সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডেসটিনি অর্থ কেলেঙ্কারি মামলা: সাবেক সেনাপ্রধান হারুনসহ ১৯ জনের ১২ বছর কারাদণ্ড, জরিমানা ৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০২:৪৬:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৫
  • / ১৭৯ Time View

prothomalo bangla 2025 01 15 jm0l9zph Image 2

রফিকুল আমীন ও হারুন-অর-রশীদ (ডানে)

 

ঢাকা: বহুল আলোচিত ডেসটিনির অর্থ আত্মসাত মামলায় ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীন ও কোম্পানির প্রেসিডেন্ট সাবেক সেনাপ্রধান এম হারুন-অর-রশীদসহ ১৯ জনকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। একইসঙ্গে তাঁদের প্রত্যেককে ৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বুধবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক রবিউল আলম এ রায় ঘোষণা করেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত ১৯ জনের মধ্যে রফিকুল আমীন, মোহাম্মদ হোসেন ও হারুন-অর-রশীদকে আদালত থেকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকিরা পলাতক রয়েছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন পাবলিক প্রসিকিউটর মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর।

মামলার পটভূমি

২০১২ সালের ৩১ জুলাই ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন লিমিটেডের নামে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আত্মসাত ও পাচারের অভিযোগে রাজধানীর কলাবাগান থানায় পৃথক দুটি মামলা করে দুদক।

দুদকের তদন্তে উঠে আসে, ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৬১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ অর্থ আত্মসাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে আট লাখ বিনিয়োগকারী।

অপরদিকে, ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশনের মাধ্যমে ২ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়, যার মধ্যে ২ হাজার ২৫৭ কোটি ৭৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই মামলায় প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুদকের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, এ অর্থের মধ্যে ৫৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে এবং ২ লাখ ৬ হাজার মার্কিন ডলার সরাসরি পাচার করা হয়েছে।

অভিযুক্তদের তালিকা

ডেসটিনি গ্রুপের এমডি রফিকুল আমীন ও সাবেক সেনাপ্রধান এম হারুন-অর-রশীদ ছাড়াও দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন ডেসটিনির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন, মোহাম্মদ গোফরানুল হক, মোহাম্মদ সাঈদ-উর-রহমান, মেজবাহ উদ্দিন, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, ইরফান আহমেদ, ফারাহ দিবা, জামসেদ আরা চৌধুরী, শেখ তৈয়েবুর রহমান, নেপাল চন্দ্র বিশ্বাস, জসীম উদ্দিন, জাকির হোসেন, এস এম আহসানুল কবির, জুবায়ের সোহেল, মোসাদ্দেক আলী, আবদুল মান্নান এবং আবুল কালাম আজাদ।

মামলা বিচার প্রক্রিয়া

দুদকের দুই বছরের তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ৪ মে উভয় মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির মামলায় ৪৬ জন এবং ট্রি প্ল্যান্টেশনের মামলায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। দুই মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৫৩। রফিকুল আমীনসহ ১২ জনের নাম দুটি মামলাতেই রয়েছে।

২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

বিচারক রবিউল আলম তাঁর রায়ে বলেন, “ডেসটিনি গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তারা বহু বিনিয়োগকারীর অর্থ আত্মসাৎ করে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে গভীর আঘাত হেনেছেন। এ ধরনের অপরাধ দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে।” আদালত আরও বলেন, “দুর্নীতি প্রতিরোধে এ ধরনের অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”

বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়া

রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত বিনিয়োগকারীরা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। এক বিনিয়োগকারী বলেন, “আমাদের কষ্টার্জিত টাকা আত্মসাৎ করে এখন তাঁরা জেলে গেলেন। কিন্তু আমরা যে সর্বস্বান্ত হলাম, আমাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা হবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।”

ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

দুদক জানিয়েছে, দণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের কিছু অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দুদকের মহাপরিচালক বলেন, “আমরা আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব এবং পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরানোর চেষ্টা করব।”

পূর্ববর্তী রায়

এর আগে, ২০২২ সালের ১৫ মে অর্থ আত্মসাত ও পাচারের আরেক মামলায় রফিকুল আমীন, এম হারুন-অর-রশীদসহ ৪৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছিল আদালত। সেই মামলাতেও বিনিয়োগকারীদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়।

সারসংক্ষেপ

ডেসটিনি গ্রুপের অর্থ আত্মসাতের মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান এম হারুন-অর-রশীদসহ ১৯ জনকে ১২ বছরের কারাদণ্ড ও ৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই রায় দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় অর্থ আত্মসাতের মামলার বিচারকাজ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আদালতের এ রায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা প্রেরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ডেসটিনি অর্থ কেলেঙ্কারি মামলা: সাবেক সেনাপ্রধান হারুনসহ ১৯ জনের ১২ বছর কারাদণ্ড, জরিমানা ৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা

Update Time : ০২:৪৬:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৫
রফিকুল আমীন ও হারুন-অর-রশীদ (ডানে)

 

ঢাকা: বহুল আলোচিত ডেসটিনির অর্থ আত্মসাত মামলায় ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীন ও কোম্পানির প্রেসিডেন্ট সাবেক সেনাপ্রধান এম হারুন-অর-রশীদসহ ১৯ জনকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। একইসঙ্গে তাঁদের প্রত্যেককে ৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বুধবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক রবিউল আলম এ রায় ঘোষণা করেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত ১৯ জনের মধ্যে রফিকুল আমীন, মোহাম্মদ হোসেন ও হারুন-অর-রশীদকে আদালত থেকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকিরা পলাতক রয়েছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন পাবলিক প্রসিকিউটর মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর।

মামলার পটভূমি

২০১২ সালের ৩১ জুলাই ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন লিমিটেডের নামে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আত্মসাত ও পাচারের অভিযোগে রাজধানীর কলাবাগান থানায় পৃথক দুটি মামলা করে দুদক।

দুদকের তদন্তে উঠে আসে, ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৬১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ অর্থ আত্মসাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে আট লাখ বিনিয়োগকারী।

অপরদিকে, ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশনের মাধ্যমে ২ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়, যার মধ্যে ২ হাজার ২৫৭ কোটি ৭৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই মামলায় প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুদকের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, এ অর্থের মধ্যে ৫৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে এবং ২ লাখ ৬ হাজার মার্কিন ডলার সরাসরি পাচার করা হয়েছে।

অভিযুক্তদের তালিকা

ডেসটিনি গ্রুপের এমডি রফিকুল আমীন ও সাবেক সেনাপ্রধান এম হারুন-অর-রশীদ ছাড়াও দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন ডেসটিনির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন, মোহাম্মদ গোফরানুল হক, মোহাম্মদ সাঈদ-উর-রহমান, মেজবাহ উদ্দিন, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, ইরফান আহমেদ, ফারাহ দিবা, জামসেদ আরা চৌধুরী, শেখ তৈয়েবুর রহমান, নেপাল চন্দ্র বিশ্বাস, জসীম উদ্দিন, জাকির হোসেন, এস এম আহসানুল কবির, জুবায়ের সোহেল, মোসাদ্দেক আলী, আবদুল মান্নান এবং আবুল কালাম আজাদ।

মামলা বিচার প্রক্রিয়া

দুদকের দুই বছরের তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ৪ মে উভয় মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির মামলায় ৪৬ জন এবং ট্রি প্ল্যান্টেশনের মামলায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। দুই মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৫৩। রফিকুল আমীনসহ ১২ জনের নাম দুটি মামলাতেই রয়েছে।

২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

বিচারক রবিউল আলম তাঁর রায়ে বলেন, “ডেসটিনি গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তারা বহু বিনিয়োগকারীর অর্থ আত্মসাৎ করে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে গভীর আঘাত হেনেছেন। এ ধরনের অপরাধ দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে।” আদালত আরও বলেন, “দুর্নীতি প্রতিরোধে এ ধরনের অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”

বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়া

রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত বিনিয়োগকারীরা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। এক বিনিয়োগকারী বলেন, “আমাদের কষ্টার্জিত টাকা আত্মসাৎ করে এখন তাঁরা জেলে গেলেন। কিন্তু আমরা যে সর্বস্বান্ত হলাম, আমাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা হবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।”

ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

দুদক জানিয়েছে, দণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের কিছু অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দুদকের মহাপরিচালক বলেন, “আমরা আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব এবং পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরানোর চেষ্টা করব।”

পূর্ববর্তী রায়

এর আগে, ২০২২ সালের ১৫ মে অর্থ আত্মসাত ও পাচারের আরেক মামলায় রফিকুল আমীন, এম হারুন-অর-রশীদসহ ৪৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছিল আদালত। সেই মামলাতেও বিনিয়োগকারীদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়।

সারসংক্ষেপ

ডেসটিনি গ্রুপের অর্থ আত্মসাতের মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান এম হারুন-অর-রশীদসহ ১৯ জনকে ১২ বছরের কারাদণ্ড ও ৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই রায় দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় অর্থ আত্মসাতের মামলার বিচারকাজ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আদালতের এ রায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা প্রেরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।