রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অর্থ পাচার
- Update Time : ০৩:১৬:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ নভেম্বর ২০২৪
- / ২৫৮ Time View

ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন যে প্রতি বছর ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে যে, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনস্থ আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) দুর্নীতি এবং বিদেশে অর্থ পাচার প্রতিরোধের বদলে কার্যত এসব কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখছে।
অর্থ পাচারের প্রকৃত চিত্র: ফ্যাসিন্ট হাসিনা শাসনামলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার
বাংলাদেশ থেকে ঠিক কত পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, তা নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় যে, ফ্যাসিন্ট হাসিনা শাসনামলে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের সীমানা পেরিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের মতে, শুধু আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করেই প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞদের অনুমান, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে গড়ে ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হচ্ছে। তাদের মতে, আওয়ামী লীগ আমলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে এই অর্থ পাচার সংগঠিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এর অধীনস্থ আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। ব্যাংকিং খাতের সংকটের জন্য প্রধানত বাংলাদেশ ব্যাংককেই দায়ী করা হচ্ছে, যা বর্তমানে গুরুতর অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলছে।
পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উপায়: ব্যাংকিং খাতের সংস্কার অপরিহার্য
রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যালয়ে গতকাল শনিবার “পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উপায়” শীর্ষক সেমিনারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং খাতের মৌলিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠানকে ঢেলে সাজানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ড. ইফতেখারুজ্জামান ব্যাংকিং সেক্টরের দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেন।
এই সেমিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) এবং সম্ভাবনার বাংলাদেশ। গ্রিনওয়াচ ঢাকার সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ইআরএফ সভাপতি রেফায়েত উল্লাহ মীরধা স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন, যেখানে দেশের অর্থনীতির সুরক্ষায় পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
টেকসই সংস্কারের আহ্বান: দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামা
দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু শক্তিশালী করা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখলের মাধ্যমে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার সংগঠিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রক্রিয়ায় রাজনীতি, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসার একটি ত্রিমুখী আঁতাত মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। বিগত ১৫-১৬ বছরে এসব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের চর্চা চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে, যেখানে রাজনৈতিক শক্তি আমলাতন্ত্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে এবং বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করে তা কার্যকর করেছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে যে সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে তা যেন টেকসই হয় এবং দীর্ঘস্থায়ীভাবে সুশাসনের পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা: সিঙ্গাপুর উদাহরণ এবং চ্যালেঞ্
বাংলাদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। ২০০৭ সালে সিঙ্গাপুর থেকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তার মাধ্যমে ২০১৩ সালে ৯৩০ কোটি ডলার পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছিল।
ড. ইফতেখারুজ্জামান মন্তব্য করেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হলেও এটি অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তিনি বলেন, যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে, সেসব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক চুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে অর্থ ফেরত আনার পথ সুগম হতে পারে, তবে এতে দেশগুলোর সহযোগিতা মনোভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, অর্থ পাচার বন্ধে সাপ্লাই (পাচারকারী দেশ) এবং ডিমান্ড (পাচার গন্তব্য দেশ) উভয়ের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিভিন্ন দেশে পাচারকারীদের সহায়তা করে থাকেন, যেমন একটি সাবেক মন্ত্রীর ক্ষেত্রে কয়েকটি দেশে শত শত অ্যাপার্টমেন্টের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এটি বরফখণ্ডের চূড়ামাত্র, এবং এ ধরনের অর্থ পাচারে জড়িত আরো অনেকেই রয়েছেন, যা অর্থ পাচার বন্ধে বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।
অর্থ পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ ও জনসম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তা
ড. ইফতেখারুজ্জামান অর্থ পাচার রোধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি, এনবিআর, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস, বিএফআইইউসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট পথনকশার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবলমাত্র নীতিগত আলোচনায় কাজ হবে না; বরং এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংস্কার আনা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, অর্থ পাচার রোধে আইনি কাঠামোর দৃঢ়তা প্রয়োজন, যার জন্য নতুন কিছু আইনের প্রবর্তন অপরিহার্য।
দুর্নীতি প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের গুরুত্বও তুলে ধরেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সংস্থাগুলোর সঠিক দিকনির্দেশনা ছাড়া অর্থ পাচার রোধ করা সম্ভব নয়।
অর্থপাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ ও মানসিকতার পরিবর্তনের আহ্বান
ওয়েস্ট সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী ঢাকায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে অর্থপাচার রোধে জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, পাচার হওয়া টাকা পুরোপুরি না ফিরলেও আংশিক ফেরত আনা সম্ভব হলে তা ভবিষ্যতে অপরাধীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হবে। তার মতে, অবৈধ প্রক্রিয়ায় এবং চালান জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, যা আনুমানিক ১০০ বিলিয়ন ডলার।
ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী আইএমএফের ঋণ প্রদান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, উল্লেখ করেন যে পূর্ববর্তী সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে সংশয় থাকা সত্ত্বেও এই ঋণ দেওয়া হয়, যা দেশের উন্নয়নে ব্যবহৃত না হয়ে অপব্যবহার হয়েছে। তিনি জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, এসব ঋণের অপব্যবহারে জনগণের উপর অত্যাচার চালানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ নাঈম চৌধুরীও অর্থপাচার রোধে মানসিকতার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের মতো দেশের বড় প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিচালনা ব্যাহত হলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ কঠিন হবে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য মানসিকতা এবং প্রশাসনিক অঙ্গীকার উভয়েরই সংস্কার জরুরি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর জসিম উদ্দিন আহমেদ সেমিনারে উল্লেখ করেন যে, প্রভাবশালীরা পাচার করা অর্থ যদি সহজে নিজেদের আয়ত্তে রেখে দেয়, তবে তা ভবিষ্যতে আরও অর্থ পাচারের জন্য উৎসাহ যোগাবে। এজন্য তিনি পাচারকারীদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার ওপর জোর দেন।
বক্তারা আরও বলেন, দেশের ব্যাংক খাত আজ সংকটের মুখে, এবং এর জন্য প্রধানত বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা দায়ী। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এসব প্রতিষ্ঠানের মৌলিক সংস্কার এবং কার্যকর পুনর্গঠন অত্যন্ত জরুরি।











