ইসকন: ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান না সন্ত্রাসী সংগঠন?
- Update Time : ০৯:১০:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৪
- / ২৫৩ Time View

ইসকনের প্রেক্ষাপট ও ধর্মীয় ভিত্তি
ইসকন (ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস) ১৯৬৬ সালে এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল ভগবানের ভক্তি এবং আধ্যাত্মিক উন্নয়নের প্রচার।
বিশ্বজুড়ে ইসকনকে একটি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আন্দোলন হিসেবে দেখা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংগঠনটির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগ তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষত জমি দখল, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং ধর্মীয় চরমপন্থা প্রচারের অভিযোগে ইসকনের স্থানীয় কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ইসকনের কার্যকলাপকে দেশের শান্তি, সহাবস্থান ও আইনের শাসনের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি জোরালোভাবে উঠেছে। এ ধরনের অভিযোগ বিশ্বব্যাপী ইসকনের বৈশ্বিক অবস্থানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং তাদের কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশে ইসকনের কার্যক্রম ও অভিযোগ
বাংলাদেশে ইসকনের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে। প্রাথমিকভাবে তারা ভক্তি যোগের প্রচার এবং মন্দির নির্মাণের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত করার লক্ষ্যে কাজ করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যা সংগঠনটির কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
১. সাম্প্রদায়িক উস্কানি
ইসকনের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে যে তারা বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নামে অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। তাদের কিছু নেতা ও সদস্যদের বক্তব্য এবং কার্যক্রম সমাজে ধর্মীয় বিভাজন তৈরির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের প্রচারণা ও উস্কানিমূলক মন্তব্য মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।
২. অবৈধ জমি দখল ও মন্দির নির্মাণ
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসকনের বিরুদ্ধে অবৈধ জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে যে স্থানীয় মানুষদের জমি দখল করে সেখানে মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। এমনকি এর ফলে বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
৩. ধর্মীয় চরমপন্থা ও সহিংসতা
ইসকনের কিছু কর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে সহিংস কার্যকলাপে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালের কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, ইসকনের নাম ব্যবহার করে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সহিংসতা উস্কে দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় সহাবস্থানের মূলনীতির পরিপন্থী এই ধরনের কার্যক্রম তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী তকমা আরোপের যথেষ্ট কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে ইসকনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
বিশ্বজুড়ে ইসকনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সংগঠনটির বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে বিপদে ফেলেছে। বাংলাদেশে, যেমন জমি দখল এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানির অভিযোগ উঠেছে, তেমনই ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং অন্যান্য দেশে ইসকনের কিছু শাখা এসব কার্যকলাপে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভারতসহ বেশ কিছু অঞ্চলে তাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উস্কানি, অর্থনৈতিক দুর্নীতি, এবং মন্দির নির্মাণের নামে অবৈধভাবে জমি দখল করার অভিযোগ উঠেছে। শ্রীলঙ্কায়ও স্থানীয় মন্দির নির্মাণের জন্য জমি দখল এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। নেপালে ইসকনের নামে জমির বিরুদ্ধে দাবির কারণে স্থানীয় জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এসব অভিযোগ একে একে ইসকনের বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। তাদের বিরুদ্ধে উঠা এই অভিযোগগুলো সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, যার ফলে সংগঠনটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম সীমিত করার দাবী উঠেছে।
বাংলাদেশে নিষিদ্ধের দাবি
বাংলাদেশে ইসকনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অভিযোগ এবং সংঘটিত সহিংসতার প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু মহল তাদের নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারকে ইসকনের কার্যক্রম গভীরভাবে তদন্ত করার মাধ্যমে দেশের ধর্মীয় সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অনেকেই মনে করেন, এমন একটি প্রতিষ্ঠান যদি সহিংসতা বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে, তবে তা দেশের সামগ্রিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষত ভুক্তভোগী পরিবার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সাথে, ইসকনের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের প্রভাব বাংলাদেশে কীভাবে কাজ করছে তা তদন্ত করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কার্যকলাপের মাধ্যমে দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এই কারণে ইসকনকে নিষিদ্ধ করার দাবিটি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে, এবং সরকারকে এই বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বিশেষভাবে আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে:
১. রাষ্ট্রের দায়িত্ব: রাষ্ট্রের দায়িত্ব: ধর্মীয় সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারকে ইসকনের কার্যক্রম গভীরভাবে তদন্ত করা উচিত। বাংলাদেশের মতো একটি বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় দেশে, যেখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসাথে বসবাস করেন, সেখানে ধর্মীয় সহাবস্থানের পরিবেশ রক্ষা করা সরকারের প্রধান কর্তব্য। ইসকনের মতো আন্তর্জাতিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যদি দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা সহিংসতার উত্স হয়ে থাকে, তবে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। সরকারের উচিত ইসকনের কার্যক্রমের প্রতিটি দিক, যেমন ধর্মীয় প্রচার, সামাজিক প্রভাব, সম্পত্তি দখল এবং অন্য ধর্মের প্রতি মনোভাব, এসব বিষয় গভীরভাবে পরীক্ষা করা। এটি নিশ্চিত করবে যে তাদের কার্যক্রম দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং সামাজিক শান্তির সাথে সাংঘর্ষিক নয়। এভাবে সরকারের প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও অরক্ষণীয় হলে, সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে, এবং ধর্মীয় সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় রাখা যাবে।
২. স্থানীয় ক্ষোভ: ভুক্তভোগী পরিবার ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যখন একটি ধর্মীয় সংগঠন, যেমন ইসকন, স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে বা তাদের বিরুদ্ধে অবিচার, সহিংসতা বা অন্য কোনো অমানবিক কার্যকলাপ পরিচালনা করে, তখন তা ওই অঞ্চলের জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যারা বিভিন্ন কারণে প্রান্তিক অবস্থায় থাকতে পারেন, তারা অধিকাংশ সময় এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ক্ষোভের পরিণতি হতে পারে সমাজে আস্থাহীনতা, সহিংস প্রতিবাদ, এবং সামাজিক সম্প্রীতি ভেঙে পড়া। এ ধরনের পরিস্থিতি রোধ করতে, সরকারকে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে ভুক্তভোগী পরিবার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে এই সমস্যার সমাধান করা উচিত। শক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে যদি এই জনগণের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থা পুনঃস্থাপন করা যায়, তবে সন্ত্রাসী বা সহিংস কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
৩. আন্তর্জাতিক সংযোগ: ইসকনের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের প্রভাব বাংলাদেশে কতটা কাজ করছে, তা তদন্ত করা দরকার। ইসকন একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন, যার শাখাগুলি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তৃত এবং তাদের কার্যক্রমের পরিধি ও প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে যায়। ইসকনের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে ধর্মীয়, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে, তা দেশের সামগ্রিক ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশে কি ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, যদি বিদেশী ফান্ডিং বা আন্তর্জাতিক সমর্থনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে অস্থিরতা বা সহিংসতা সৃষ্টি হয়, তবে তা দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকির কারণ হতে পারে। এ কারণে, সরকারের উচিত ইসকনের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, তার ওপর নজরদারি রাখা এবং তা তদন্ত করা, যাতে দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় থাকে।
ইসকন কি সত্যিই সন্ত্রাসী সংগঠন?
ইসকনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি তাদের সাম্প্রতিক কার্যক্রম ও অভিযোগের ভিত্তিতে নির্ভর করে। বিশ্বব্যাপী ইসকন একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হলেও , বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসকনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তা গুরুতর এবং তদন্তযোগ্য। বিশেষ করে, কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উস্কানি, ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রতি অবজ্ঞা, এবং সহিংস কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
এই অভিযোগগুলি প্রমাণিত , তবে ইসকনের কোনো শাখা বা সদস্য সন্ত্রাসী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকলে, তার জন্য সংগঠনের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে, সরকার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত, অভিযোগগুলোর গভীর তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যদি দেখা যায় যে, ইসকন বা তার শাখাগুলি কোনো ধরনের সহিংসতা বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, তবে তা কেবল বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী নয়, আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলির দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে, সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগের মোকাবিলা করতে হলে, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত, যাতে কোনো নিরীহ সদস্য বা সাধারণ ভক্তদের অবিচার না হয়।
শেষকথা, ইসকন একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম প্রশ্নের সম্মুখীন। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের বিরুদ্ধে জমি দখল, সাম্প্রদায়িক উস্কানি এবং সহিংসতার অভিযোগ তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের বাইরে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করা এবং প্রয়োজন হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কখনও সমাজে বিভাজন বা সহিংসতার কারণ হতে পারে না। ইসকন যদি সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি।











