লন্ডনের ফ্ল্যাট কেলেঙ্কারি: টিউলিপ সিদ্দিকের মন্ত্রিত্ব হারানোর আশঙ্কা
- Update Time : ০৫:০৭:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৫
- / ১৮৭ Time View

যুক্তরাজ্যের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিক বর্তমানে লন্ডনের বহুল আলোচিত ফ্ল্যাট কেলেঙ্কারির কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছেন। লন্ডনের কিংস ক্রস এলাকায় অবস্থিত এই ফ্ল্যাটটি নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল ও দ্য মেইল অন সানডে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ফ্ল্যাটটি টিউলিপ সিদ্দিক উপহার হিসেবে পেয়েছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। যদিও টিউলিপ সিদ্দিক বারবার দাবি করেছেন যে, ফ্ল্যাটটি তার বাবা-মা কিনে দিয়েছেন।
কিভাবে শুরু হলো এই বিতর্ক?
ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লন্ডনের দুই শয্যাকক্ষের এই ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭ লাখ পাউন্ড। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফ্ল্যাটটি উপহার হিসেবে টিউলিপকে দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ উঠেছে। ফ্ল্যাটটির মালিকানা একটি বাংলাদেশি ডেভেলপারের কাছ থেকে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ডেভেলপার বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ পরিচিত বলে জানা গেছে।
দ্য মেইল অন সানডে বারবার টিউলিপ সিদ্দিকের কাছে জানতে চেয়েছে যে, তিনি এই ফ্ল্যাটটি উপহার হিসেবে পেয়েছেন কিনা। তবে প্রতিবারই টিউলিপ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, ফ্ল্যাটটি তার বাবা-মা কিনে দিয়েছেন এবং সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। কিন্তু লেবার পার্টির একাধিক সূত্র বলেছে যে, ফ্ল্যাটটি উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।
ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন
ব্রিটেনের ভূমি রেজিস্ট্রি রেকর্ড থেকে জানা গেছে, ২০০৪ সালের নভেম্বরে এই ফ্ল্যাটটি টিউলিপ সিদ্দিকের নামে নিবন্ধিত হয়েছে। সেই সময়ে টিউলিপ লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করছিলেন এবং তার নিজস্ব কোনও উপার্জন ছিল না। ফ্ল্যাটটির কোনো মর্টগেজ ছিল না এবং কেনার দামও উল্লেখ ছিল না। এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ফ্ল্যাটটি কেনা হয়নি বরং তাকে উপহার দেওয়া হয়েছিল।
লেবার পার্টির প্রতিক্রিয়া
লেবার পার্টির একাধিক নেতা এবং এমপি বিষয়টি নিয়ে টিউলিপের প্রতি চাপ বাড়াচ্ছেন। তাদের মতে, যদি টিউলিপ সিদ্দিক ফ্ল্যাটটির প্রকৃত উৎস নিয়ে স্বচ্ছতা না আনতে পারেন, তাহলে তাকে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করতে হবে।
ব্রিটেনের টরি এমপি বব ব্ল্যাকম্যান বলেছেন, “টিউলিপ সিদ্দিককে অবশ্যই তার সম্পত্তির বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দিতে হবে। তিনি কী বলছেন এবং কেন বলছেন, তা পরিষ্কার করতে হবে। তা না হলে তিনি মন্ত্রী হিসেবে আর থাকতে পারবেন না।”
হান্টিংডনের টরি এমপি বেন ওবেস-জেকটি বলেছেন, “টিউলিপ সিদ্দিক সম্পর্কে নতুন এই তথ্য বেশ উদ্বেগজনক। এখন দেখা যাচ্ছে, ফ্ল্যাটটি উপহার হিসেবে পাওয়া এবং আগের দাবি অনুযায়ী কেনা হয়নি। ফলে টিউলিপের আরও কিছু প্রশ্নের জবাব দেওয়া প্রয়োজন।”
অর্থনৈতিক দুর্নীতি বন্ধের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী
টিউলিপ সিদ্দিক বর্তমানে যুক্তরাজ্যের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে আর্থিক খাতের দুর্নীতি বন্ধ করা। অথচ তার নিজের সম্পত্তি নিয়েই যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন এটি তার মন্ত্রিত্বের উপর গভীর প্রভাব ফেলছে। ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ছায়ামন্ত্রী ম্যাট ভিকার্স বলেছেন, “সরকারের কোনও সদস্যের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থাকা অগ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে যখন সেই সদস্য দুর্নীতি-বিরোধী মন্ত্রী, তখন বিষয়টি আরও গুরুতর।”
বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দুর্নীতির অভিযোগ
টিউলিপ সিদ্দিক এবং তার পরিবারের চার সদস্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন পাউন্ড আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগ নিয়েও তদন্ত চলছে। এসব অভিযোগের প্রভাব টিউলিপের ব্রিটিশ রাজনীতিতে অবস্থানকে আরও দুর্বল করছে।
পরিবার থেকে পাওয়া তথ্যের অসঙ্গতি
লেবার পার্টির সূত্র জানিয়েছে, ২০২২ সালে প্রথমবার যখন এই ফ্ল্যাট নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন টিউলিপ সিদ্দিক দাবি করেছিলেন যে, তার বাবা-মা তাদের বাড়ি বিক্রি করে ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, ফ্ল্যাটটি আসলে উপহার হিসেবে পাওয়া। এই তথ্যের অসঙ্গতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আইনি পদক্ষেপের হুমকি
টিউলিপ সিদ্দিক দ্য মেইল অন সানডের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি বলছে যে, তাদের কাছে প্রমাণ রয়েছে যে ফ্ল্যাটটি উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
বর্তমানে লেবার পার্টির ভেতরে এবং বাইরে টিউলিপের পদত্যাগের দাবি জোরালো হচ্ছে। ব্রিটেনের গণমাধ্যমে এ নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। যদি তিনি ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে স্বচ্ছতা না আনতে পারেন, তাহলে মন্ত্রিত্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন টিউলিপ সিদ্দিক।











