সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কে এই আবু মুহাম্মদ আল-জুলানি? বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের নেপথ্যের বিদ্রোহী নেতা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৯:৩৬:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৪
  • / ২৪৭ Time View

prothomalo bangla 2024 12 07 fyfqggzb Untitled 1

হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) প্রধান আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি ফাইল ছবি: রয়টার্স

 

রবিবার ইসলামি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আলশাম (এইচটিএস) ঘোষণা দেয় যে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন ঘটেছে। এইচটিএস-এর বিবৃতিতে বলা হয়, “স্বৈরাচারী শাসক” আসাদ দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, যার ফলে প্রায় দুই দশকের একনায়কতন্ত্রের অবসান হয়েছে। এই ইতিহাস-পরিবর্তনকারী ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন আবু মুহাম্মদ আলজুলানি, যিনি এইচটিএস-এর প্রধান এবং আসাদবিরোধী আন্দোলনের প্রধান প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

এই নিবন্ধে আল-জুলানির জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে—একজন অজানা যোদ্ধা থেকে সিরিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী বিদ্রোহী নেতায় পরিণত হওয়ার দীর্ঘ যাত্রা।

আবু মোহাম্মদ আল-জোলানির (মাঝে) আসল নাম আহমেদ হুসাইন আল-শারা ফাইল ছবি: রয়টার্স

প্রারম্ভিক জীবন শিক্ষা

আবু মুহাম্মদ আল-জুলানি, যার আসল নাম আহমেদ হুসেইন আলশারা, ১৯৮২ সালে সৌদি আরবের রিয়াদে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার সিরিয়ান বংশোদ্ভূত। তার পিতা একজন পেট্রোলিয়াম প্রকৌশলী ছিলেন এবং সৌদি আরবে কাজ করতেন। ফলে জুলানি মধ্যবিত্ত জীবনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন।

১৯৮৯ সালে তার পরিবার সিরিয়ায় ফিরে আসে এবং দামাস্কাসের কাছে একটি এলাকায় বসবাস শুরু করে। তার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হয় যে তিনি হয়তো চিকিৎসাশাস্ত্র বা প্রকৌশলবিদ্যায় পড়াশোনা করছিলেন। কিন্তু তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি জিহাদি আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ইরাকে আলকায়েদায় যোগদান

জুলানির সশস্ত্র জীবনের সূচনা ঘটে ২০০৩ সালে, যখন তিনি ইরাকে মার্কিন বাহিনীর আগ্রাসনের পর আল-কায়েদা ইন ইরাক (AQI)-এ যোগ দেন। তিনি মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন এবং দ্রুতই সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে আসেন।

২০০৬ সালে মার্কিন বাহিনী তাকে আটক করে এবং পাঁচ বছর কারাগারে রাখে। এই সময়ে তিনি আদর্শিকভাবে আরও শক্তিশালী হন এবং কারাগারের অন্যান্য জিহাদিদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

আলনুসরা ফ্রন্ট থেকে এইচটিএসএর নেতৃত্ব

২০১১ সালে মুক্তি পাওয়ার পর জুলানি সিরিয়ায় ফিরে আসেন। তখন আরব

বসন্তের ঢেউ সিরিয়ায় আঘাত হেনেছিল এবং আসাদের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধছিল। এই পরিস্থিতিতে জুলানি আল-কায়েদার সমর্থনে আলনুসরা ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করেন।

এই সংগঠনটি দ্রুত সামরিক দক্ষতা ও কঠোর শাসনের জন্য পরিচিতি লাভ করে। তবে ২০১৩ সালে, আইএসআইএস নেতা আবু বকর আলবাগদাদির সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে আল-নুসরা ফ্রন্ট আলাদা হয়ে যায়।

পরিবর্তন এইচটিএস গঠন

২০১৬ সালে জুলানি আল-কায়েদার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানোর ঘোষণা দেন এবং জাবহাত ফাতেহ আলশাম নামে নতুন সংগঠন গঠন করেন। ২০১৭ সালে, তিনি সিরিয়ার বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে একত্রিত করে হায়াত তাহরির আলশাম (HTS) প্রতিষ্ঠা করেন।

আসাদের পতনে জুলানির ভূমিকা

জুলানির নেতৃত্বে এইচটিএস সিরিয়ার ইদলিব অঞ্চলে বাশার আল-আসাদের বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাদের সামরিক কৌশল এবং সুসংগঠিত কাঠামো এই সাফল্যের পেছনে প্রধান কারণ ছিল। আসাদের সরকারের পতনের জন্য জুলানি এবং এইচটিএসের দীর্ঘ পরিকল্পনা এবং লড়াই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বিতর্ক সমালোচনা

আবু মুহাম্মদ আল-জুলানির নেতৃত্ব নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। তার অতীত এবং কৌশল নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষত, এইচটিএসএর কঠোর ইসলামি শাসন ব্যবস্থা অনেকের কাছে অগণতান্ত্রিক বলে বিবেচিত।

তাছাড়া, জুলানির আল-কায়েদা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া আদর্শিক নাকি কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল, তা নিয়েও অনেকের সন্দেহ রয়েছে।

সিরিয়ার ভবিষ্যৎ: একটি অজানা অধ্যায়

আসাদের সরকারের পতনের পর সিরিয়া এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে এইচটিএস কীভাবে দেশ শাসন করবে এবং জুলানি কীভাবে একজন বিদ্রোহী নেতার ভূমিকা থেকে রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায় পরিবর্তিত হবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্ববাসী এখন সিরিয়ার নতুন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে—একটি দেশ যা বহু বছর ধরে যুদ্ধ, ধ্বংস এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকার। আবু মুহাম্মদ আলজুলানির নেতৃত্বে সিরিয়া স্থিতিশীলতা এবং শান্তির পথে এগোতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

 

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

কে এই আবু মুহাম্মদ আল-জুলানি? বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের নেপথ্যের বিদ্রোহী নেতা

Update Time : ০৯:৩৬:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৪
হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) প্রধান আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি ফাইল ছবি: রয়টার্স

 

রবিবার ইসলামি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আলশাম (এইচটিএস) ঘোষণা দেয় যে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন ঘটেছে। এইচটিএস-এর বিবৃতিতে বলা হয়, “স্বৈরাচারী শাসক” আসাদ দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, যার ফলে প্রায় দুই দশকের একনায়কতন্ত্রের অবসান হয়েছে। এই ইতিহাস-পরিবর্তনকারী ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন আবু মুহাম্মদ আলজুলানি, যিনি এইচটিএস-এর প্রধান এবং আসাদবিরোধী আন্দোলনের প্রধান প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

এই নিবন্ধে আল-জুলানির জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে—একজন অজানা যোদ্ধা থেকে সিরিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী বিদ্রোহী নেতায় পরিণত হওয়ার দীর্ঘ যাত্রা।

আবু মোহাম্মদ আল-জোলানির (মাঝে) আসল নাম আহমেদ হুসাইন আল-শারা ফাইল ছবি: রয়টার্স

প্রারম্ভিক জীবন শিক্ষা

আবু মুহাম্মদ আল-জুলানি, যার আসল নাম আহমেদ হুসেইন আলশারা, ১৯৮২ সালে সৌদি আরবের রিয়াদে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার সিরিয়ান বংশোদ্ভূত। তার পিতা একজন পেট্রোলিয়াম প্রকৌশলী ছিলেন এবং সৌদি আরবে কাজ করতেন। ফলে জুলানি মধ্যবিত্ত জীবনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন।

১৯৮৯ সালে তার পরিবার সিরিয়ায় ফিরে আসে এবং দামাস্কাসের কাছে একটি এলাকায় বসবাস শুরু করে। তার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হয় যে তিনি হয়তো চিকিৎসাশাস্ত্র বা প্রকৌশলবিদ্যায় পড়াশোনা করছিলেন। কিন্তু তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি জিহাদি আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ইরাকে আলকায়েদায় যোগদান

জুলানির সশস্ত্র জীবনের সূচনা ঘটে ২০০৩ সালে, যখন তিনি ইরাকে মার্কিন বাহিনীর আগ্রাসনের পর আল-কায়েদা ইন ইরাক (AQI)-এ যোগ দেন। তিনি মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন এবং দ্রুতই সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে আসেন।

২০০৬ সালে মার্কিন বাহিনী তাকে আটক করে এবং পাঁচ বছর কারাগারে রাখে। এই সময়ে তিনি আদর্শিকভাবে আরও শক্তিশালী হন এবং কারাগারের অন্যান্য জিহাদিদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

আলনুসরা ফ্রন্ট থেকে এইচটিএসএর নেতৃত্ব

২০১১ সালে মুক্তি পাওয়ার পর জুলানি সিরিয়ায় ফিরে আসেন। তখন আরব বসন্তের ঢেউ সিরিয়ায় আঘাত হেনেছিল এবং আসাদের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধছিল। এই পরিস্থিতিতে জুলানি আল-কায়েদার সমর্থনে আলনুসরা ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করেন।

এই সংগঠনটি দ্রুত সামরিক দক্ষতা ও কঠোর শাসনের জন্য পরিচিতি লাভ করে। তবে ২০১৩ সালে, আইএসআইএস নেতা আবু বকর আলবাগদাদির সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে আল-নুসরা ফ্রন্ট আলাদা হয়ে যায়।

পরিবর্তন এইচটিএস গঠন

২০১৬ সালে জুলানি আল-কায়েদার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানোর ঘোষণা দেন এবং জাবহাত ফাতেহ আলশাম নামে নতুন সংগঠন গঠন করেন। ২০১৭ সালে, তিনি সিরিয়ার বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে একত্রিত করে হায়াত তাহরির আলশাম (HTS) প্রতিষ্ঠা করেন।

আসাদের পতনে জুলানির ভূমিকা

জুলানির নেতৃত্বে এইচটিএস সিরিয়ার ইদলিব অঞ্চলে বাশার আল-আসাদের বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাদের সামরিক কৌশল এবং সুসংগঠিত কাঠামো এই সাফল্যের পেছনে প্রধান কারণ ছিল। আসাদের সরকারের পতনের জন্য জুলানি এবং এইচটিএসের দীর্ঘ পরিকল্পনা এবং লড়াই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বিতর্ক সমালোচনা

আবু মুহাম্মদ আল-জুলানির নেতৃত্ব নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। তার অতীত এবং কৌশল নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষত, এইচটিএসএর কঠোর ইসলামি শাসন ব্যবস্থা অনেকের কাছে অগণতান্ত্রিক বলে বিবেচিত।

তাছাড়া, জুলানির আল-কায়েদা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া আদর্শিক নাকি কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল, তা নিয়েও অনেকের সন্দেহ রয়েছে।

সিরিয়ার ভবিষ্যৎ: একটি অজানা অধ্যায়

আসাদের সরকারের পতনের পর সিরিয়া এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে এইচটিএস কীভাবে দেশ শাসন করবে এবং জুলানি কীভাবে একজন বিদ্রোহী নেতার ভূমিকা থেকে রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায় পরিবর্তিত হবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্ববাসী এখন সিরিয়ার নতুন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে—একটি দেশ যা বহু বছর ধরে যুদ্ধ, ধ্বংস এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকার। আবু মুহাম্মদ আলজুলানির নেতৃত্বে সিরিয়া স্থিতিশীলতা এবং শান্তির পথে এগোতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।