শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পেল জাপানি সংস্থা নিহন হিদানকিও
- Update Time : ০৮:৪৬:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ অক্টোবর ২০২৪
- / ২২২ Time View

২০২৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছে জাপানের সংস্থা নিহন হিদানকিও। এই সংস্থাটি পারমাণবিক বোমার ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে গঠিত, যারা বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমা হামলায় যারা বেঁচে ছিলেন, তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে নিহন হিদানকিও। এই বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের জাপানে “হিবাকুশা” বলে পরিচিত করা হয়। তাদের সংগ্রাম ও সাক্ষ্য পুরো বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্রের বিপজ্জনক ভবিষ্যৎ।
শান্তির জন্য নিরলস সংগ্রাম
নরওয়ের নোবেল কমিটি জানিয়েছে, নিহন হিদানকিওকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র মুক্ত পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতার কথা বিশ্বকে জানাতে। কমিটির ভাষ্যমতে, “হিবাকুশারা আমাদের সেই অবর্ণনীয় কষ্টের কথা জানান, যা পরমাণু অস্ত্রের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। তাদের সাক্ষ্য আমাদের বোঝায় এই অস্ত্রগুলো আর কখনও ব্যবহার করা উচিত নয়।”
হিরোশিমার পারমাণবিক হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া নিহন হিদানকিও’র কো-চেয়ার তোশিউকি মিমাকি পুরস্কার পাওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “এটা যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে।” মিমাকি, যিনি নিজেও একজন বেঁচে থাকা ব্যক্তি, এই পুরস্কারকে সংগঠনের কাজের বড় ধরনের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন এবং বলেছেন, “এই অর্জন পারমাণবিক অস্ত্র নির্মূলের পক্ষে আমাদের প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে।”
পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী বার্তা
নোবেল কমিটির সভাপতি জর্গেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, “পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি এখন বিশ্বব্যাপী চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে। আমরা পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী নিষেধাজ্ঞা স্থাপনের গুরুত্ব তুলে ধরতে চেয়েছি।”
বিশ্বের পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ ও উন্নয়ন নিয়ে চলমান উদ্বেগের মধ্যে এই পুরস্কারটি প্রদান করা হলো। কমিটির সভাপতি বলেন, “এই অস্ত্রগুলো যদি আর কখনও পৃথিবীতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা মানবতা এবং সভ্যতার শেষ হতে পারে।”
বিশেষ করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের সময় বারবার পারমাণবিক হুমকি দিয়েছেন। এছাড়া উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন পরমাণু অস্ত্র মজুদ আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে তা ব্যবহার করারও হুমকি দিয়েছেন। এই পরিস্থিতির মধ্যেই নিহন হিদানকিও’র শান্তি পুরস্কার বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে নতুন করে সচেতনতা বাড়াবে।
পারমাণবিক অস্ত্র নির্মূলের স্বপ্ন
নিহন হিদানকিও’র অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্রের সম্পূর্ণ নির্মূল। এই পুরস্কার তাদের প্রচারাভিযানে নতুন গতি যোগ করবে। তোশিউকি মিমাকি বলেন, “পারমাণবিক অস্ত্রগুলো অবশ্যই নিষিদ্ধ হতে হবে, এবং আমাদের আশা যে এই পুরস্কার সেই লক্ষ্যে আমাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে।”
হিবাকুশাদের সংগ্রাম
পারমাণবিক হামলায় বেঁচে যাওয়া হিবাকুশারা তাদের জীবনের অনেক সময় ধরে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছেন। তাদের অনেকেই তেজস্ক্রিয়তার কারণে নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগেছেন, যেমন লিউকেমিয়া ও অন্যান্য মারাত্মক রোগ। এছাড়া তারা সামাজিকভাবে নিগৃহীত হয়েছেন, বিবাহ এবং কর্মসংস্থানে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত জাপানে ১০৬,৮২৫ জন পারমাণবিক বোমা হামলার বেঁচে থাকা ব্যক্তি নিবন্ধিত আছেন, যাদের গড় বয়স ৮৫.৬ বছর।
শান্তির পথে আরেকটি মাইলফলক
এই পুরস্কারটি জাপানের দ্বিতীয় নোবেল শান্তি পুরস্কার। এর আগে ১৯৭৪ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী এইসাকু সাতো নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তিনি শান্তির প্রচেষ্টায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনার জন্য এবং পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করার জন্য এই পুরস্কারে ভূষিত হন।
বিশ্বের প্রতি একটি সতর্কবার্তা
এই পুরস্কারটি বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার আহ্বান হিসেবে দেখা হচ্ছে। ড্যান স্মিথ, স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান, বলেছেন, “এই পুরস্কারটি তিনটি বিষয়কে তুলে ধরছে: পারমাণবিক বোমা হামলার মানবিক বিপর্যয়, পারমাণবিক অস্ত্রের বিপদ এবং আমরা প্রায় ৮০ বছর ধরে এই অস্ত্রের ব্যবহার ছাড়া টিকে আছি।”
নরওয়ের নোবেল কমিটি বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ২০১৭ সালে আইসিএএন (ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপনস) একই কারণে নোবেল শান্তি পুরস্কার পায়। এবারও নিহন হিদানকিও’র পুরস্কার সেই বার্তাকেই নতুন করে তুলে ধরছে—পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে বিশ্বকে সচেতন করতে হবে।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক প্রদান আগামী ১০ ডিসেম্বর অসলোতে অনুষ্ঠিত হবে, যা আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী হিসেবে উদযাপিত হয়।
সূত্রঃ Reuters





