শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার: শ্বেতপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ
- Update Time : ০৮:৪৫:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৪
- / ২৬৪ Time View

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের গত ১৫ বছরের শাসনামলে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে এক শ্বেতপত্রে। দেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদন
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি দীর্ঘ তিন মাসের অনুসন্ধানের পর তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন রোববার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করে। এই প্রতিবেদনে দুর্নীতি, অর্থপাচার, এবং আর্থিক অনিয়মের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি হস্তান্তরের সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল, যা জাতির উপকারে আসবে।“ তিনি সুপারিশ করেন, এই নথি স্কুল–কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যেন শিক্ষার্থীরা এর থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
দুর্নীতি ও লুটপাটের ভয়াবহ চিত্র
প্রতিবেদন অনুসারে, শেখ হাসিনার শাসনামলে “চামচা পুঁজিবাদ“ বা ক্রনি ক্যাপিটালিজমের মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন প্রভাবিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য ২৯টি প্রকল্প পর্যালোচনার মধ্যে ৭টি বড় প্রকল্পে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচের অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে।
কমিটির সদস্য ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ৭টি প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা অনিয়মের কারণে ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
কর অব্যাহতির প্রভাব
অন্যদিকে, কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানান, কর অব্যাহতির ফলে দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশ অর্থনীতির বাইরে চলে গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, কর অব্যাহতির পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনা গেলে শিক্ষা বাজেট দ্বিগুণ এবং স্বাস্থ্য বাজেট তিন গুণ করা যেত।
বিদ্যুৎ
অন্য এক সদস্য এম তামিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মধ্যে ১০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার দুর্নীতির মাধ্যমে পাচার হয়েছে।
সরকারি প্রকল্প ও লুটপাট
প্রতিবেদন অনুসারে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) গত ১৫ বছরে ৭ লাখ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে, যার ৪০ শতাংশ আমলাদের লুটপাটে ব্যবহৃত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক এ কে এনামুল হক।
প্রধান উপদেষ্টার প্রতিক্রিয়া
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেন, “গরিব মানুষের রক্ত পানি করা টাকা যেভাবে লুটপাট হয়েছে তা আতঙ্কজনক।“ তিনি আরো বলেন, “এই লুটপাটের জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।“
প্রতিবেদন প্রকাশের সম্ভাবনা
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, শ্বেতপত্রটি শিগগিরই জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, এবং মুখ্যসচিব সিরাজ উদ্দিন।
জাতীয় ভবিষ্যতের প্রতি গুরুত্ব
এই প্রতিবেদন জাতীয় অর্থনৈতিক নীতির পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এবং ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা দেয়। শ্বেতপত্রটি জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি দুর্নীতি দমন এবং অর্থপাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করবে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে অর্থনৈতিক অনিয়ম ও দুর্নীতির যে চিত্র এই শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে তা জাতীয়ভাবে দায়িত্বশীল আচরণের দাবি জানায়। এই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো কার্যকর করা গেলে দেশের আর্থিক অবস্থা উন্নত করার সম্ভাবনা রয়েছে।











