আলোচনা সভায় সৌদি রাষ্ট্রদূত: হাসিনা আমলে আটকে দেওয়া হয়েছে রিয়াদের বিনিয়োগ
- Update Time : ১০:১১:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৫
- / ২১১ Time View

ঢাকা, ৭ জানুয়ারি ২০২৫
ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ ইসা আল দুহাইলান বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে সৌদি আরবের বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনতে ব্যর্থ হয়েছে, এবং একাধিকবার তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা সরকারিভাবে আটকে দেওয়া হয়েছে। সৌদি রাষ্ট্রদূত অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী সৌদি ব্যবসায়ীরা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আটকে পড়েছিলেন। তিনি জানান, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল, কিন্তু সে সময় তাদের প্রস্তাবের প্রতি কেউ গুরুত্ব দেননি।
এই বক্তব্যটি গতকাল, ৬ জানুয়ারি ২০২৫, ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত একটি আলোচনা সভায় দেওয়া হয়। আলোচনা সভার মূল বিষয় ছিল ‘সৌদি-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি: প্রবণতা, মূল চ্যালেঞ্জ এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা’। সভায় প্রবন্ধের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের উন্নতির পথ খোঁজা হয়েছিল।
আরামকোর পরিশোধনাগারের প্রস্তাব
উল্লেখযোগ্যভাবে, সৌদি রাষ্ট্রদূত ইউসুফ ইসা আল দুহাইলান জানান, সৌদি আরবের আরামকো বাংলাদেশে একটি পরিশোধনাগার স্থাপন করতে আগ্রহী ছিল। তিনি বলেন, “আরামকো ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত তিনটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল, কিন্তু সে সময় বাংলাদেশের সরকারের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তাদের প্রস্তাব সরকারি স্তরে আটকে যেত। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে মন্ত্রী ও সচিব দপ্তরে প্রক্রিয়া চলাকালীন সেখানে কিছু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে এগিয়ে আসতে দেওয়া হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “সৌদি আরব বিশ্বে সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানি এবং তারা বাংলাদেশে একটি পরিশোধনাগার স্থাপন করতে চেয়েছিল, যা বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।” সৌদি রাষ্ট্রদূত এসব অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে বলেন, “তবে আমরা অতীত নিয়ে আর কথা বলতে চাই না, আমাদের লক্ষ্য এখন ভবিষ্যৎ।”
বিনিয়োগ
সভায় সৌদি রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, সৌদি আরব এবং বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে দৃঢ় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। তিনি বলেন, “আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমাদের কেবল হজ, কর্মী নিয়োগ এবং অনুদান নিয়ে সম্পর্ক নয়; এর বাইরেও আমাদের বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অন্যান্য খাতে সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণ করবে এবং সৌদি আরব সবসময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে।”
তবে, সৌদি রাষ্ট্রদূত বিনিয়োগ বিষয়ে তার অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বলেন, “দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলোতে এখনো আমরা প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখতে পাইনি।”
অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্য
এ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি সৌদি আরব এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং কোম্পানির উদাহরণ দিয়ে সরকারের ভুল নীতির সমালোচনা করেন। ড. সালেহউদ্দিন বলেন, “শেখ হাসিনার সরকার শুধু সৌদি আরবের বিনিয়োগ আটকায়নি, দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংকেও বিমানবন্দর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। এই ভুল নীতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সঠিক বিনিয়োগ নীতির অভাবে দেশের উন্নয়ন গতিশীল হয়নি।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আরও সচেতন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।”
তিনি অতিরিক্ত বলেন, “বিনিয়োগে বাধা শুধু দুর্নীতি নয়, এর সাথে পলিসিগত ভুল সিদ্ধান্তও রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।”
বাণিজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যত
ড. সালেহউদ্দিন বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রসারিত করার দিকে নজর দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং বলেছিলেন, “আমরা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে চাই। তবে, সরকারের একার পক্ষে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; বেসরকারি খাতের সহায়তা প্রয়োজন।”
শেয়ার মার্কেট নিয়ে তার সমালোচনা করেন তিনি, এবং বলেন, “বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে অনেক কোম্পানি বিনিয়োগ করছে, কিন্তু কিছু কোম্পানির ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেলেও তাদের শেয়ারের দাম বাড়ছে, যা একটি অসুস্থ পরিস্থিতি।”
কূটনীতিকদের মতামত
এ প্রসঙ্গে, সৌদি আরবে বাংলাদেশের একজন সাবেক কূটনীতিক সমকালকে বলেন, “ঢাকার সৌদি রাষ্ট্রদূত সঠিক কথাই বলেছেন। অতীতে অনেকবার সৌদি আরব থেকে বিনিয়োগকারীদের আনার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তৎকালীন সরকারের কিছু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে তা আটকে দেওয়া হয়েছিল। এই পরিস্থিতি শুধু সৌদি আরবের জন্য নয়, দেশটির জন্য একটি বড় সুযোগ ছিল যা হারিয়ে গেছে।”
সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যত
সভার শেষ পর্যায়ে, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, “বাংলাদেশের দক্ষ কর্মীর অভাব একটি বড় সমস্যা, যা শুধু সৌদি আরবের জন্য নয়, সারা পৃথিবীজুড়ে অন্যান্য দেশের জন্যও প্রযোজ্য। আমরা যত বেশি দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারব, তত বেশি দেশের জন্য অবদান রাখতে পারব।” তিনি আরও যোগ করেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যা ভবিষ্যতে আরো বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে।”
এই আলোচনা সভায় পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দিন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব) নজরুল ইসলাম, পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।











