মেজর ডালিম কি দেশে ফিরছেন?
- Update Time : ১১:৪৯:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৫
- / ১৯১ Time View

বাংলাদেশের ইতিহাসে বিতর্কিত একটি নাম, মেজর শরিফুল হক ডালিম, যিনি মেজর ডালিম নামেই সর্বাধিক পরিচিত। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে আড়ালে থাকার পর সম্প্রতি তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউবের লাইভে এসে আবারো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর ডালিম, যিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত ব্যক্তি, তার ইউটিউব লাইভ উপস্থিতি দেশে এবং বিদেশে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
রোববার (৫ জানুয়ারি) রাতে তিনি প্রবাসী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনের সঙ্গে ‘লাইভে যুক্ত আছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর ডালিম (বীরবিক্রম)’ শিরোনামে একটি সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ করেন। তার এই সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, বিশেষত তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে চলা আলোচনা। মেজর ডালিমের এই সাক্ষাৎকারের পর একদিকে যেমন কিছু মানুষ তাকে দেশের বীর হিসাবে দেখতে চাইছেন, অন্যদিকে তার দেশে ফেরার ব্যাপারে তীব্র বিরোধিতাও চলছে।
মেজর ডালিমের আড়ালে থাকা জীবন
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে মেজর ডালিম ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত চরিত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত থাকার কারণে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশে পালিয়ে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা, ষড়যন্ত্র ও দেশদ্রোহিতার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তবে, বেশ কয়েক দশক ধরে তিনি কোথাও প্রকাশ্যে আসেননি, এবং তার অবস্থান ছিল এক প্রকার রহস্যে ঢাকা।
লাইভে এসে শোরগোল
এই সাক্ষাৎকারে মেজর ডালিম নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা এবং ‘বীরবিক্রম’ হিসাবে দাবি করেছেন। তার ভাষ্যমতে, তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না, বরং এটি ছিল একটি জাতীয় আন্দোলন এবং বিপ্লব। তিনি আরো বলেন, “আমার ভূমিকা ছিল সামরিক বাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। সেই সময়কার পরিস্থিতি অনেক জটিল ছিল। আমি যা করেছি, তা দেশের স্বার্থে ছিল।” তার এই বক্তব্যটি অনেকেই স্বীকার না করে, তাকে আরো একবার হত্যা, ষড়যন্ত্র ও দেশদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত করেছেন।
তবে, তার উপস্থিতি দেশে ফেরার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই বিষয়টি ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ পরিণত হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, মেজর ডালিম কি সত্যিই দেশে ফিরবেন? এবং তার দেশে ফেরা কি দেশের জন্য ভালো হবে, নাকি এটি একটি বিপজ্জনক ঘটনা হবে?
পিনাকী ভট্টাচার্যর বক্তব্য
এ বিষয়ে সোমবার (৬ জানুয়ারি) রাতে প্রবাসী লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিনাকী ভট্টাচার্য ইউটিউবে এক ভিডিওতে তার মতামত প্রকাশ করেন। পিনাকী ভট্টাচার্য জানান, “সুইডেনের এক বড় ভাই, যিনি মেজর ডালিমের শিষ্য, আমাকে বলেছেন যে মেজর ডালিমকে দেশে আনা দরকার।” তিনি আরও বলেন, “মেজর ডালিমকে দেশে আনা হলে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হতে পারে। আমাদের দেশে যদি নতুন সংবিধান লেখা হয়, তবে ১৫ আগস্টের ঘটনার বিচার এবং আগের সমস্ত আইনসমূহ অবৈধ হয়ে যাবে।”
পিনাকী আরও মন্তব্য করেন, “মেজর ডালিমের মত একজন বিপ্লবী নেতাকে বীরের সম্মান দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা উচিত। তার নাম অবশ্যই আকাশে তুলে রাখা উচিত। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।” তিনি পরিশেষে বলেন, “মেজর ডালিমকে দেশে ফিরিয়ে এনে আমরা ইতিহাসের ভুল সংশোধন করতে পারি, যা আমাদের দেশের জন্য একটি প্রকৃত বিপ্লব হতে পারে।”
মেজর ডালিমের ফেরার সম্ভাবনা
মেজর ডালিমের দেশে ফেরার বিষয়টি শুধুমাত্র তার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি নয়, বরং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তার ফেরার মাধ্যমে পুরোনো বিতর্ক নতুন করে শুরু হতে পারে। বিশেষত, ১৫ আগস্টের ঘটনার পুনর্মূল্যায়ন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের প্রশ্নটি আবারো সামনে চলে আসবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৫ আগস্টের ঘটনার গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন, মেজর ডালিমের দেশে ফেরার মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত থাকতে পারে। তবে, এক্ষেত্রে বিরোধীদের মতামতও খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন, মেজর ডালিমের দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে যেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কী বলছেন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মেজর ডালিমের দেশে ফেরার সম্ভাবনা জাতির জন্য একটি দ্বিধান্বিত প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে। তার ফেরার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো রাজনৈতিক সমস্যাগুলি আবারো উত্থিত হতে পারে। অন্যদিকে, কিছু লোক তার সমর্থনে এগিয়ে এসে তাকে ‘বীর’ হিসেবে স্বীকার করতে চাচ্ছেন, যা দেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।
মেজর ডালিমের দেশে ফেরার বিষয়টি এখন শুধুমাত্র একটি বিতর্কিত প্রশ্ন নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যতের রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিবেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার দেশে ফিরলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে পরিবর্তন আসবে, এবং ইতিহাসের এক বিতর্কিত অধ্যায় আবারো সামনে আসবে। তবে, তার ফেরার মাধ্যমে বাংলাদেশে কী ধরনের সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে, তা সময়ই বলবে।











