সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মামলা বাণিজ্য: কী ঘটছে?

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:১৬:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৪
  • / ২৬৬ Time View

BRAHMANBARIA 2

মামলা হচ্ছে—কখনো আড়াইশ’, কখনো সাড়ে তিনশ’ বা এমনকি ৫-৭’শ জনের নামেও। মুখে মুখে ছড়াচ্ছে এই খবর। পাশাপাশি, ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা অন্য কোনো অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে মামলার ড্রাফট কপি। এর পরেই আসে টাকার প্রস্তাব—মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিনিময়ে। রফাদফা হলেই মুক্তি। প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়ে বিত্তশালীদের নাম দিয়ে সাজানো হচ্ছে মামলার খসড়া আসামি তালিকা, যা বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এই মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে প্রচুর লেখালেখি। পুলিশ জানিয়েছে, যারা এই মামলা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত, তাদের ধরতে কাজ চলছে। এ বিষয়ে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ৫ই আগস্টের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন থানায় রাজনৈতিক কারণে মোট ২৯টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় ১৯২৯ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে এবং প্রতিটি মামলায় এক থেকে দেড়শো জন অজ্ঞাতনামা আসামিও রয়েছে। এ ছাড়া, আদালতেও বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের হয়েছে। থানায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে সদর মডেল থানায়—১৩টি। অন্য থানাগুলোর মধ্যে আখাউড়ায় ৫টি, আশুগঞ্জে ৪টি, নবীনগরে ২টি, এবং সরাইল, নাসিরনগর, বাঞ্ছারামপুর, কসবা ও বিজয়নগর থানায় ১টি করে মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলার অধিকাংশই হত্যার অভিযোগে করা হয়েছে।

শহরের দক্ষিণ মোড়াইলের ওষুধ ব্যবসায়ী মো. মোবারক হোসেনকে বাদী বানিয়ে তৈরি করা একটি মামলার এজাহারের খসড়া কপি গত মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে গত ৩১শে অক্টোবর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন মোবারক, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, তাকে বাদী দেখিয়ে মামলার ভুয়া এজাহার তৈরি করে হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকে ছড়ানো হয়েছে। মোবারক হোসেন জানান, মামলার কপি ভাইরাল হওয়ার পর তার ছোট ভাই মোকাররম হোসেন রবিন তাকে ফোন করে মামলার সত্যতা জানতে চান। তিনি তাকে জানান, তিনি কিছুই জানেন না এবং নিরাপত্তার জন্য আইনি ব্যবস্থা নেন। মোবারক বলেন, “এটি কেন করা হয়েছে তা আমি বুঝতে পারছি না, তবে শত্রুতামূলকভাবে কেউ এটি করতে পারে।”

গত ২৮শে অক্টোবর সদর মডেল থানায় সাড়ে ৩’শ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। এর আগে থেকেই অনলাইনে মামলার কপি ছড়িয়ে পড়েছিল। নাম প্রকাশ না করা এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি ওই মামলার ৫টি আসামি তালিকা পেয়েছেন, যেখানে কিছু নাম একবার আছে, আবার অন্য তালিকায় নেই। আসামিদের নামও একে অপরের আগে-পিছে করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দল যুক্তরাজ্য শাখার সদস্য সচিব এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জাতীয়তাবাদী ফোরাম ইউকে’র আহ্বায়ক শাহ মোহাম্মদ ইব্রাহিম মিয়া বলেন, “এই মামলার এজাহারের কপি আমি ৩ দিন আগে অনলাইনে পাই, যেখানে ৩০০ জনের নাম ছিল। আমার ছোট ভাই শাহ মোহাম্মদ ইয়াছিন হোয়াটসঅ্যাপে আমাকে মামলার কপিটা পাঠায়। পরে দেখলাম, থানায় রেকর্ডকৃত মামলায় আমার দুই ভাই ইয়াছিন ও কাওসারের নাম যথাক্রমে ২৯ ও ৩০ নম্বরে রয়েছে। অথচ আমার পুরো পরিবার বিএনপি’র রাজনীতিতে যুক্ত।”

মামলার কপি পাওয়ার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ইব্রাহিম। তিনি বলেন, “এই শহরে কে আওয়ামী লীগ আর কে বিএনপি—এটা খুব সহজে চিহ্নিত করা যায়। যেসব মামলা হচ্ছে, আমার ধারণা, আসামিদের ২০ শতাংশও ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট নয়।” তিনি আরও জানান, সম্প্রতি আরেকটি মামলা ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেঞ্জারে ছড়িয়ে পড়ছে এবং সেই সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কিত কথাবার্তা চলছে। তিনি বলেন, “শহরের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে দুটি মামলাতে তার নাম বাদ দেওয়ার জন্যে ২৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। আরেকজনের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। এমনকি কেউ কেউ ২-৩ লাখ টাকা দিয়েও মামলাগুলো থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। নাম কাটানোর জন্যে সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।” ইব্রাহিম অভিযোগ করেন, “মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়ে অনেকের কাছে টাকা দাবি করা হচ্ছে। ফলে জেলা শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে পর্যন্ত একটি আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তবে কেউই ভয়ে মুখ খুলছেন না।”

মামলা বাণিজ্য চরমে ওঠার পর গত ২৯শে অক্টোবর সদর মডেল থানা পুলিশ একটি সতর্ক বিজ্ঞপ্তি দেয়। থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কিছু ব্যক্তি কম্পিউটার টাইপের মাধ্যমে ২০০/৩০০ বা তার অধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে মামলার অভিযোগ বা এজাহার লিখে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করছে, যা দিয়ে তারা ভয়ভীতি সৃষ্টি করছে। মামলায় আসামির নাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং মামলায় নাম বাদ দেয়ার জন্যে টাকা-পয়সা আদায়সহ জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।” বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, “এধরণের এজাহার বা অভিযোগ দেখে কেউ আতঙ্কিত বা ভয় পেয়ে টাকা-পয়সা লেনদেন না করার জন্যে সতর্ক করা হচ্ছে এবং যদি এমন এজাহার বা অভিযোগ দেখা যায়, তাহলে আতঙ্কিত না হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় যোগাযোগ করার জন্যে অনুরোধ করা হচ্ছে।”

মামলা বাণিজ্য নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও। জেলা হেফাজত ইসলাম নেতা মুফতি জাকারিয়া খান বলেন, “যারা মামলার নামে ফায়দা হাসিল করছে, তাদের যেন আইনের আওতায় আনা হয়।” জেলা জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক মোবারক হোসেন বলেন, “৫ই আগস্টের পর আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছিলাম, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে মামলাকে পুঁজি করে বাণিজ্য করা হচ্ছে, যা দুঃখজনক। একজন ব্যক্তি হত্যা হয়েছে বা কোনো ঘটনার শিকার হয়েছে, কিন্তু এখানে ৩৫০ জন, আড়াইশো বা ৫০০ লোককে আসামি করা যুক্তিসঙ্গত নয়।” জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি কামরুজ্জামান মামুন বলেন, “মামলা ফাইল হওয়ার আগে অনলাইনে দিয়ে বা লিস্ট দেখিয়ে যে বাণিজ্য করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অনৈতিক। আমি এ বিষয়ে খুবই বিব্রত।” তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের হয়রানির শিকার কেউ হোক, আমি চাই না। যারা এটা করছে, তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে আইনের আওতায় আনা হোক।” জেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সম্প্রতি কিছু মামলার কপি ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন আইডিতে পোস্ট করা হচ্ছে। এসব কপি ফেসবুকে দিয়ে কেউ কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করছে, তবে এতে বিএনপি জড়িত নয়। আমি নিজেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পাই, কিছু মানুষ মামলা বাণিজ্যের জন্যে কারও কারও নাম লিস্ট করে পোস্ট করছে। এ নিয়ে অনেক মানুষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আমি ওসি এবং পুলিশ সুপারকে বিষয়টি অবগত করে অনুরোধ করেছি, এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।”

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাবেদুর রহমান বলেন, “বিষয়টি জানার পর আমরা বিভিন্ন জায়গায় রেইড পরিচালনা করেছি। আমি ওসিকে নির্দেশ দিয়েছি, যেহেতু এ ধরনের কাজ কম্পিউটার টাইপের মাধ্যমে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে, তাই কম্পিউটারের দোকানগুলোতেও রেইড করতে বলা হয়েছে। এর জন্যে আমাদের কম্পিউটার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে যেতে বলা হয়েছে, যারা গিয়ে কম্পিউটারে সার্চ করে দেখবে, তাদের সেভ ফাইলে এমন কোনো কিছু আছে কিনা।বাজার কেন্দ্রিক আমরা এখনো কিছু পাইনি। পরবর্তী সন্দেহ আমাদের আদালতের ভিত্তিতে। যখন এজাহার লেখা হয়, অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় সংশ্লিষ্টদের। আমরা সেই জায়গায় হাত দেবো। আমরা এ নিয়ে গোপনে কাজ করছি। যে কোনোভাবে এটাকে বন্ধ করতে হবে। এটা অপরাধমূলক কাজ, যা অবশ্যই শেষ হবে। আমি এই বিষয়টিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেব ইনশাআল্লাহ। যে কেউ এতে জড়িত থাকুক না কেন, তাকে ছাড় দেবো না।”

সুত্রঃ মানবজমিন

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মামলা বাণিজ্য: কী ঘটছে?

Update Time : ১১:১৬:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৪

মামলা হচ্ছে—কখনো আড়াইশ’, কখনো সাড়ে তিনশ’ বা এমনকি ৫-৭’শ জনের নামেও। মুখে মুখে ছড়াচ্ছে এই খবর। পাশাপাশি, ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা অন্য কোনো অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে মামলার ড্রাফট কপি। এর পরেই আসে টাকার প্রস্তাব—মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিনিময়ে। রফাদফা হলেই মুক্তি। প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়ে বিত্তশালীদের নাম দিয়ে সাজানো হচ্ছে মামলার খসড়া আসামি তালিকা, যা বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এই মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে প্রচুর লেখালেখি। পুলিশ জানিয়েছে, যারা এই মামলা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত, তাদের ধরতে কাজ চলছে। এ বিষয়ে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ৫ই আগস্টের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন থানায় রাজনৈতিক কারণে মোট ২৯টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় ১৯২৯ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে এবং প্রতিটি মামলায় এক থেকে দেড়শো জন অজ্ঞাতনামা আসামিও রয়েছে। এ ছাড়া, আদালতেও বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের হয়েছে। থানায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে সদর মডেল থানায়—১৩টি। অন্য থানাগুলোর মধ্যে আখাউড়ায় ৫টি, আশুগঞ্জে ৪টি, নবীনগরে ২টি, এবং সরাইল, নাসিরনগর, বাঞ্ছারামপুর, কসবা ও বিজয়নগর থানায় ১টি করে মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলার অধিকাংশই হত্যার অভিযোগে করা হয়েছে।

শহরের দক্ষিণ মোড়াইলের ওষুধ ব্যবসায়ী মো. মোবারক হোসেনকে বাদী বানিয়ে তৈরি করা একটি মামলার এজাহারের খসড়া কপি গত মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে গত ৩১শে অক্টোবর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন মোবারক, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, তাকে বাদী দেখিয়ে মামলার ভুয়া এজাহার তৈরি করে হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকে ছড়ানো হয়েছে। মোবারক হোসেন জানান, মামলার কপি ভাইরাল হওয়ার পর তার ছোট ভাই মোকাররম হোসেন রবিন তাকে ফোন করে মামলার সত্যতা জানতে চান। তিনি তাকে জানান, তিনি কিছুই জানেন না এবং নিরাপত্তার জন্য আইনি ব্যবস্থা নেন। মোবারক বলেন, “এটি কেন করা হয়েছে তা আমি বুঝতে পারছি না, তবে শত্রুতামূলকভাবে কেউ এটি করতে পারে।”

গত ২৮শে অক্টোবর সদর মডেল থানায় সাড়ে ৩’শ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। এর আগে থেকেই অনলাইনে মামলার কপি ছড়িয়ে পড়েছিল। নাম প্রকাশ না করা এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি ওই মামলার ৫টি আসামি তালিকা পেয়েছেন, যেখানে কিছু নাম একবার আছে, আবার অন্য তালিকায় নেই। আসামিদের নামও একে অপরের আগে-পিছে করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দল যুক্তরাজ্য শাখার সদস্য সচিব এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জাতীয়তাবাদী ফোরাম ইউকে’র আহ্বায়ক শাহ মোহাম্মদ ইব্রাহিম মিয়া বলেন, “এই মামলার এজাহারের কপি আমি ৩ দিন আগে অনলাইনে পাই, যেখানে ৩০০ জনের নাম ছিল। আমার ছোট ভাই শাহ মোহাম্মদ ইয়াছিন হোয়াটসঅ্যাপে আমাকে মামলার কপিটা পাঠায়। পরে দেখলাম, থানায় রেকর্ডকৃত মামলায় আমার দুই ভাই ইয়াছিন ও কাওসারের নাম যথাক্রমে ২৯ ও ৩০ নম্বরে রয়েছে। অথচ আমার পুরো পরিবার বিএনপি’র রাজনীতিতে যুক্ত।”

মামলার কপি পাওয়ার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ইব্রাহিম। তিনি বলেন, “এই শহরে কে আওয়ামী লীগ আর কে বিএনপি—এটা খুব সহজে চিহ্নিত করা যায়। যেসব মামলা হচ্ছে, আমার ধারণা, আসামিদের ২০ শতাংশও ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট নয়।” তিনি আরও জানান, সম্প্রতি আরেকটি মামলা ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেঞ্জারে ছড়িয়ে পড়ছে এবং সেই সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কিত কথাবার্তা চলছে। তিনি বলেন, “শহরের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে দুটি মামলাতে তার নাম বাদ দেওয়ার জন্যে ২৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। আরেকজনের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। এমনকি কেউ কেউ ২-৩ লাখ টাকা দিয়েও মামলাগুলো থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। নাম কাটানোর জন্যে সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।” ইব্রাহিম অভিযোগ করেন, “মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়ে অনেকের কাছে টাকা দাবি করা হচ্ছে। ফলে জেলা শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে পর্যন্ত একটি আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তবে কেউই ভয়ে মুখ খুলছেন না।”

মামলা বাণিজ্য চরমে ওঠার পর গত ২৯শে অক্টোবর সদর মডেল থানা পুলিশ একটি সতর্ক বিজ্ঞপ্তি দেয়। থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কিছু ব্যক্তি কম্পিউটার টাইপের মাধ্যমে ২০০/৩০০ বা তার অধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে মামলার অভিযোগ বা এজাহার লিখে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করছে, যা দিয়ে তারা ভয়ভীতি সৃষ্টি করছে। মামলায় আসামির নাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং মামলায় নাম বাদ দেয়ার জন্যে টাকা-পয়সা আদায়সহ জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।” বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, “এধরণের এজাহার বা অভিযোগ দেখে কেউ আতঙ্কিত বা ভয় পেয়ে টাকা-পয়সা লেনদেন না করার জন্যে সতর্ক করা হচ্ছে এবং যদি এমন এজাহার বা অভিযোগ দেখা যায়, তাহলে আতঙ্কিত না হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় যোগাযোগ করার জন্যে অনুরোধ করা হচ্ছে।”

মামলা বাণিজ্য নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও। জেলা হেফাজত ইসলাম নেতা মুফতি জাকারিয়া খান বলেন, “যারা মামলার নামে ফায়দা হাসিল করছে, তাদের যেন আইনের আওতায় আনা হয়।” জেলা জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক মোবারক হোসেন বলেন, “৫ই আগস্টের পর আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছিলাম, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে মামলাকে পুঁজি করে বাণিজ্য করা হচ্ছে, যা দুঃখজনক। একজন ব্যক্তি হত্যা হয়েছে বা কোনো ঘটনার শিকার হয়েছে, কিন্তু এখানে ৩৫০ জন, আড়াইশো বা ৫০০ লোককে আসামি করা যুক্তিসঙ্গত নয়।” জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি কামরুজ্জামান মামুন বলেন, “মামলা ফাইল হওয়ার আগে অনলাইনে দিয়ে বা লিস্ট দেখিয়ে যে বাণিজ্য করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অনৈতিক। আমি এ বিষয়ে খুবই বিব্রত।” তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের হয়রানির শিকার কেউ হোক, আমি চাই না। যারা এটা করছে, তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে আইনের আওতায় আনা হোক।” জেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সম্প্রতি কিছু মামলার কপি ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন আইডিতে পোস্ট করা হচ্ছে। এসব কপি ফেসবুকে দিয়ে কেউ কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করছে, তবে এতে বিএনপি জড়িত নয়। আমি নিজেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পাই, কিছু মানুষ মামলা বাণিজ্যের জন্যে কারও কারও নাম লিস্ট করে পোস্ট করছে। এ নিয়ে অনেক মানুষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আমি ওসি এবং পুলিশ সুপারকে বিষয়টি অবগত করে অনুরোধ করেছি, এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।”

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাবেদুর রহমান বলেন, “বিষয়টি জানার পর আমরা বিভিন্ন জায়গায় রেইড পরিচালনা করেছি। আমি ওসিকে নির্দেশ দিয়েছি, যেহেতু এ ধরনের কাজ কম্পিউটার টাইপের মাধ্যমে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে, তাই কম্পিউটারের দোকানগুলোতেও রেইড করতে বলা হয়েছে। এর জন্যে আমাদের কম্পিউটার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে যেতে বলা হয়েছে, যারা গিয়ে কম্পিউটারে সার্চ করে দেখবে, তাদের সেভ ফাইলে এমন কোনো কিছু আছে কিনা।বাজার কেন্দ্রিক আমরা এখনো কিছু পাইনি। পরবর্তী সন্দেহ আমাদের আদালতের ভিত্তিতে। যখন এজাহার লেখা হয়, অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় সংশ্লিষ্টদের। আমরা সেই জায়গায় হাত দেবো। আমরা এ নিয়ে গোপনে কাজ করছি। যে কোনোভাবে এটাকে বন্ধ করতে হবে। এটা অপরাধমূলক কাজ, যা অবশ্যই শেষ হবে। আমি এই বিষয়টিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেব ইনশাআল্লাহ। যে কেউ এতে জড়িত থাকুক না কেন, তাকে ছাড় দেবো না।”

সুত্রঃ মানবজমিন