সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চটপটির দোকানে ব্যাংকের ঋণ ২৩৪ কোটি টাকা, এস আলম জড়িত

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৪৪:০২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৪
  • / ২৪৪ Time View

S ALAM

চট্টগ্রামে অবস্থিত নওরোজ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তাদের একটি চটপটির দোকান ও দুটি রেস্তোরাঁ দেখিয়ে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৩টি শাখা থেকে ২৩৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক নাজমি নওরোজ।

এই ঋণ নেওয়ার অন্যতম প্রতিষ্ঠান ‘ইট অ্যান্ড ট্রিট’ নামে চটপটির দোকানটি চট্টগ্রামের আসকার দিঘির পাড়ে অবস্থিত। তার পাশেই রয়েছে ‘ফিউশন ইটস’ নামের একটি রেস্তোরাঁ এবং আরেকটি রেস্তোরাঁ ‘লা এরিস্টোক্রেসি’ বেশ কয়েকবার স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমানে আগ্রাবাদ এলাকায় চালু রয়েছে।

তবে এত বড় পরিমাণ ঋণ নেওয়া সম্ভব হয়েছে ব্যাংক মালিকপক্ষের বিশেষ আগ্রহের কারণে। জানা গেছে, ঋণ শোধ না করেও বিলাসবহুল জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছেন নওরোজ, এবং ব্যাংকের কর্মকর্তাদের খুশি রাখতে নিয়মিতভাবে ‘উপহার’ দিয়েছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঋণ খেলাপি না দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঋণগুলো অশ্রেণিবদ্ধ (আনক্লাসিফায়েড) করে রেখেছে, যা ঋণ পরিশোধের চাপ থেকে তাকে রেহাই দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লা এরিস্টোক্রেসি রেস্তোরাঁটির নামে ২ কোটি টাকার ঋণসীমা থাকলেও নাজমি নওরোজ উত্তোলন করেছেন ৭০ কোটি টাকা, যা সুদ-আসলে ১১৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই টাকা তিনি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আসকার দিঘির পাড়ের মহিলা শাখা থেকে গ্রহণ করেছেন। একই প্রতিষ্ঠানের নামে নগরীর প্রবর্তক মোড়ের ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক শাখা থেকে তিনি ৫৪ কোটি টাকা ঋণ নেন, যা সুদে-আসলে ৯০ কোটি ৪৫ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। এর বাইরে, ব্যাংকটির চকবাজার শাখা থেকে ২৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, তবে নাজমি নওরোজ দাবি করেছেন যে চকবাজার শাখার পুরো টাকা এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যাংকটির মালিক সাইফুল আলম মাসুদ নিয়ে নিয়েছেন।

২০১১ সাল থেকে আসকার দিঘির পাড়ের মহিলা শাখার মাধ্যমে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে নাজমি নওরোজের লেনদেন শুরু হয়। বর্তমানে এই ঋণের পরিমাণ সুদসহ ১১৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ব্যাংকের চাপাচাপিতে ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন, কিন্তু ঋণের টাকা এখনও অশ্রেণিবদ্ধ (আনক্লাসিফায়েড) তালিকায় রয়েছে।

ব্যাংক সূত্র জানায়, মালিকপক্ষ চায়নি বলে নাজমি নওরোজকে ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি, ফলে ঋণটি অশ্রেণিবদ্ধ রাখা হয়েছে। তবে গত আগস্ট মাসে অবশেষে তাকে ঋণ খেলাপি হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং পাওনা আদায়ের জন্য মামলা করা হয়।

ব্যাংক সূত্র জানায়, নাজমি নওরোজ ব্যাংক থেকে যে টাকা উত্তোলন করেন, সেটি বছর শেষে পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে কোনো কথা বলেনি। তবে ব্যাংকের টাকা ফেরত না পাওয়ার কারণে শাস্তি হিসেবে একাধিক কর্মকর্তার পদোন্নতি আটকে দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, নাজমি নওরোজ ব্যাংকের কিস্তি জমা দেন না, তবে মাঝে মধ্যে উপহার নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাছে আসেন। কর্মকর্তারা এসব উপহার গ্রহণ করতে না চাইলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের ধমকাতেন।

নাজমি নওরোজ দাবি করেন, “আমি যে পরিমাণ সম্পদ ব্যাংকে জামানত দিয়েছি, তাতে ৪০ কোটি টাকাও পাওয়ার কথা নয়। যা কিছু হয়েছে, সবই মাসুদ সাহেবের ইচ্ছায় হয়েছে। আমি যে আকিজ উদ্দিনকে টাকা দিয়েছি, তার প্রমাণ আমার কাছে আছে। ব্যাংকের নতুন পর্ষদ গত রোববার আমার সঙ্গে বসেছিল, এবং আমি তাদের এসব জানিয়েছি।

ব্যাংকের এত টাকার দায় দেনা কে পরিশোধ করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমি নওরোজ বলেন, “কেন? মাসুদ সাহেব শোধ করবেন?” তিনি উল্টো প্রশ্ন করেন, “জামানত ছাড়া আমি এত বিপুল পরিমাণ টাকা কীভাবে তুলতে পারলাম? পারলাম ওই ব্যাংকের মালিক মাসুদ সাহেবের ইচ্ছায়।”

ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ও তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আকিজ উদ্দিনের বিশেষ আগ্রহের কারণে নাজমি নওরোজ সামান্য চটপটির দোকান ও রেস্তোরাঁর নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে উত্তোলনের সুযোগ পেয়েছেন।

নাজমি নওরোজের কাছে চটপটির দোকান ও রেস্তোরাঁর বার্ষিক আয়, ব্যক্তিগত গাড়ির দাম এবং বিদেশে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান।

তিনি ২০১২ সালে ৮১, শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ রোডে লা এরিস্টোক্রেসি নামে একটি রেস্তোরাঁর ব্যবসা শুরু করেন, যেখানে প্রায় ১০০ জনের বসার ব্যবস্থা ছিল। ২০২০ সালে, হঠাৎ লা এরিস্টোক্রেসি নামের রেস্তোরাঁটি সেখান থেকে সরিয়ে প্রথমে শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ রোডের কর্ণফুলী টাওয়ার (এস আলম টাওয়ার) এবং পরে নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার ১০৫ হোসাইন চেম্বারের নিচতলায় স্থানান্তর করা হয়। লা এরিস্টোক্রেসির নতুন নাম দেওয়া হয় ফিউশন ইট।

তিনি দামপাড়া পুলিশ লাইনের কাছে কেক বিক্রির জন্য একটি দোকানও খুলেছিলেন, তবে সেটি এখন নেই। নগরীর একমাত্র পাঁচতারা হোটেল রেডিসন ব্লু’র প্রবেশপথের বিপরীত পাশে তিনি ইট অ্যান্ড ট্রিট নামে একটি চটপটির দোকান খুললেও কয়েক মাসের মধ্যে সেটিও বন্ধ করে দেন।

এভাবে বিভিন্ন স্থানে বারবার দোকান খোলা ও বন্ধ করার কারণ জানতে চাইলে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। তারা জানান, নাজমি নওরোজ লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে ব্যাংক থেকে অধিক হারে ঋণ বরাদ্দের জন্য এই কৌশল গ্রহণ করেন। অর্থের উৎস গোপন করার জন্য তিনি বিভিন্ন প্রক্রিয়া ব্যবহার করেন, যেমন—একটি ব্যাংক হিসাব থেকে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, বিদেশে অর্থ পাচার, ট্রাভেলার্স চেকের মাধ্যমে রূপান্তর, এবং একটি ব্যাংক হিসাব থেকে অন্যান্য শাখায় বিভিন্ন নামে অর্থ সরানোর কৌশল।

নাজমি নওরোজ, যদিও রেস্তোরাঁ ব্যবসায় আয় বৃদ্ধির চেষ্টা করছেন, তবুও তিনি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরের জন্য নাম পরিবর্তন এবং শাখা বৃদ্ধি করার কূটকৌশলের আশ্রয় নেন। ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, একটি ভাতের হোটেল ও একটি চটপটির দোকানে বিক্রি-বাট্টা কত হতে পারে, তবে নাজমি নওরোজের বিলাসী জীবনযাপন এই দুইটি দোকানের আয় থেকে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তার ব্যক্তিগত জীবনযাত্রা জানান দেয় যে, তার কাছে একটি টয়োটা ক্রাউন সেডান গাড়ি রয়েছে এবং নগরীর অভিজাত এলাকা নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটিতে দুটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এছাড়াও, তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে লন্ডন ও কানাডায় পড়াশোনা করছেন।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক প্রধান (উত্তর) মো. হাফিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, “নাজমি নওরোজের বিরুদ্ধে আমরা আদালতে মামলা করেছি। ঋণের টাকা আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত আছে।”

সূত্র: আমাদের সময়

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

চটপটির দোকানে ব্যাংকের ঋণ ২৩৪ কোটি টাকা, এস আলম জড়িত

Update Time : ১০:৪৪:০২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৪

চট্টগ্রামে অবস্থিত নওরোজ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তাদের একটি চটপটির দোকান ও দুটি রেস্তোরাঁ দেখিয়ে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৩টি শাখা থেকে ২৩৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক নাজমি নওরোজ।

এই ঋণ নেওয়ার অন্যতম প্রতিষ্ঠান ‘ইট অ্যান্ড ট্রিট’ নামে চটপটির দোকানটি চট্টগ্রামের আসকার দিঘির পাড়ে অবস্থিত। তার পাশেই রয়েছে ‘ফিউশন ইটস’ নামের একটি রেস্তোরাঁ এবং আরেকটি রেস্তোরাঁ ‘লা এরিস্টোক্রেসি’ বেশ কয়েকবার স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমানে আগ্রাবাদ এলাকায় চালু রয়েছে।

তবে এত বড় পরিমাণ ঋণ নেওয়া সম্ভব হয়েছে ব্যাংক মালিকপক্ষের বিশেষ আগ্রহের কারণে। জানা গেছে, ঋণ শোধ না করেও বিলাসবহুল জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছেন নওরোজ, এবং ব্যাংকের কর্মকর্তাদের খুশি রাখতে নিয়মিতভাবে ‘উপহার’ দিয়েছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঋণ খেলাপি না দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঋণগুলো অশ্রেণিবদ্ধ (আনক্লাসিফায়েড) করে রেখেছে, যা ঋণ পরিশোধের চাপ থেকে তাকে রেহাই দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লা এরিস্টোক্রেসি রেস্তোরাঁটির নামে ২ কোটি টাকার ঋণসীমা থাকলেও নাজমি নওরোজ উত্তোলন করেছেন ৭০ কোটি টাকা, যা সুদ-আসলে ১১৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই টাকা তিনি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আসকার দিঘির পাড়ের মহিলা শাখা থেকে গ্রহণ করেছেন। একই প্রতিষ্ঠানের নামে নগরীর প্রবর্তক মোড়ের ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক শাখা থেকে তিনি ৫৪ কোটি টাকা ঋণ নেন, যা সুদে-আসলে ৯০ কোটি ৪৫ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। এর বাইরে, ব্যাংকটির চকবাজার শাখা থেকে ২৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, তবে নাজমি নওরোজ দাবি করেছেন যে চকবাজার শাখার পুরো টাকা এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যাংকটির মালিক সাইফুল আলম মাসুদ নিয়ে নিয়েছেন।

২০১১ সাল থেকে আসকার দিঘির পাড়ের মহিলা শাখার মাধ্যমে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে নাজমি নওরোজের লেনদেন শুরু হয়। বর্তমানে এই ঋণের পরিমাণ সুদসহ ১১৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ব্যাংকের চাপাচাপিতে ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন, কিন্তু ঋণের টাকা এখনও অশ্রেণিবদ্ধ (আনক্লাসিফায়েড) তালিকায় রয়েছে।

ব্যাংক সূত্র জানায়, মালিকপক্ষ চায়নি বলে নাজমি নওরোজকে ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি, ফলে ঋণটি অশ্রেণিবদ্ধ রাখা হয়েছে। তবে গত আগস্ট মাসে অবশেষে তাকে ঋণ খেলাপি হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং পাওনা আদায়ের জন্য মামলা করা হয়।

ব্যাংক সূত্র জানায়, নাজমি নওরোজ ব্যাংক থেকে যে টাকা উত্তোলন করেন, সেটি বছর শেষে পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে কোনো কথা বলেনি। তবে ব্যাংকের টাকা ফেরত না পাওয়ার কারণে শাস্তি হিসেবে একাধিক কর্মকর্তার পদোন্নতি আটকে দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, নাজমি নওরোজ ব্যাংকের কিস্তি জমা দেন না, তবে মাঝে মধ্যে উপহার নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাছে আসেন। কর্মকর্তারা এসব উপহার গ্রহণ করতে না চাইলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের ধমকাতেন।

নাজমি নওরোজ দাবি করেন, “আমি যে পরিমাণ সম্পদ ব্যাংকে জামানত দিয়েছি, তাতে ৪০ কোটি টাকাও পাওয়ার কথা নয়। যা কিছু হয়েছে, সবই মাসুদ সাহেবের ইচ্ছায় হয়েছে। আমি যে আকিজ উদ্দিনকে টাকা দিয়েছি, তার প্রমাণ আমার কাছে আছে। ব্যাংকের নতুন পর্ষদ গত রোববার আমার সঙ্গে বসেছিল, এবং আমি তাদের এসব জানিয়েছি।

ব্যাংকের এত টাকার দায় দেনা কে পরিশোধ করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমি নওরোজ বলেন, “কেন? মাসুদ সাহেব শোধ করবেন?” তিনি উল্টো প্রশ্ন করেন, “জামানত ছাড়া আমি এত বিপুল পরিমাণ টাকা কীভাবে তুলতে পারলাম? পারলাম ওই ব্যাংকের মালিক মাসুদ সাহেবের ইচ্ছায়।”

ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ও তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আকিজ উদ্দিনের বিশেষ আগ্রহের কারণে নাজমি নওরোজ সামান্য চটপটির দোকান ও রেস্তোরাঁর নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে উত্তোলনের সুযোগ পেয়েছেন।

নাজমি নওরোজের কাছে চটপটির দোকান ও রেস্তোরাঁর বার্ষিক আয়, ব্যক্তিগত গাড়ির দাম এবং বিদেশে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান।

তিনি ২০১২ সালে ৮১, শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ রোডে লা এরিস্টোক্রেসি নামে একটি রেস্তোরাঁর ব্যবসা শুরু করেন, যেখানে প্রায় ১০০ জনের বসার ব্যবস্থা ছিল। ২০২০ সালে, হঠাৎ লা এরিস্টোক্রেসি নামের রেস্তোরাঁটি সেখান থেকে সরিয়ে প্রথমে শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ রোডের কর্ণফুলী টাওয়ার (এস আলম টাওয়ার) এবং পরে নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার ১০৫ হোসাইন চেম্বারের নিচতলায় স্থানান্তর করা হয়। লা এরিস্টোক্রেসির নতুন নাম দেওয়া হয় ফিউশন ইট।

তিনি দামপাড়া পুলিশ লাইনের কাছে কেক বিক্রির জন্য একটি দোকানও খুলেছিলেন, তবে সেটি এখন নেই। নগরীর একমাত্র পাঁচতারা হোটেল রেডিসন ব্লু’র প্রবেশপথের বিপরীত পাশে তিনি ইট অ্যান্ড ট্রিট নামে একটি চটপটির দোকান খুললেও কয়েক মাসের মধ্যে সেটিও বন্ধ করে দেন।

এভাবে বিভিন্ন স্থানে বারবার দোকান খোলা ও বন্ধ করার কারণ জানতে চাইলে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। তারা জানান, নাজমি নওরোজ লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে ব্যাংক থেকে অধিক হারে ঋণ বরাদ্দের জন্য এই কৌশল গ্রহণ করেন। অর্থের উৎস গোপন করার জন্য তিনি বিভিন্ন প্রক্রিয়া ব্যবহার করেন, যেমন—একটি ব্যাংক হিসাব থেকে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, বিদেশে অর্থ পাচার, ট্রাভেলার্স চেকের মাধ্যমে রূপান্তর, এবং একটি ব্যাংক হিসাব থেকে অন্যান্য শাখায় বিভিন্ন নামে অর্থ সরানোর কৌশল।

নাজমি নওরোজ, যদিও রেস্তোরাঁ ব্যবসায় আয় বৃদ্ধির চেষ্টা করছেন, তবুও তিনি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরের জন্য নাম পরিবর্তন এবং শাখা বৃদ্ধি করার কূটকৌশলের আশ্রয় নেন। ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, একটি ভাতের হোটেল ও একটি চটপটির দোকানে বিক্রি-বাট্টা কত হতে পারে, তবে নাজমি নওরোজের বিলাসী জীবনযাপন এই দুইটি দোকানের আয় থেকে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তার ব্যক্তিগত জীবনযাত্রা জানান দেয় যে, তার কাছে একটি টয়োটা ক্রাউন সেডান গাড়ি রয়েছে এবং নগরীর অভিজাত এলাকা নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটিতে দুটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এছাড়াও, তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে লন্ডন ও কানাডায় পড়াশোনা করছেন।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক প্রধান (উত্তর) মো. হাফিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, “নাজমি নওরোজের বিরুদ্ধে আমরা আদালতে মামলা করেছি। ঋণের টাকা আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত আছে।”

সূত্র: আমাদের সময়