ঠেকানো যাচ্ছে না মাদক স্রোত: ভয়াবহ পরিসংখ্যান ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
- Update Time : ১০:৩৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ নভেম্বর ২০২৪
- / ২৭৩ Time View

দেশের মাদক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। ২ জেলার ৯৬ থানায় মাদকের ৩৮৬টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে, কিন্তু মোট মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ছে। দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ১ কোটিরও বেশি, এবং বছরে মাদকের পেছনে ব্যয় হয় প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া পাচারের মাধ্যমে দেশ থেকে হারিয়ে যায় ৪৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মাদক নেটওয়ার্কে জড়িত প্রায় ২ লাখ মানুষ, যা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
দেশে মাদকের প্রবাহ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জল, স্থল এবং আকাশপথে নিয়মিত মাদক প্রবেশ করছে, যার বেশিরভাগই ভারত ও মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশ ঘটছে। দেশে এ পর্যন্ত ২৫ ধরনের মাদক শনাক্ত করা হয়েছে, যা এখন এক ভয়াবহ আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) এর সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন ৩২টি জেলাকে মাদক প্রবেশপথ হিসেবে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে ছয়টি বিভাগের ৩২ জেলার ৯৬ থানায় ৩৮৬টি মাদক স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। ডিএনসি জানিয়েছে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের দুটি প্রধান রুট ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ এবং ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’-এর কেন্দ্রে অবস্থিত। জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ইউএনওডিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রবেশ করা মাদকের মাত্র ১০ শতাংশই ধরা পড়ে, যা এই সমস্যা মোকাবিলায় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারিভাবে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান না থাকলেও বেসরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে ১ কোটিরও বেশি মাদকাসক্ত রয়েছে। বছরে মাদকের পেছনে ব্যয় হয় আনুমানিক ৬০ হাজার কোটি টাকা, আর এ ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষক, ব্যবসায়ী, বাহক ও বিক্রির নেটওয়ার্কে যুক্ত প্রায় ২ লাখ ব্যক্তি, যার সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। মাদকের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৫ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা পাচার হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা জানান, কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি, বেকারত্ব, প্রেমে ব্যর্থতা, বন্ধুদের প্ররোচনা, অসৎ সঙ্গ, হতাশা এবং আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাবে মাদকাসক্তের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকাসক্তরা পরিবার ও সমাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িয়ে যাচ্ছে, যা সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাসনাবাদ, টাকি, বসিরহাট, স্বরূপনগর, বাদুড়িয়া, উত্তর চব্বিশ পরগনা, বনগাঁ, পেট্রাপোল, হেলেঞ্চা, ভবানীপুর, রানাঘাট, অমৃতবাজার, বিরামপুর, করিমপুর, নদীয়া, মালদহ, বালুরঘাট, আওরঙ্গবাদ, নিমতিতাসহ সীমান্তসংলগ্ন প্রায় সব এলাকা দিয়ে সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুরে ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে মাদক প্রবেশ করছে। ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের সীমান্ত সংলগ্ন চারটি পয়েন্ট দিয়ে মাদক কুড়িগ্রাম, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনায় প্রবেশ করছে। পূর্ব সীমান্ত দিয়ে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরামের চারটি পয়েন্ট দিয়ে সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনীতে মাদক প্রবেশ করছে, এবং ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর হয়ে নওগাঁর ১৭টি স্পট দিয়ে মাদক আসছে। বাংলাদেশের পশ্চিম-উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরে আসাম, উত্তর-পূর্বে মেঘালয় এবং পূর্বে ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্ত রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমানা সংযুক্ত। বাংলাদেশের ৩২টি জেলার সীমান্ত লাইন দিয়ে মাদক প্রবেশ করছে, যার মধ্যে ৩৮৬টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের ৮৮ শতাংশ মাদক ভারত থেকে, ৮ শতাংশ মিয়ানমার থেকে এবং বাকি ৪ শতাংশ অন্যান্য দেশ থেকে আসে। ঢাকায় আসে প্রবেশকৃত মাদকের ১৭ শতাংশ, বাকিটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তের সক্রিয় মাদক রুটগুলো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে কোটি কোটি পিস ইয়াবা। বেশির ভাগ ইয়াবা মিয়ানমার-চীন সীমান্তের শান ও কাচিন প্রদেশে তৈরি হয়। মিয়ানমারের সাবাইগন, তুমব্রু, মংডুসহ ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে টেকনাফের সেন্টমার্টিন, শাহপরীর দ্বীপ, ধুমধুমিয়া, কক্সবাজার হাইওয়ে, উখিয়া, কাটাপাহাড়, বালুখালী, এবং বান্দরবানের ঘুমধুম, নাইক্ষ্যংছড়ি, দমদমিয়া ও জেলেপাড়ার মতো স্থানে অর্ধশত স্পট দিয়ে ইয়াবা দেশে প্রবেশ করছে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুনীম ফেরদৌস জানিয়েছেন, মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। ডিএনসির পরিচালক (অপারেশনস ও গোয়েন্দা) তানভীর মমতাজের মতে, মাদক কারবারিদের কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচার কার্যক্রম চালু রয়েছে। মাদক প্রবেশের স্পটগুলোতে দক্ষ জনবলও মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, মাদক একটি সামাজিক সমস্যা, এবং পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। তিনি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, মাদকের বাহক বা আসক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হলেও পৃষ্ঠপোষক ও মূল হোতাদেরও আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুত্রঃবাংলাদেশ প্রতিদিন











