অবিবেচনাপ্রসূত ভ্যাট বৃদ্ধি এবং তার প্রভাব
- Update Time : ০৩:১২:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৫
- / ১৭৫ Time View

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক সংকটমুখী পরিস্থিতিতে রয়েছে, যার মধ্যে একটির প্রধান কারণ হলো ভ্যাট বৃদ্ধির অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সম্প্রতি এই বিষয়ে তার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, এবং এই ভ্যাট বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে “অবিবেচনাপ্রসূত” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এটি বাংলাদেশের জনগণের ওপর এক মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে, বিশেষত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য।
ভ্যাট বৃদ্ধির প্রভাব: দেশের অর্থনীতিতে ক্ষতি
ভ্যাট, বা মূল্য সংযোজন কর, একটি পরোক্ষ কর যা সাধারণত ক্রয়কৃত পণ্য বা সেবার ওপর আরোপ করা হয়। এই করের বৃদ্ধির ফলে সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রায়, বিশেষত নিম্ন আয়ের জনগণের উপর। বর্তমানে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, তার মধ্যে এই ভ্যাট বৃদ্ধির প্রভাবকে আরও গভীর করে তুলতে পারে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “যদি সরকার কার্যকরভাবে কর আদায় করতে চায়, তবে তাকে প্রথমে প্রত্যক্ষ করের দিকে নজর দিতে হবে।” কিন্তু বাংলাদেশ সরকার, বর্তমানে, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পরোক্ষ করের দিকে ঝুঁকছে, যার মধ্যে ভ্যাট বৃদ্ধি অন্যতম। তিনি মনে করেন, এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং দেশের সাধারণ মানুষের জন্য আরো চাপ সৃষ্টি করবে।
ব্যবসায়িক খাত ও খরচ বৃদ্ধি
ভ্যাট বৃদ্ধির কারণে প্রথমেই ক্ষতি হবে ব্যবসায়ীদের, যাদের পণ্য উৎপাদন এবং সেবা প্রদান করার খরচ বেড়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা এই বাড়তি খরচ সাধারণত গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেন, ফলে পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যায়। এই দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পকেটে আরও চাপ সৃষ্টি করবে, বিশেষত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির জন্য, যারা ইতিমধ্যে সংকটের মধ্যে জীবন যাপন করছেন।
উদাহরণ হিসেবে, যদি একটি খাদ্যদ্রব্যে ভ্যাট বৃদ্ধি হয়, তবে এর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে এই ধরনের পরোক্ষ কর বৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের জনগণ জীবনযাত্রার মান নিয়ে সংকটে পড়বে। এর সাথে সাথে, ব্যবসায়িক পরিবেশে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে, কারণ ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা অধিক খরচের কারণে বাজার থেকে চলে যেতে পারে।
প্রত্যক্ষ করের অভাব এবং দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা
বর্তমানে বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের সমস্যা হলো প্রত্যক্ষ করের সংগ্রহের প্রতি মনোযোগের অভাব। দেশের মধ্যে সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার কারণে, বড় বড় করদাতারা কর ফাঁকি দেয়, যার ফলে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেয়। এই অভাবের কারণে, সরকার ভ্যাটের মতো পরোক্ষ করের ওপর নির্ভর করে রাজস্ব সংগ্রহ করতে চায়।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “প্রত্যক্ষ কর আদায় করতে না পারার কারণে সরকার বাধ্য হচ্ছে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল হতে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে পারবে না।” প্রত্যক্ষ কর, যেমন আয়ের কর, দেশের ধনী জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, এবং এর মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি পায়, যা দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গরিবদের ওপর ভারী চাপ
ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের গরিব জনগণ। যখন পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের পকেটে। যারা খেয়ে-পরে বাঁচার জন্য প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে থাকেন, তাদের জন্য এটি একটি বড় সংকট। বিশেষ করে যাদের আয় সীমিত, তারা এই অতিরিক্ত খরচ বহন করতে পারবে না। এর ফলে দারিদ্র্যের স্তর আরো বাড়তে পারে, যা দেশের সামাজিক উন্নয়ন ও সামষ্টিক অর্থনীতি সংকটে ফেলবে।
দারিদ্র্য বিমোচনে বাধা
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতি সরকারের মনোযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এখন প্রবৃদ্ধির হার ধীর হয়ে পড়েছে, এবং কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।” এই পরিস্থিতিতে, ভ্যাট বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ শুধুমাত্র গরিব মানুষের ওপর চাপ বাড়াবে, ফলে তাদের দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসার সম্ভাবনা কমে যাবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির অভাব এবং সামাজিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের দুর্বলতা এই সমস্যার আরো জটিলতা তৈরি করবে।
বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতের ওপর প্রভাব
এটি শুধু ভোক্তা বা ব্যবসায়ী স্তরে সীমাবদ্ধ নয়, দেশের নানা অর্থনৈতিক খাতে এর প্রভাব পড়বে। ধনীদের ওপর প্রত্যক্ষ কর না আরোপ করা, তাদের ওপর প্রভাব ফেলার পরিবর্তে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ শ্রমিকরা, কৃষকরা, এবং দিনমজুররা। একদিকে যখন সরকার কর বৃদ্ধি করছে, অন্যদিকে যারা সরকারের রাজস্ব সংগ্রহে বড় ভূমিকা রাখে, তাদের ওপর কোন ধরনের নজরদারি বা করের নীতি আরোপ করা হচ্ছে না। এর ফলে, দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য আরো বাড়বে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক ভারসাম্য হারিয়ে যাবে।
আইএমএফ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদও ভ্যাট বৃদ্ধির পক্ষে সমর্থন না জানিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর—বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ এবং এডিবি—সহযোগিতায় সরকার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে, কিন্তু এতে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের অবস্থার উন্নতি ঘটছে না। তিনি মনে করেন, এই সংস্থাগুলোর অর্থনৈতিক পরামর্শে বাংলাদেশের জনগণের উপর চাপ বাড়ছে, যা সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে।
তিনি আইএমএফের নীতি সম্পর্কে বলেন, “ভর্তুকি কমানো এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়ানো সরকারের জন্য আরও কর সংগ্রহের পথ হলেও, সাধারণ মানুষের জন্য এর ফল ভয়াবহ হতে পারে।”
ভ্যাট বৃদ্ধির এই অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ এটি গরিব জনগণের ওপর আরেকটি বোঝা চাপিয়ে দেবে এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতাও সৃষ্টি করতে পারে। সরকার যদি সত্যিই অর্থনৈতিক উন্নয়ন চায়, তবে তাকে প্রত্যক্ষ করের দিকে মনোযোগ দিতে হবে এবং পাশাপাশি জনগণের জন্য আরও সহায়ক ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে, যা দেশের সার্বিক উন্নতি ও জনকল্যাণে ভূমিকা রাখবে।











