সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলের কারাগারে নির্যাতন: ফিরে আসা বন্দীদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৩:৩৫:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জানুয়ারী ২০২৫
  • / ৩১৩ Time View

prothomalo bangla 2025 01 01 1bgxnrze Untitled 6

ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি বন্দী মোয়াজাজ ওবাইয়েত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরের কাছে হাঁটছেন, ৮ জুলাই ২০২৪ ছবি: রয়টার্স

রয়টার্স, জেরুজালেম

ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি বন্দীদের জীবনের গল্পগুলো যেনো যুদ্ধবিধ্বস্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, দীর্ঘ বন্দিদশা, যৌন সহিংসতা এবং অন্যান্য অমানবিক পরিস্থিতি তাদের জীবনকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। এ ধরনের নির্যাতন শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, গোটা ফিলিস্তিনি সমাজেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।

ফিলিস্তিনি বন্দী মোয়াজাজ ওবাইয়েতের সুস্থ অবস্থার এ ছবি পশ্চিম তীরের বেথলেহেম শহরের কাছে একটি শরীরচর্চা কেন্দ্র থেকে তোলা। ছবিটি কবে তোলা জানা যায়নি ছবি: রয়টার্সের সংগৃহীত

 

মোয়াজাজ ওবাইয়েতের করুণ পরিণতি

৩৭ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি মোয়াজাজ ওবাইয়েত ছিলেন একজন স্বাস্থ্যবান শরীরবিদ ও পাঁচ সন্তানের বাবা। ইসরায়েলি বাহিনী তাঁকে দুইবার আটক করে। প্রথমবার, ৯ মাস বন্দি থাকার পর গত জুলাইয়ে মুক্তি পেলেও, তিন মাস পর আবারও তাঁকে আটক করা হয়।

বন্দিদশার প্রভাব তাঁর জীবনে ব্যাপকভাবে ফুটে উঠেছে। পশ্চিম তীরের বেথলেহেম সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালের চিকিৎসকদের নোটে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি তীব্র পিটিএসডি (পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার) রোগে আক্রান্ত। ইসরায়েলের প্রত্যন্ত কেতজিয়ত কারাগারে তার উপর চালানো সহিংসতার সঙ্গে এই রোগের গভীর সংযোগ রয়েছে।

বন্দি নির্যাতনের শিকার অন্যরা

মোয়াজাজের মতো আরও অনেক ফিলিস্তিনি বন্দির অভিজ্ঞতা একই রকম। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কেউ শারীরিক ক্ষত নিয়ে ফিরে আসছেন, কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। এমনকি অনেক বন্দি ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন।

যুদ্ধের প্রেক্ষাপট আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সঙ্গে শুরু হওয়া সংঘাতের পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী হাজারো ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে। কারাগারে তাদের ওপর চালানো অত্যাচার নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলে, বন্দি বিনিময়ের আওতায় অনেক ফিলিস্তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেতে পারেন। কিন্তু তারা কি আদৌ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন?

মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ

ইসরায়েলি অধিকার গ্রুপ পাবলিক কমিটি অ্যাগেইনস্ট টর্চার ইন ইসরায়েলের (পিসিএটিআই) নির্বাহী পরিচালক তাল স্টেইনার বলেন, ‘৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলের কারাগারগুলোতে নির্যাতনের ঘটনার রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটেছে। মুক্তি পাওয়া বন্দীদের অভিজ্ঞতা প্রায় অভিন্ন। তাঁদের এ ক্ষত সারা জীবন বহন করতে হতে পারে। এই পরিস্থিতি ফিলিস্তিনি সমাজেও ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।’

জাতিসংঘ অন্যান্য প্রতিবেদন

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর গত আগস্টে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে উল্লেখ করা হয়, ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়েছে। বন্দিদের ওপর যৌন সহিংসতা এবং তাদের ভয়ানক অমানবিক অবস্থায় রাখার ঘটনাও উঠে এসেছে।

ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বন্দি নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, কারাগারগুলো আইনানুগ পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। তবে কিছু অভিযোগের তদন্ত চলছে।

সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

বন্দি নির্যাতনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে না; এটি পুরো ফিলিস্তিনি সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। মুক্তি পাওয়া বন্দিদের পরিবারগুলোও এই মানসিক চাপের অংশীদার হচ্ছে।

উপসংহার

ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি থাকা ফিলিস্তিনিদের জীবনের এই অন্ধকার অধ্যায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে যদি বন্দি বিনিময় চুক্তি হয়, তাহলে এই বন্দিদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন হবে। কিন্তু সেই চিকিৎসা তাদের ক্ষতগুলো মুছে দিতে কতটা কার্যকর হবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

তথ্যসূত্র:

  • রয়টার্স
  • জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদন
  • পাবলিক কমিটি অ্যাগেইনস্ট টর্চার ইন ইসরায়েলের (পিসিএটিআই) বিবৃতি
  • বেথলেহেম সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালের চিকিৎসকদের নোট

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ইসরায়েলের কারাগারে নির্যাতন: ফিরে আসা বন্দীদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি

Update Time : ০৩:৩৫:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জানুয়ারী ২০২৫
ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি বন্দী মোয়াজাজ ওবাইয়েত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরের কাছে হাঁটছেন, ৮ জুলাই ২০২৪ ছবি: রয়টার্স

রয়টার্স, জেরুজালেম

ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি বন্দীদের জীবনের গল্পগুলো যেনো যুদ্ধবিধ্বস্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, দীর্ঘ বন্দিদশা, যৌন সহিংসতা এবং অন্যান্য অমানবিক পরিস্থিতি তাদের জীবনকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। এ ধরনের নির্যাতন শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, গোটা ফিলিস্তিনি সমাজেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।

ফিলিস্তিনি বন্দী মোয়াজাজ ওবাইয়েতের সুস্থ অবস্থার এ ছবি পশ্চিম তীরের বেথলেহেম শহরের কাছে একটি শরীরচর্চা কেন্দ্র থেকে তোলা। ছবিটি কবে তোলা জানা যায়নি ছবি: রয়টার্সের সংগৃহীত

 

মোয়াজাজ ওবাইয়েতের করুণ পরিণতি

৩৭ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি মোয়াজাজ ওবাইয়েত ছিলেন একজন স্বাস্থ্যবান শরীরবিদ ও পাঁচ সন্তানের বাবা। ইসরায়েলি বাহিনী তাঁকে দুইবার আটক করে। প্রথমবার, ৯ মাস বন্দি থাকার পর গত জুলাইয়ে মুক্তি পেলেও, তিন মাস পর আবারও তাঁকে আটক করা হয়।

বন্দিদশার প্রভাব তাঁর জীবনে ব্যাপকভাবে ফুটে উঠেছে। পশ্চিম তীরের বেথলেহেম সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালের চিকিৎসকদের নোটে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি তীব্র পিটিএসডি (পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার) রোগে আক্রান্ত। ইসরায়েলের প্রত্যন্ত কেতজিয়ত কারাগারে তার উপর চালানো সহিংসতার সঙ্গে এই রোগের গভীর সংযোগ রয়েছে।

বন্দি নির্যাতনের শিকার অন্যরা

মোয়াজাজের মতো আরও অনেক ফিলিস্তিনি বন্দির অভিজ্ঞতা একই রকম। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কেউ শারীরিক ক্ষত নিয়ে ফিরে আসছেন, কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। এমনকি অনেক বন্দি ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন।

যুদ্ধের প্রেক্ষাপট আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সঙ্গে শুরু হওয়া সংঘাতের পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী হাজারো ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে। কারাগারে তাদের ওপর চালানো অত্যাচার নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলে, বন্দি বিনিময়ের আওতায় অনেক ফিলিস্তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেতে পারেন। কিন্তু তারা কি আদৌ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন?

মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ

ইসরায়েলি অধিকার গ্রুপ পাবলিক কমিটি অ্যাগেইনস্ট টর্চার ইন ইসরায়েলের (পিসিএটিআই) নির্বাহী পরিচালক তাল স্টেইনার বলেন, ‘৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলের কারাগারগুলোতে নির্যাতনের ঘটনার রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটেছে। মুক্তি পাওয়া বন্দীদের অভিজ্ঞতা প্রায় অভিন্ন। তাঁদের এ ক্ষত সারা জীবন বহন করতে হতে পারে। এই পরিস্থিতি ফিলিস্তিনি সমাজেও ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।’

জাতিসংঘ অন্যান্য প্রতিবেদন

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর গত আগস্টে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে উল্লেখ করা হয়, ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়েছে। বন্দিদের ওপর যৌন সহিংসতা এবং তাদের ভয়ানক অমানবিক অবস্থায় রাখার ঘটনাও উঠে এসেছে।

ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বন্দি নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, কারাগারগুলো আইনানুগ পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। তবে কিছু অভিযোগের তদন্ত চলছে।

সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

বন্দি নির্যাতনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে না; এটি পুরো ফিলিস্তিনি সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। মুক্তি পাওয়া বন্দিদের পরিবারগুলোও এই মানসিক চাপের অংশীদার হচ্ছে।

উপসংহার

ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি থাকা ফিলিস্তিনিদের জীবনের এই অন্ধকার অধ্যায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে যদি বন্দি বিনিময় চুক্তি হয়, তাহলে এই বন্দিদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন হবে। কিন্তু সেই চিকিৎসা তাদের ক্ষতগুলো মুছে দিতে কতটা কার্যকর হবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

তথ্যসূত্র:

  • রয়টার্স
  • জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদন
  • পাবলিক কমিটি অ্যাগেইনস্ট টর্চার ইন ইসরায়েলের (পিসিএটিআই) বিবৃতি
  • বেথলেহেম সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালের চিকিৎসকদের নোট