৩৬৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ১৫ হাজার কোটি টাকা জব্দ: অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
- Update Time : ১১:২৫:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৫
- / ১৭৫ Time View

অর্থ পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতে বড় ধরণের তদন্ত এবং কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ৩৬৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা জব্দ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সূত্রে জানা যায়, এই একাধিক ব্যাংক হিসাব জব্দ করার জন্য ১১২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার অধিকাংশই সরকারি ও ব্যবসায়িকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
তদন্ত এবং সিআইডি ও দুদককে প্রতিবেদন পাঠানো
বিএফআইইউের কাজের লক্ষ্য হলো অবৈধ অর্থের প্রবাহ প্রতিরোধ এবং দেশীয় আর্থিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করা। এই লক্ষ্যে, সন্দেহজনক লেনদেনের ভিত্তিতে তদন্ত করা হয় এবং প্রায় ২২৫টি তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ পাঠানো হয়েছে। এসব তদন্তের মধ্যে বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, সরকারি কর্মকর্তাদের এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয় উঠে এসেছে।
বিএফআইইউর নির্দেশনায় ব্যাংক হিসাব জব্দ
প্রাথমিকভাবে, বিএফআইইউ কর্তৃক ব্যাংকগুলিকে অনুরোধ করা হয়েছিল যে, তারা সন্দেহজনক লেনদেন কিংবা অর্থ পাচারের সাথে যুক্ত ব্যাংক হিসাবগুলোকে আটকে রাখবে। এর ফলস্বরূপ, অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব পরিদর্শন করা হয় এবং যাচাই-বাছাই শেষে সেগুলোকে অবরুদ্ধ করা হয়।
বিএফআইইউয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এবং মূলত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ওপর বিশেষভাবে মনোযোগ দেওয়া হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যরা, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ব্যবসায়ীরা এবং বড় বড় গোষ্ঠীগুলোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানা, এবং রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক।
কোনো প্রতিষ্ঠানের হিসাবও জব্দ হয়েছে
এছাড়া, বেশ কিছু বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ব্যাংক হিসাবও বিএফআইইউয়ের নজরে এসেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- এস আলম গ্রুপ: এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব।
- বেক্সিমকো গ্রুপ: এর ভাইস-চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, তার ছেলে শায়ান ফজলুর রহমান এবং স্ত্রী।
- বসুন্ধরা গ্রুপ: এর প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ আকবর সোবহান ও তার পরিবারের সদস্যদের হিসাব।
- সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও নাবিল গ্রুপ: এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর প্রতিষ্ঠাতাদের ব্যাংক হিসাবও সন্ত্রাসী অর্থ পাচারের তদন্তের আওতায় এসেছে।
এছাড়া, বিএফআইইউয়ের নির্দেশে বেশ কিছু ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এসএম পারভেজ তামাল, এনআরবিসি ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আদনান ইমাম, ইউনিয়ন ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম মোকাম্মেল হক চৌধুরী, পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফত, এবং এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার।
সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাবও জব্দ
এই তালিকায় কিছু সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাবও রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন শেখ হাসিনার প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান এবং একাত্তর টিভির সাবেক প্রধান নির্বাহী মোজাম্মেল হক বাবু। এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারীরা সন্দেহ করছেন যে, তারা অবৈধ লেনদেন এবং অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত।
সন্দেহজনক লেনদেন এবং অর্থ পাচার
বিএফআইইউ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যদি কোনো জব্দ করা ব্যাংক হিসাবের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার কিংবা সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ না পাওয়া যায়, তবে সেই হিসাবটি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। এর মানে হলো, তদন্তের পর প্রমাণিত না হলে ব্যাংক হিসাবগুলি অবমুক্ত করা হবে।
অর্থ পাচার ও ঋণ জালিয়াতি সংক্রান্ত তদন্ত
এছাড়া, বর্তমানে বিএফআইইউ বিভিন্ন ব্যবসায়িক গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, ঋণ জালিয়াতি, এবং সরকারি ও আমানতকারীদের তহবিলের অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়মের তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। ইতোমধ্যে এই বিষয়গুলো নিয়ে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। এগুলির ভিত্তিতে সিআইডি ও দুদকে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
এছাড়া, কিছু ব্যবসায়িক গ্রুপের অর্থ পাচারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য চেয়ে বিএফআইইউ সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের কাছে অনুরোধ পাঠিয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে আরও বিশদ তদন্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই তদন্তগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, এবং দেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও সততার উন্নতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।











