ইসলামী ব্যাংকে আবার অনিয়ম: পদ হারালেন নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান
- Update Time : ১১:১৮:১২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৫
- / ২৩১ Time View

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (আইবিবিএল)-এ আবারও অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির (ইসি) চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জলিলের বিরুদ্ধে নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ঋণ বিতরণ এবং নিজের জামাতাকে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পরিচালনা পর্ষদ তাঁকে ইসি চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। ব্যাংকের নতুন ইসি চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মুহাম্মদ খুরশীদ ওয়াহাব।
অভিযোগের বিস্তারিত
অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. আব্দুল জলিল তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করে পছন্দের প্রতিষ্ঠান ‘ট্রু ফেব্রিকস লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৫০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করেন। প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ ছিল ২২৫ কোটি টাকা। তবে অনুমোদনের দিন সকালে আব্দুল জলিলের মৌখিক নির্দেশে এই ঋণের অঙ্ক বাড়িয়ে ২৫০ কোটি টাকা করা হয়।
ঋণ অনুমোদনে নীতিমালার লঙ্ঘন
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যেই ইসলামী ব্যাংকের নতুন ঋণ বিতরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। তবুও এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১০ ডিসেম্বর ইসি সভায় ঋণটি অনুমোদিত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) অনুযায়ী, ‘ট্রু ফেব্রিকস লিমিটেড’ একটি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান, যার কাছে ইসলামী ব্যাংকের পূর্ববর্তী ১৮ কোটি টাকা অনাদায়ী রয়েছে। অথচ এই বিষয়টি উপেক্ষা করেই ঋণ অনুমোদন করা হয়। এমনকি অনুমোদনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই, মাত্র একদিনের ব্যবধানে, ঋণটি বিতরণ করা হয়।
পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত
এমন গুরুতর অনিয়মের কারণে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সোমবার মো. আব্দুল জলিলকে ইসি চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন মুহাম্মদ খুরশীদ ওয়াহাব, যিনি আগে একই কমিটির সদস্য ছিলেন।
পর্ষদ থেকে জানানো হয়, এ ধরনের অনিয়ম ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও সুনামের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে। নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জামাতাকে
মো. আব্দুল জলিলের বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো, তিনি ইসলামী ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান, ইসলামী ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিজের জামাতা মশিউর রহমানকে নিয়োগ দেন।
ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি বা নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে যে, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে তাঁর জামাতাকে এই পদে বসানো হয়েছে। যদিও আব্দুল জলিল এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, “আমার আত্মীয় হলেও তাঁকে আমি নিয়োগ দিইনি। তিনি ওই পদের জন্য যোগ্য হওয়ায় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাঁকে নিয়োগ দিয়েছে।”
ইসলামী ব্যাংকের ঋণ বিতরণ ও এস আলম গ্রুপ
ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো, ব্যাংকের অর্ধেক ঋণই বহুল সমালোচিত এস আলম গ্রুপ নিয়েছে। ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকের আর্থিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শুধু তাই নয়, এই ঋণের পরিমাণ আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের সম্পর্ক নষ্ট করার মতো বড় প্রভাব ফেলেছে।
২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের পর এস আলম গ্রুপের এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু হয়। মালিকানা পরিবর্তনের পর থেকেই ব্যাংকের নীতিমালা ও আর্থিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ বাড়তে থাকে।
ব্যাংকের সংকট এবং গ্রাহকদের উদ্বেগ
ইসলামী ব্যাংকের এই ধরনের অনিয়ম গ্রাহকদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। ব্যাংকটির ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমে গেছে। বর্তমানে ব্যাংকটি নতুন ঋণ বিতরণে অক্ষম হয়ে পড়েছে, যা দেশের আর্থিক খাতের জন্য উদ্বেগজনক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংকের পরিচালনায় স্বচ্ছতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এ ধরনের অনিয়ম বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
অভিযুক্তের প্রতিক্রিয়া
মো. আব্দুল জলিল তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যে প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া হয়েছে, সেটি ইসলামী ব্যাংকের পুরনো গ্রাহক। তাদের কারখানা চালু রাখতে এই ঋণ প্রয়োজন ছিল। আমি কোনো ধরনের প্রভাব খাটাইনি।”
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা দেশের ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও প্রভাব বিস্তারের আরেকটি উদাহরণ। গ্রাহকের টাকা সুরক্ষিত রাখতে এবং ব্যাংকের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একসময় উদাহরণ ছিল। তবে সাম্প্রতিক অনিয়মের কারণে ব্যাংকটির সুনাম এবং কার্যকারিতা দুইই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।











