১৭ বছর পর কারামুক্ত হচ্ছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর
- Update Time : ১০:২০:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৫
- / ১৬৫ Time View

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত নাম লুৎফুজ্জামান বাবর। দীর্ঘ ১৭ বছর কারাগারে থাকার পর আজ বৃহস্পতিবার তিনি মুক্তি পাচ্ছেন। সব মামলায় খালাস পাওয়ার পর কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া হবে। কারা অধিদপ্তর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যেই তিনি কারাগার থেকে বের হতে পারেন।
বাবরের মুক্তির খবরে নেত্রকোনা–৪ আসন (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরী) ও তার সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ও আনন্দের জোয়ার বইছে। কারাগারের ফটকে বাবরকে বরণ করতে ইতিমধ্যে তার পরিবারের সদস্য ও বিএনপি নেতাকর্মীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় খালাস
সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর ২০০৭ সালের ২৮ মে গ্রেফতার হন। এরপর থেকে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় বিচারকাজ চলে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলা।
২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার চৌধুরীঘাট এলাকায় ১০ ট্রাক ভর্তি অস্ত্র ধরা পড়ে। এই অস্ত্রগুলো ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা)‘র জন্য আনা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠে।
এই মামলায় বাবরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে অস্ত্র চোরাচালানে সহযোগিতা করেছেন। ২০১৪ সালে আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে গত মঙ্গলবার (২৩ জানুয়ারি) হাইকোর্ট থেকে তিনি এই মামলায় সম্পূর্ণ খালাস পান।
হাইকোর্টের বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও নাসরিন আক্তারের বেঞ্চ রায়ে বলেন, বাবরের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এই মামলায় তিনি মুক্তি পান।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায়ও খালাস
লুৎফুজ্জামান বাবরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ছিল ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায়। এই মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত
এই ঘটনায় বাবরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি গ্রেনেড সরবরাহ ও হামলা পরিকল্পনায় সহায়তা করেছিলেন। ২০১৮ সালে এই মামলায় বিচারিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আপিল শুনানির মাধ্যমে গত বছরের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট থেকে এই মামলায়ও তিনি সম্পূর্ণ খালাস পান।
দুর্নীতি মামলায়ও খালাস
বাবরের বিরুদ্ধে আরও একটি দুর্নীতির মামলা ছিল। দুর্নীতির অভিযোগে তার ৮ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল।
তবে গত বছরের ২৩ অক্টোবর এই মামলায়ও বাবর খালাস পান।
বাবরের মুক্তির খবরে উচ্ছ্বাস
বাবরের মুক্তির খবরে তার নির্বাচনী এলাকা নেত্রকোনায় উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে তোরণ তৈরি করা হয়েছে। তার স্বজন ও সমর্থকরা ঢাকায় এসে কারাগারের সামনে জড়ো হচ্ছেন।
তার স্ত্রী তাহমিনা জামান শ্রাবনী বলেছেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর পর বাবর মুক্তি পাচ্ছেন। এ রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের জনগণ তার মুক্তির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। বাবরও জনগণের কাছে ফিরতে উদগ্রীব হয়ে আছেন।”
বিএনপি নেতাকর্মীদের মতে, বাবরের মুক্তি দলের জন্য একটি বড় অর্জন। অনেকেই মনে করছেন, বাবর মুক্তি পেলে নেত্রকোনা অঞ্চলে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
কারাগারের প্রস্তুতি ও কারা অধিদপ্তরের বক্তব্য
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক জান্নাত–উল–ফরহাদ জানিয়েছেন, “হাইকোর্টের রায়ের কপি চট্টগ্রাম আদালতে পৌঁছানোর পর তা কারাগারে পাঠানো হবে। কাগজপত্র ঠিকঠাক হলেই বাবরকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।”
কেন্দ্রীয় কারাগারের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যেই বাবরকে মুক্তি দেওয়া হতে পারে।
সাবেক মন্ত্রী বাবরের রাজনৈতিক প্রভাব
লুৎফুজ্জামান বাবর ছিলেন নেত্রকোনা–৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি বিএনপি সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
তার সময়ে দেশে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ ঘটেছে, যা তাকে আলোচনায় এনেছিল। তবে একই সময়ে তার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ উঠেছিল, যার মধ্যে ছিল দুর্নীতি, অস্ত্র চোরাচালান, এবং হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগ।
বাবরের মুক্তির পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তিনি নেত্রকোনায় তার আগের জনপ্রিয়তা ফিরে পাবেন এবং বিএনপির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
বাবরের মুক্তির অর্থ কী?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাবরের মুক্তি বিএনপির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা।
অনেকে মনে করছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির অনেক নেতা একের পর এক খালাস পাচ্ছেন। এর মাধ্যমে সরকারি দমনপীড়নের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
বাবরের মুক্তি কি বিএনপির জন্য নতুন করে আন্দোলনের শক্তি জোগাবে? এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
শেষ কথা
দীর্ঘ ১৭ বছর কারাবাসের পর আজ লুৎফুজ্জামান বাবরের মুক্তি পাওয়ার খবরে তার সমর্থকদের মধ্যে আনন্দ বিরাজ করছে।
বাবরের স্ত্রী তাহমিনা বলেছেন, “তিনি এখন জনগণের কাছে ফিরে যেতে প্রস্তুত। দেশের মানুষ তাকে ফিরে পেতে চায়। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটায় আমরা কৃতজ্ঞ।”
এখন দেখার বিষয়, বাবরের মুক্তি পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কী ধরনের পরিবর্তন আসে।











