দাবানলে ঠিক কতটা দগ্ধ হলিউড?
- Update Time : ০৯:২২:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৫
- / ২১৮ Time View

ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের চলমান দাবানল এখন কেবল স্থানীয় জনগণের জন্য নয়, বৈশ্বিক বিনোদন শিল্পের জন্যও এক বিরাট বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ২৫ ছাড়িয়েছে, ধসে গেছে ১২ হাজারের বেশি স্থাপনা। লাখো মানুষ ঘরছাড়া হয়ে আশ্রয়হীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার এই বিপর্যয়মূলক অবস্থার কেন্দ্রে থাকা লস অ্যাঞ্জেলেস, যেটি বিনোদন শিল্পের রাজধানী বলে পরিচিত, সেখানকার অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং বিশ্বমঞ্চে প্রভাব ফেলছে।
হলিউডের ব্যবসায়িক ক্ষতি
বিনোদন শিল্প প্রতি বছর ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতিতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি ডলার যোগ করে। দাবানল এই বিশাল অর্থনৈতিক প্রবাহে ধস নামিয়েছে। সিনেমা ও সিরিজের শুটিং বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ইভেন্ট ও প্রিমিয়ার বাতিল হওয়ায় বিনোদন খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
অস্কার অনুষ্ঠানের ভবিষ্যৎ
দাবানলের কারণে গুঞ্জন উঠেছে যে, আগামী ২ মার্চ অনুষ্ঠেয় ৯৬তম অস্কার অনুষ্ঠান স্থগিত হতে পারে। যদিও একে আনুষ্ঠানিকভাবে গুজব বলা হচ্ছে, তবে শুটিং ব্যাহত হওয়া এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার অনুষ্ঠানের সময়সূচি পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি অনেকটাই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
তারকাদের প্রতিক্রিয়া
দাবানলের সময় ঝলমলে পুরস্কার অনুষ্ঠান আয়োজনের বিরোধিতা করেছেন একাধিক তারকা। গোল্ডেন গ্লোবজয়ী অভিনেত্রী জিন স্মার্ট বলেছেন, “পুরস্কার অনুষ্ঠানের বাজেট দাবানল ক্ষতিগ্রস্ত তহবিলে ব্যয় করা উচিত।” তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে।
লেখক স্টিফেন কিং বলেছেন, “আমার মতে এবারের অস্কার বাতিল করা উচিত। যখন লস অ্যাঞ্জেলেস আগুনে পুড়ছে, তখন কোনো ঝলমলে অনুষ্ঠান নয়, বরং পুনর্গঠন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করা উচিত।”
শুটিং এবং প্রযোজনার ওপর প্রভাব
দাবানলের কারণে “দ্য লাস্ট শোগার্ল,” “উলফ ম্যান,” এবং “বেটার ম্যান”-এর মতো কয়েকটি বড় সিনেমার প্রিমিয়ার বাতিল করা হয়েছে। “গ্রেস অ্যানাটমি,” “স্যুটস: এলএ,” এবং “হ্যাকস”-এর মতো জনপ্রিয় টিভি শোগুলোর প্রযোজনা স্থগিত করা হয়েছে।
শুটিং
পুরস্কার বিজয়ী কমেডি “হ্যাকস” তাদের একটি প্রধান শুটিং লোকেশন হারিয়েছে, কারণ দাবানলে তাদের প্রাসাদ ধ্বংস হয়ে গেছে।
ফিল্ম এলএর বিবৃতি অনুযায়ী:
“দর্শকের প্রিয় অনেক জায়গা হয়তো আর কখনো পর্দায় ফিরে আসবে না। এই ক্ষতি হলিউডের জন্য অপরিসীম এবং পুনর্নির্মাণেও দীর্ঘ সময় লাগবে।”
কর্মসংস্থান ও স্থানান্তর
দাবানলের কারণে হলিউডের কর্মী এবং প্রযুক্তিবিদরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। হলিউডের কর্মীদের সংগঠন আইএটিএসই জানিয়েছে, প্রায় ৮,০০০ কর্মী দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বসবাস করেন। এ ছাড়া বাড়তি শুটিং খরচের কারণে অনেক প্রযোজনা আটলান্টার মতো বিকল্প লোকেশনে স্থানান্তরিত হচ্ছে, যা কর্মসংস্থানের সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
তারকাদের ব্যক্তিগত ক্ষতি
দাবানল তারকাদের ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। বাড়ি হারিয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেতা জেফ ব্রিজেস, ম্যান্ডি মুর, বিলি ক্রিস্টাল, অ্যান্থনি হপকিন্সসহ আরও অনেকে।
ম্যান্ডি মুর ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন:
“আমাদের মধ্যে যারা এত কিছু হারিয়েছে, তাদের জন্য আমি বিধ্বস্ত ও ভেঙে পড়েছি। এটি আমাদের জন্য এক গভীর ট্র্যাজেডি।”
বিয়ন্সের মা টিনা নোলসও তার বাড়ি হারিয়েছেন। এটি তার পরিবারের জন্য এক বিরাট মানসিক আঘাতের কারণ হয়েছে।
প্রযোজনা সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়া
দাবানলের বিপর্যয়ের পরে হলিউডের প্রযোজনা সংস্থাগুলো দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। নেটফ্লিক্স, ডিজনি, এবং প্যারামাউন্ট উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অনুদান দিয়েছে।
“ফায়ারএইড” নামে একটি বেনিফিট কনসার্ট আয়োজন করা হয়েছে, যার সমস্ত আয় দাবানলে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যে ব্যয় করা হবে।
তারকাদের অংশগ্রহণ
অনেক তারকা ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন। তারা কেবল অর্থ সাহায্যই করছেন না, বরং সামাজিক সচেতনতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখছেন।
বিনোদন শিল্পের ভবিষ্যৎ
হলিউড সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক ধাক্কা সামলেছে। মহামারীর সময় সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই লেখক এবং অভিনেতাদের ধর্মঘট শুরু হয়। এখন এই দাবানল বিনোদন শিল্পের ওপর নতুন আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংকট কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। বিশেষত শুটিং লোকেশন পুনর্নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের পুনর্বাসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের এই দাবানল শুধু স্থানীয় নয়, বরং বৈশ্বিকভাবে বিনোদন শিল্পের ওপর এক গভীর ছাপ ফেলেছে। ব্যক্তিগত ক্ষতি, কর্মসংস্থান সংকট, এবং অর্থনৈতিক ধাক্কা হলিউডের পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান











