‘অভিযানের সময় পোশাক পরতে হবে, পরিচয়পত্র দেখাতে হবে’ সিভিল ড্রেসে ডিবি কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে না: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
- Update Time : ০৪:৫৪:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৫
- / ১৮৩ Time View

সাদা পোশাকে (সিভিল ড্রেস) অভিযান চালানোর বিষয়ে ডিবি ) কার্যক্রমে নতুন নির্দেশনা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, “ডিবি পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে গেলে অবশ্যই নির্ধারিত পোশাক পরতে হবে এবং পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। সিভিল ড্রেসে অভিযান চালানোর কোনো অনুমতি নেই। আইনের বাইরে কোনো কাজ করা যাবে না।”
সোমবার দুপুরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয় পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, “ডিবির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ডিবির সদস্যরা জনগণের সেবা দেবে এবং জনগণের আস্থা অর্জন করতে কাজ করবে। কোনোভাবেই এমন কিছু করা যাবে না, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিবি পুলিশ নিয়ে ভয় বা শঙ্কা তৈরি হয়।”
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন, “যেকোনো অভিযানের সময় ডিবি কর্মকর্তারা নির্ধারিত পোশাক (জ্যাকেট) পরিধান করবেন এবং নিজ নিজ পরিচয়পত্র প্রদর্শন করবেন। জনগণকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
আইনের বাইরে নির্দেশ মানতে নিষেধ
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ডিবি সদস্যদের সতর্ক করে বলেন, “আইনের বাইরে কোনো কাজ করার সুযোগ নেই। এমনকি যদি আমি নিজেও কোনো বেআইনি নির্দেশনা দিই, সেটিও তারা অনুসরণ করবে না। আইন ও নিয়মের মধ্যে থেকেই ডিবির কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। কোনোভাবেই আইন ভঙ্গ করা যাবে না।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই, ডিবি পুলিশ জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠুক। এজন্য তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে আইনসঙ্গত এবং নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য।”
‘আয়নাঘর থাকবে না, পুকুর হবে আয়নার মতো পরিষ্কার’
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে থাকা ‘আয়নাঘর’ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মজার ছলে বলেন, “ডিবি কার্যালয়ে আয়নাঘর বা ভাতের হোটেলের মতো কোনো কিছু থাকবে না। এ ধরনের অপসংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমার অনুরোধ, ডিবি কার্যালয়ের সামনে যে পুকুরটি রয়েছে, সেটিকে আয়নার মতো পরিষ্কার করে রাখা হোক। পুকুরটি এমনভাবে পরিষ্কার করতে হবে যেন এতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যায়। এটি প্রতীকী হলেও শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতার প্রতিফলন ঘটাবে।”
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যে ডিবি কার্যালয়ের ঐতিহাসিক ‘আয়নাঘর’ প্রসঙ্গ উঠে আসে। অতীতে ডিবির এই আয়নাঘরকে নির্যাতনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ ছিল। এই প্রসঙ্গ টেনে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “এখন ডিবি একটি পেশাদার ও আধুনিক সংস্থা হিসেবে কাজ করবে। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের জন্য ডিবিকে আরও স্বচ্ছ হতে হবে।”
সত্য সংবাদ প্রকাশের আহ্বান
মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “আপনারা বিভিন্ন সময়ে সত্য সংবাদ প্রকাশ করে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান মিডিয়ার মিথ্যা সংবাদ প্রচারের বিরুদ্ধে আপনারা যেভাবে প্রতিরোধ করেছেন, সেটি প্রশংসনীয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমি যদি কোনো দুর্নীতি করি বা কোনো ভুল কাজ করি, আপনারা তা প্রকাশ করবেন। তবে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করবেন না। সত্য ঘটনা তুলে ধরুন। সত্য সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।”
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “আপনারা দেখেছেন, ইন্ডিয়ান মিডিয়ার অনেক মিথ্যা সংবাদ প্রচার কমে গেছে। এটি সম্ভব হয়েছে আপনাদের সত্য সংবাদ প্রকাশের কারণে। এই ধারা অব্যাহত রাখুন।”
উপপরিদর্শক (এসআই) পদে বাদ পড়াদের বিষয়ে মন্তব্য
সম্প্রতি শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বাদ পড়া ৩২১ উপপরিদর্শক (এসআই) সচিবালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “প্রতিটি একাডেমিতে শৃঙ্খলা একটি বড় বিষয়। যাঁরা শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে বাদ পড়েছেন, তাঁদের পুনর্বহাল করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ পুলিশের একাডেমি অত্যন্ত পুরোনো এবং এই উপমহাদেশে সুপরিচিত। এখানে প্রশিক্ষণ চলাকালে যাঁরা শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে বাদ পড়েছেন, তাঁদের পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হবে না। কারণ, তারা শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন।”
উপদেষ্টা আরও বলেন, “যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের উচিত ছিল সঠিক নিয়ম মেনে আবেদন করা। তারা যদি সঠিক পদ্ধতিতে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজি) কাছে আবেদন করতেন, বিষয়টি বিবেচনা করা যেত। কিন্তু তারা আইজির কাছে না গিয়ে সচিবালয়ের সামনে অবস্থান নিয়েছেন। এতে প্রমাণ হয়, তারা এখনো শৃঙ্খলাবদ্ধ নন। উচ্ছৃঙ্খল আচরণের কারণে তাদের পুনর্বহাল করা সম্ভব নয়।”
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এ সময় বলেন, “আমরা চাই আমাদের পুলিশ বাহিনী বিশ্বের সেরা বাহিনীগুলোর মধ্যে একটি হোক। এজন্য শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। শৃঙ্খলা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই টিকতে পারে না।”
ডিবিকে আধুনিক ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশনা
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ডিবিকে আরও পেশাদার, আধুনিক, এবং জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “ডিবির কাজ হবে অপরাধ দমন এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে সেই কাজটি করতে হবে আইন ও নৈতিকতার মধ্যে থেকে। কোনো ধরনের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “ডিবির সদস্যরা জনগণের জন্য কাজ করবেন। তাদের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস বাড়ানোর দায়িত্বও তাদের ওপর বর্তায়। জনগণ যাতে ডিবির ওপর আস্থা রাখতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বক্তব্যে ডিবির স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব, এবং শৃঙ্খলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। ডিবি সদস্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বারবার আইনের মধ্যে থেকে কাজ করার এবং জনগণের সঙ্গে ভালো আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি মিডিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন সত্য সংবাদ প্রকাশে অবিচল থাকে এবং গুজব বা মিথ্যা তথ্য প্রচার না করে।
ডিবিকে একটি আধুনিক, জনবান্ধব, এবং পেশাদার সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই নির্দেশনাগুলো ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।











