ইসলামী ব্যাংকে এখনো কিভাবে বহাল সেই এমডি?
- Update Time : ০২:৪৯:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৪
- / ২১১ Time View

শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংক দখলমুক্ত হলেও ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহী পদে এখনো পরিবর্তন আসেনি। ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা তার পদে বহাল রয়েছেন।
২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক দখলের পর এস আলম গ্রুপ বিভিন্ন সময়ে ৪৫টি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে বের করে নেয়। ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমতি ছাড়া এতো বড় অঙ্কের অর্থ বের করা অসম্ভব।
এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে জনগণের আমানত ঋণের নামে তুলে নেওয়া এবং বিদেশে পাচারের মতো কর্মকাণ্ড এমডি মুনিরুল মওলার সম্মতিতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে ব্যাংকিং নিয়মনীতি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আকিজ উদ্দিন চৌধুরী ও মিফতাহ উদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজনকে বরখাস্ত করা হয়। তবে ব্যাংকের এমডি, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি), সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্টসহ অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা এখনো তাদের পদে বহাল রয়েছেন।এতে ব্যাংকটির পুনর্গঠন ও স্বচ্ছতার প্রচেষ্টায় সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংক: এস আলম গ্রুপের ঋণ বিতরণে এমডির ভূমিকা বহাল
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক থেকে ৪৫টি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এস আলম গ্রুপ ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো গত সাত বছরে মোট ৮৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ব্যাংকটির বিতরণ করা ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের ৮২ শতাংশই চট্টগ্রামভিত্তিক এই গ্রুপের হাতে গেছে।
এসব ঋণ বিতরণে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা। ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তার নেতৃত্বে এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়।
এর মধ্যে এস আলম গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ২৬ হাজার কোটি টাকা এবং দেশবন্ধু গ্রুপ, ইউনিটেক্স গ্রুপ, অ্যানানটেক্স গ্রুপসহ মোট ২৯টি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে বাকি অর্থ ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ২০২২ সালের ১ থেকে ১৭ নভেম্বরের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক নাবিল গ্রুপকে ২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা ঋণ দেয়। সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধান কার্যালয়ের বিশেষত এমডি মুনিরুল মওলার সরাসরি নির্দেশে এই অর্থ ছাড় করা হয়।
এসব তথ্য দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতার অভাব এবং ঋণ বিতরণে দুর্নীতির প্রকট চিত্র তুলে ধরছে। ইসলামী ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের এমন পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
ইসলামী ব্যাংকে ঋণ কেলেঙ্কারি: ছায়া কোম্পানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাট
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ইসলামী ব্যাংকে ঋণ বিতরণে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাংকের চট্টগ্রামের চাক্তাই শাখায় ঢেউটিন বিক্রির প্রতিষ্ঠান মুরাদ এন্টারপ্রাইজকে অ্যাকাউন্ট খোলার মাত্র এক মাসের মধ্যে ৮৯০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এক বছর পর প্রতিষ্ঠানটিকে আরও ১১০ কোটি টাকা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নথি বলছে, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ আসলে এস আলম গ্রুপের একটি ছায়া কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির কাছে খুব কম পরিমাণ জামানত নেওয়া হয়েছে, যা ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিয়ম লঙ্ঘন।
নথি অনুসারে, চাক্তাই শাখা থেকে ১০টি কোম্পানির মাধ্যমে ৩৫ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, এস আলম গ্রুপ ও তাদের ছায়া কোম্পানিগুলো—নাবিল ফুডস, নাবিল অটো রাইস মিলস, এম এস এ জে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, এবং আনোয়ারা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল—ইসলামী ব্যাংকের রাজশাহী শাখা থেকে ২৯ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছে।
এছাড়া, ইসলামী ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটসহ অন্যান্য শাখা থেকে নিয়ম লঙ্ঘন করে আরও ২৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা নিয়েছে এস আলম গ্রুপ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণ বিতরণের আগে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করায় এই বিশাল অঙ্কের অর্থ জনগণের আমানত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ইসলামী ব্যাংকের এমডি’র দাবি: ঋণ বিতরণে অনিয়ম হয়নি
ইসলামী ব্যাংকের ঋণ বিতরণে অনিয়মের বিষয়ে গণমাধ্যমে নানা তথ্য প্রকাশিত হলেও, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুনিরুল মওলা সব সময় এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বারবার দাবি করেছেন যে ব্যাংকের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রয়েছে।
মুনিরুল মওলার বক্তব্য ছিল, ‘ঋণ বা বিনিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ পোর্টফোলিও ধারণ করা হয়। সুতরাং, এ ধরনের একটি ব্যাংক, যারা ৪০ বছর ধরে কার্যক্রম চালাচ্ছে, তাদের এ ধরনের অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই। সিস্টেম আছে, এ সিস্টেমের ভিতরে আমাদের সবকিছু হয়। এখানে বেনামি ঋণ বলে কিছু নেই, নামেই আছে।’
তাঁর এ বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। কারণ, ব্যাংকের নথি এবং বিভিন্ন তদন্তে উঠে আসা তথ্য বলছে, নিয়ম লঙ্ঘন করে বিশাল অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, বিশেষত এস আলম গ্রুপ ও তাদের ছায়া কোম্পানিগুলোর কাছে।
অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এমন বক্তব্যের মাধ্যমে এমডি মুনিরুল মওলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার অনিয়ম আড়াল করার চেষ্টা করেছেন বলে মনে করেন অনেকেই। তবে, এসব অভিযোগ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এখন বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ইসলামী ব্যাংকে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণ: বহাল তবিয়তে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা
ইসলামী ব্যাংক থেকে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা একসময় বলেছিলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া হয়েছে, তা খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা নেই। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়েও যায়, তাদের অর্থ জামানত থেকে উঠে আসবে।’
তবে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির প্রকৃত পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে। নিয়মবহির্ভূত ঋণ বিতরণের ফলে ইসলামী ব্যাংক এখন তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআরআর (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও) এবং এসএলআর (স্ট্যাটুটরি লিকুইডিটি রেশিও) পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে ব্যাংকটি। চলতি হিসাবেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা এতদিন গোপন রাখা হয়েছিল।
অভিযুক্ত কর্মকর্তারা এখনো বহাল
এমডি মুনিরুল মওলার পাশাপাশি ঋণ বিতরণে জড়িত অনেক কর্মকর্তা এখনও তাদের দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক: আলতাফ হুসাইন
- সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট: জি এম মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন কাদের, আহমেদ জুবায়েরুল হক (আইটিপ্রধান), অডিটপ্রধান মো. রাজা মিয়া
- অফিস প্রধান: খালেদ মাহমুদ রায়হান, এ এম শহিদুল এমরান, এহসানুল হক
- শাখাপ্রধান: চট্টগ্রামের মিয়া মো. বরকত উল্লাহ, রাজশাহী নিউমার্কেটের মুন্সি রেজাউর রশিদ, গুলশান করপোরেট শাখার এ টি এম শহিদুল হক, পাবনার মো. শাহজাহান, চাক্তাইয়ের মনজুর হাসান।
চেয়ারম্যানের বক্তব্য
এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ জানিয়েছেন, ‘ব্যাংকের টাকা ভিন্ন খাতে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তবে দুষ্ট কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
মন্তব্যের অনুপস্থিতি
ব্যাংকের এমডি মুহাম্মদ মুনিরুল মওলার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সমালোচনা ও ভবিষ্যৎ করণীয়
অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বহাল থাকা এবং ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক সংকট নিয়ে ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী পদক্ষেপ এ সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সুত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন











