জিহ্বা সংযত রাখা: মুমিনের বৈশিষ্ট্য
- Update Time : ০৫:০২:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৪
- / ২১১ Time View

জিহ্বা মানুষের এক অসাধারণ নিয়ামত। এটি একদিকে আমাদের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা প্রকাশের মাধ্যম, আবার অন্যদিকে এর ভুল ব্যবহারে আমরা বিপদগ্রস্ত হতে পারি। ইসলামে জিহ্বার সংযমকে ঈমানদার ব্যক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন ও হাদিসে এর গুরুত্ব গভীরভাবে আলোচিত হয়েছে।
জিহ্বার সংযম: কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا”
“আর মানুষের সঙ্গে উত্তমভাবে কথা বল।“
— (সূরা বাকারা: ৮৩)
এই নির্দেশ থেকে বোঝা যায়, উত্তম আচরণ ও ভদ্রতা শুধুমাত্র কাজের মাধ্যমে নয়, কথাবার্তায়ও প্রতিফলিত হতে হবে। জিহ্বার মাধ্যমে উত্তম কথা বললে সমাজে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
আবার আল্লাহ বলেন:
“مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ”
“মানুষ যে কথাই বলে, তার পাশে থাকে একজন তৎপর প্রহরী।“
— (সূরা ক্বাফ: ১৮)
এ আয়াতে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে প্রতিটি কথা রেকর্ড হয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে জিহ্বা সংযত রাখা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
“يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا”
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্য ও সঠিক কথা বল।“
— (সূরা আহযাব: ৭০)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, সত্য ও কল্যাণমুখী কথা বলার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।
হাদিসে জিহ্বা সংযমের গুরুত্ব
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
“مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ”
“যে ব্যক্তি তার জিহ্বা এবং লজ্জাস্থানের সংযমের নিশ্চয়তা দেয়, আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব।“
— (সহিহ বুখারি: ৬৪৭৪)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, জিহ্বা সংযত রাখা জান্নাতে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেন:
“إِنَّ أَكْثَرَ خَطَايَا ابْنِ آدَمَ فِي لِسَانِهِ”
“আদম সন্তানের অধিকাংশ পাপ তার জিহ্বার কারণে হয়।“
— (তাবরানি: ৭৩৫৯)
এই হাদিসে জিহ্বার ভুল ব্যবহারের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। কথার মাধ্যমে মানুষ সহজেই অন্যের ক্ষতি করতে পারে। এজন্য কথার আগে চিন্তা করা জরুরি।
জিহ্বা সংযত রাখার উপকারিতা
১. আত্মশুদ্ধি অর্জন:
জিহ্বা সংযত রাখার মাধ্যমে মানুষ তার আত্মার পবিত্রতা বজায় রাখতে পারে। এটি গীবত, মিথ্যা, এবং কটূক্তি থেকে রক্ষা করে।
২. সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়ন:
উত্তম কথা মানুষের হৃদয়ে প্রভাব ফেলে। এর মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ তৈরি হয়।
৩. পরকালীন সাফল্য:
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জিহ্বা সংযম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“الْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ”
“সুন্দর কথা বলাও একটি সাদকা।“
— (সহিহ বুখারি: ২৯৮৯)
৪. মনের প্রশান্তি:
অপ্রয়োজনীয় কথা না বললে মন ভারমুক্ত থাকে এবং অহেতুক দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
কথার সংযমে রাসুলুল্লাহর দৃষ্টান্ত
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বদা তার কথায় সততা ও দয়া প্রদর্শন করতেন। তিনি কখনো অপব্যবহার করেননি এবং অন্যদেরও সতর্ক করতেন। তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেই আমাদের জিহ্বার ব্যবহারে সংযমী হতে হবে।
মুমিনের করণীয়
১. গীবত, অপবাদ ও মিথ্যা এড়ানো:
হাদিসে এসেছে, গীবত করা এমন পাপ যা মৃত ব্যক্তির মাংস খাওয়ার সমতুল্য। (সূরা হুজরাত: ১২)
২. নিয়মিত আত্মসমীক্ষা:
প্রতিদিনের কথা ও কাজ বিশ্লেষণ করা এবং ভুল হলে তাওবা করা।
৩. চুপ থাকার অভ্যাস:
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
“مَنْ صَمَتَ نَجَا”
“যে নীরব থাকে, সে মুক্তি লাভ করে।“
— (তিরমিজি: ২৫০১)
৪. উত্তম কথা বলার চেষ্টা:
কথা বলার আগে চিন্তা করা উচিত এটি কল্যাণ বয়ে আনবে কি না।
শেষকথা, জিহ্বা সংযত রাখা শুধু মুমিনের নয়, সকল মানুষের জন্যই কল্যাণকর। এটি দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি অর্জনের মাধ্যম। আমাদের প্রতিটি কথার জন্য আমরা দায়বদ্ধ, এবং আমাদের প্রতিটি কথা আল্লাহর কাছে হিসাব দিতে হবে। তাই আমরা যেন সর্বদা আল্লাহর ভয় ও রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে কথা বলি।
আল্লাহ আমাদেরকে কল্যাণকর কথা বলার এবং ক্ষতিকর কথা থেকে বিরত থাকার তৌফিক দিন। আমিন।











