতে, এই সূচক তৈরিতে ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, বিশ্লেষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের তথ্য ও অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান

২০২৪ সালে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫১তম স্থানে রয়েছে, যা ২০২৩ সালে ১৪৯তম ছিল। অর্থাৎ, দুর্নীতি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের দুই ধাপ অবনতি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম দুর্নীতি হয়েছে ভুটানে, যা ১০০-এর মধ্যে ৭২ স্কোর পেয়ে ১৮তম স্থানে রয়েছে। ভারতের স্কোর ৩৯, পাকিস্তানের ২৯ এবং নেপালের ৩৪, যা বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলক ভালো। তবে দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশেই দুর্নীতির মাত্রা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় বেড়েছে।

সবচেয়ে কম দুর্নীতিপূর্ণ দেশ

CPI অনুসারে, বিশ্বের সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত পাঁচটি দেশ হলো:

  1. ডেনমার্ক (৯০ স্কোর)
  2. ফিনল্যান্ড (৮৮ স্কোর)
  3. সিঙ্গাপুর (৮৪ স্কোর)
  4. নিউজিল্যান্ড (৮৩ স্কোর)
  5. লুক্সেমবার্গ, নরওয়ে সুইজারল্যান্ড (৮১ স্কোর, যৌথভাবে পঞ্চম স্থান)

সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ

২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  1. দক্ষিণ সুদান (৮ স্কোর)
  2. সোমালিয়া
  3. ভেনেজুয়েলা
  4. সিরিয়া

দুর্নীতি বৃদ্ধির কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে দুর্নীতি বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • রাজনৈতিক প্রভাব স্বজনপ্রীতি: সরকারি নিয়োগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দুর্নীতি বেড়েছে।
  • নিয়ন্ত্রণ জবাবদিহিতার অভাব: সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব থাকায় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
  • আইন প্রয়োগের দুর্বলতা: দুর্নীতির ঘটনায় বিচার ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ায় অপরাধীরা শাস্তি থেকে মুক্তি পাচ্ছে, যা দুর্নীতিকে উৎসাহিত করছে।
  • অবৈধ অর্থের প্রবাহ: দেশে কালো টাকার প্রচলন ও মানি লন্ডারিংয়ের কারণে দুর্নীতির মাত্রা আরও বেড়েছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণ

প্রতিবেদন প্রকাশের সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা গভীর উদ্বেগজনক। সরকারের দুর্নীতি দমনের প্রচেষ্টা প্রকৃতপক্ষে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার দিকে ধাবিত হয়েছে। গত ১৩ বছরে বাংলাদেশে দুর্নীতির পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটেছে, যা এই সূচকের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, সরকার যদি দুর্নীতি দমনে আন্তরিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

করণীয়

দুর্নীতি প্রতিরোধে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:

  • স্বাধীন কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠন
  • রাজনৈতিক দল প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
  • গণমাধ্যম নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি
  • দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ শাস্তির বিধান
  • সরকারি বেসরকারি খাতে স্বচ্ছ নীতি প্রযুক্তির ব্যবহার

টিআইবির এই প্রতিবেদন দেশের নীতি-নির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা হিসাবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। দুর্নীতি হ্রাসে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও নাজুক হতে পারে।