আরও ১৪ সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব তলব, তদন্তের আওতায় ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন
- Update Time : ০৮:৫৯:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৫
- / ১৮০ Time View

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) আরও ১৪ জন সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে। এর পাশাপাশি তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাবের তথ্যও সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এই নির্দেশনা পাঠিয়েছে বিএফআইইউ।
বুধবার (১৫ জানুয়ারি) বিএফআইইউর সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এই নির্দেশনার আওতায় সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক হিসাবের বিভিন্ন নথি, যেমন—হিসাব খোলার ফরম, কেওয়াইসি (Know Your Customer) তথ্য, লেনদেন বিবরণী এবং অন্যান্য আর্থিক নথি সাত কার্যদিবসের মধ্যে বিএফআইইউতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের পদক্ষেপ দেশের সাংবাদিক সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। অনেকে একে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি উদ্যোগ বলে মনে করছেন।
কোন সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে?
বিএফআইইউ যে ১৪ জন সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে, তারা দেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী গণমাধ্যমে কাজ করেন। এদের মধ্যে আছেন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপির বাংলাদেশ ব্যুরো চিফ থেকে শুরু করে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার।
তলব করা সাংবাদিকদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য নামগুলো হলো:
১. জুলহাস আলম (এপি ব্যুরো চিফ)
২. ফরিদ হোসেন (ইউএনবি উপদেষ্টা সম্পাদক)
৩. শাহজাহান সরদার (বাংলাদেশ জার্নাল সম্পাদক)
৪. আলী আসিফ শাওন (ঢাকা ট্রিবিউন স্টাফ রিপোর্টার)
৫. নাদিম কাদির (ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক ও সাবেক প্রেস মিনিস্টার)
৬. রাজীব ঘোষ (ডিবিসি নিউজ সিনিয়র রিপোর্টার)
৭. মো. আজিজুল হক ভুঁইয়া (ডেইলি পিপলস লাইফ সম্পাদক)
৮. স্বপন বসু (বাসস স্পোর্টস ইনচার্জ)
৯. তাহমিদা সাদেক জেসি (ডিবিসি নিউজ স্টাফ রিপোর্টার)
১০. নিলাদ্রি শেখর কুন্ডু (চ্যানেল আই সিনিয়র রিপোর্টার)
১২. ইকবাল করিম নিশান (গাজী টিভি বার্তা সম্পাদক)
১৩. সাজু রহমান (গ্রিন টিভি)
১৪. আমিনুর রশীদ (বাংলাভিশন সাবেক)
সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব কেন তলব করা হয়েছে?
বিশ্লেষকদের মতে, সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব তলব করার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন যাচাই করা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন অপকর্ম ও দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসছে। এসব সাংবাদিকদের মধ্যে অনেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আর্থিক খাতের দুর্নীতি রোধে এবং অর্থপাচার ঠেকানোর জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিএফআইইউর কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংক হিসাব তলবের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেনের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি কোনো ধরনের সন্দেহজনক লেনদেন বা অর্থপাচারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সেই তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে।
বিএফআইইউর নির্দেশনায় কী বলা হয়েছে?
বিএফআইইউর নির্দেশনায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত তথ্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে জমা দিতে হবে। এসব তথ্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে:
- ব্যাংক হিসাব খোলার সময় জমা দেওয়া ফরম
- কেওয়াইসি (Know Your Customer) ফরম
- লেনদেন বিবরণী
- বড় অঙ্কের জমা ও উত্তোলনের তথ্য
- কোনো সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ
বিএফআইইউ বলেছে, নির্দেশনার তারিখ থেকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে এসব তথ্য জমা দিতে হবে।
সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া
সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব তলবের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, “এই পদক্ষেপ সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে ভীতি সঞ্চারের কৌশল হতে পারে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের যে কোনো প্রচেষ্টা আমরা প্রত্যাখ্যান করি।”
ডিআরইউ সভাপতি বলেন, “আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্ত হোক। কিন্তু সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে দেখা হবে।”
পেশাদার সাংবাদিকদের উদ্বেগ ও বিশ্লেষণ
বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতি ছড়ানোর কৌশল হতে পারে।
সাংবাদিকতা পেশার মূল ভিত্তি হলো স্বাধীনভাবে তথ্য প্রকাশ করা। কিন্তু যদি সাংবাদিকদের আর্থিক লেনদেন তলব করে তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, “সাংবাদিকরা যদি ভয়ে থাকেন, তবে মুক্ত সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।”
অর্থপাচার ও দুর্নীতি দমন উদ্যোগের অংশ
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের পদক্ষেপ জরুরি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন মন্ত্রী বলেছেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো দেশের আর্থিক খাতকে সুশৃঙ্খল করা। কোনো ব্যক্তি, যেই হোন না কেন, যদি কোনো দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তবে তিনি আইনের আওতায় আসবেন।”
সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব তলব: স্বাভাবিক নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত?
এই পদক্ষেপ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
কেউ কেউ বলছেন, এটি দুর্নীতি দমনের অংশ। আবার কেউ কেউ বলছেন, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সাংবাদিক নেতারা বলছেন, “সরকার যদি নিরপেক্ষ তদন্ত করতে চায়, তবে তা অবশ্যই স্বাগত জানানো হবে। তবে কোনোভাবেই সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া ঠিক হবে না।”
শেষ কথা
সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব তলবের বিষয়টি দেশের গণমাধ্যম ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া উচিত। অন্যদিকে, আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেও সরকারকে আইনের শাসন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
দুর্নীতি রোধ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা—দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।











