সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিয়ন্ত্রণহীন বাজারের পেছনে কি রহস্য রয়েছে?

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৫:৩২:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ অক্টোবর ২০২৪
  • / ২১৭ Time View

manabzamin

গত এক মাসে প্রায় সব ধরনের চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে, ফার্মের মুরগির ডিমের মূল্য ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। খোলা পামঅয়েল এবং সুপার তেলের দামও ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে পিয়াজ ও রসুনের দাম। এছাড়া, শাকসবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হলেও, বাজারে সেই মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলেন, এই মূল্য বৃদ্ধির পেছনে কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। তারা মনে করেন, অসৎ ব্যবসায়ী এবং মধ্যস্থতাকারীদের কারসাজির কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে। ফলে, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ব্যবসায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ভোক্তাদের মধ্যে এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

তারা বলছেন, সরকার পরিবর্তন হলেও বাজারের চিত্র এখনও একই রকম রয়েছে। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বাজার, ফলে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদাসীনতা স্পষ্ট। তাদের মতে, সাধারণ মানুষের কষ্ট কমেনি।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, গত এক মাসে পামঅয়েল সুপারের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বেড়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রতিলিটার দাম ছিল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা, যা এখন বেড়ে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকার মধ্যে পৌঁছেছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের জন্য সরকার ১৬৭ টাকা নির্ধারণ করলেও, এটি বাজারে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে প্রতি লিটারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৪৭ টাকা হলেও, বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকায়।

পণ্যের দাম বৃদ্ধির তালিকায় আটাও যুক্ত হয়েছে। বাজারে খুচরায় প্রতি কেজি খোলা আটা ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর খোলা ময়দার দাম ৬০ টাকা। দুই কেজির প্যাকেট আটার দাম ১১০ টাকা, অথচ গত মাসে এক কেজি আটা ছিল ৩৮ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে। এই হিসাবে, এক মাসে আটার দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকার মধ্যে।

বিশ্ববাজারে গমের দাম গত বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল, তবে সম্প্রতি তা নিম্নমুখী হয়ে ২০২৩ সালের আগস্টে টনপ্রতি ২০৫ ডলারের কিছু বেশি হয়েছে। দেশে আমদানি করা গম আসতে গড়ে দুই মাস সময় লাগে। এ অবস্থায়, আগস্টে বিশ্ববাজারে গমের দাম কমার প্রভাব অক্টোবরের শুরুতে বাজারে পড়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র।

এদিকে, ডিমের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, ফলে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে পণ্যটির দাম। বর্তমানে বাজারে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকায়, যা এক মাস আগে ছিল ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে, ব্রয়লার মুরগির দাম বাজারে প্রতি কেজি ১৯০ টাকা, যদিও সরকার এটির দাম নির্ধারণ করেছে ১৭৯ টাকা ৫৯ পয়সা।

সপ্তাহের ব্যবধানে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ২৯০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে, গত এক মাসে চালের দামও ৩ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। সব ধরনের সবজির সরবরাহ থাকলেও, তাদের দাম এখনও আগের মতো চড়া। বাজারে বিভিন্ন সবজির মূল্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিম, ফুলকপি, পাতাকপি, মুলা, ঢেঁড়স, বেগুন, পটোল, ঝিঙা, করলা, টমেটো, শসা এবং গাজরের দাম বেড়ে গেছে, এবং ৫০ টাকার নিচে প্রায় কোনো সবজিই মিলছে না।

পিয়াজের দাম বর্তমানে ১১০ থেকে ১২০ টাকা, দেশি আদার দাম ৫০০ টাকা, এবং দেশি রসুন ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

ডিমের দাম বৃদ্ধির পেছনে কাদের হাত রয়েছে?

ডিমের দাম বৃদ্ধির জন্য বহুজাতিক কোম্পানি এবং রাজধানীর তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতিকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি এসোসিয়েশন (বিপিএ)। সংগঠনটির সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেন, সারা দেশে ডিমের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে ডিম ও মুরগির দাম সরকার নির্ধারণ করেছে। তবে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কোনো প্রান্তিক খামারিকে দাম নির্ধারণের ওয়ার্কিং গ্রুপ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেনি। তারা শুধুমাত্র কর্পোরেট গ্রুপগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করেছে, যা এই সমস্যার সৃষ্টি করেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, ফিড ও মুরগির বাচ্চার উৎপাদনকারী কোম্পানি এবং তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতি সহ আরো অনেক শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। সুমন হাওলাদার বলেন, যদি ডিম ও মুরগির বাজারে স্বস্তি আনতে পোল্ট্রি ফিড এবং মুরগির বাচ্চার সিন্ডিকেট ভেঙে ডিম-মুরগির উৎপাদন খরচ কমানো যায়, তাহলে বাজার দ্রুত সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে।

বাজার বিশ্লেষকরা যা বলছেন

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তাদের মতে, অসৎ ব্যবসায়ী ও মধ্যস্থতাকারীদের কারসাজির কারণেই মূলত পণ্যমূল্য বাড়ছে। কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন মানবজমিনকে জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে অনেক পণ্যের দাম কমলেও বাংলাদেশের বাজারে তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। বরং, বেশির ভাগ পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, “ব্যবসায়ীদের মতে, পরিবহন চাঁদাবাজি কমেছে। তাহলে কেন এই পরিস্থিতির প্রভাব বাজারে নেই?” তিনি আরও জানান, ২৯টি পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানোর পরও সেই পরিবর্তনের প্রভাব বাজারে প্রতিফলিত হয়নি। আগের মতোই বাজারের কার্যক্রম চলছে।

এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না। ট্যারিফ কমিশন ব্যবসায়ীদের পক্ষে কাজ করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করছে, এবং প্রতিযোগিতা কমিশন কার্যত অকার্যকর। এ ছাড়া, পুলিশ প্রটেকশন না পাওয়ার কারণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে না। এর ফলে, বাজার এখনো নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় রয়েছে, যা ভোক্তাদের জন্য জীবনযাপনকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো যা বলছেন

বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো বর্তমানে দেশে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি করছে। এই উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো এবং তাদের কার্যক্রমের লক্ষ্য সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন (বিপিসি) বাজারে পণ্যের কেনাবেচায় প্রতিযোগিতা উৎসাহিত করতে কাজ করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির সদস্য মো. হাফিজুর রহমান মানবজমিনকে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছে, যা বাজার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি পানির দাম বৃদ্ধির কারণে কমিশন একটি মামলা দায়ের করেছে, যার ফলে বাজারে ইতিমধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। হাফিজুর রহমান জানান, তারা ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে বাজারে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন এবং দ্রব্যমূল্যের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা করছেন।

 ট্যারিফ কমিশনের ভূমিকা

এদিকে, পণ্যের দাম বাড়ানোর জন্য ট্যারিফ কমিশনের কাছে যৌক্তিক কারণ উপস্থাপন করা প্রয়োজন। কোনো কোম্পানি যদি পণ্যের দাম বাড়াতে চায়, তবে তাদের সঠিক যুক্তি ও তথ্য সরবরাহ করতে হবে। অভিযোগ উঠেছে যে, অনেক কোম্পানি ট্যারিফ কমিশনকে অবহিত না করেই আমদানির পণ্যের দাম বৃদ্ধি করছে, যা বাজারে অস্থিরতার সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মইনুল খান মানবজমিনকে জানিয়েছেন, সরকার দ্রব্যমূল্যের বিষয়ে তাদের পরামর্শ নিয়েছে এবং তারা দ্রুত পরিবর্তনের আশাবাদী। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কমিশন বাজার পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

 ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে ব্যবসায়ীরা বন্যার অজুহাত দেখাচ্ছেন, যদিও বাজারে সাধারণত এমন অজুহাতের ভিত্তিতে মূল্য বৃদ্ধির কোনও যৌক্তিকতা নেই।

এছাড়া, তিনি উল্লেখ করেন যে, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, যদিও পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে। এই কারণে, মধ্যস্বত্বভোগীরা পণ্যের সংকট তৈরি করে দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে, যা ভোক্তাদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সার্বিক চিত্র

বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের কার্যক্রম ও পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ভোক্তাদের জীবনে বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারের এই অস্থিরতা মোকাবেলার জন্য সরকার এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। ভোক্তাদের সুরক্ষার জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে, পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভোক্তা অধিকারকে প্রভাবিত করবে।

এছাড়া, বাজারের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হলে, ব্যবসায়ীরা যদি অযৌক্তিক দাম বাড়ানোর প্রবণতা থেকে বিরত থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য পণ্যের দাম সহনীয় হতে পারে।

সূত্রঃমানব জমিন

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

নিয়ন্ত্রণহীন বাজারের পেছনে কি রহস্য রয়েছে?

Update Time : ০৫:৩২:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ অক্টোবর ২০২৪

গত এক মাসে প্রায় সব ধরনের চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে, ফার্মের মুরগির ডিমের মূল্য ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। খোলা পামঅয়েল এবং সুপার তেলের দামও ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে পিয়াজ ও রসুনের দাম। এছাড়া, শাকসবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হলেও, বাজারে সেই মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলেন, এই মূল্য বৃদ্ধির পেছনে কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। তারা মনে করেন, অসৎ ব্যবসায়ী এবং মধ্যস্থতাকারীদের কারসাজির কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে। ফলে, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ব্যবসায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ভোক্তাদের মধ্যে এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

তারা বলছেন, সরকার পরিবর্তন হলেও বাজারের চিত্র এখনও একই রকম রয়েছে। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বাজার, ফলে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদাসীনতা স্পষ্ট। তাদের মতে, সাধারণ মানুষের কষ্ট কমেনি।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, গত এক মাসে পামঅয়েল সুপারের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বেড়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রতিলিটার দাম ছিল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা, যা এখন বেড়ে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকার মধ্যে পৌঁছেছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের জন্য সরকার ১৬৭ টাকা নির্ধারণ করলেও, এটি বাজারে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে প্রতি লিটারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৪৭ টাকা হলেও, বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকায়।

পণ্যের দাম বৃদ্ধির তালিকায় আটাও যুক্ত হয়েছে। বাজারে খুচরায় প্রতি কেজি খোলা আটা ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর খোলা ময়দার দাম ৬০ টাকা। দুই কেজির প্যাকেট আটার দাম ১১০ টাকা, অথচ গত মাসে এক কেজি আটা ছিল ৩৮ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে। এই হিসাবে, এক মাসে আটার দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকার মধ্যে।

বিশ্ববাজারে গমের দাম গত বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল, তবে সম্প্রতি তা নিম্নমুখী হয়ে ২০২৩ সালের আগস্টে টনপ্রতি ২০৫ ডলারের কিছু বেশি হয়েছে। দেশে আমদানি করা গম আসতে গড়ে দুই মাস সময় লাগে। এ অবস্থায়, আগস্টে বিশ্ববাজারে গমের দাম কমার প্রভাব অক্টোবরের শুরুতে বাজারে পড়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র।

এদিকে, ডিমের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, ফলে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে পণ্যটির দাম। বর্তমানে বাজারে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকায়, যা এক মাস আগে ছিল ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে, ব্রয়লার মুরগির দাম বাজারে প্রতি কেজি ১৯০ টাকা, যদিও সরকার এটির দাম নির্ধারণ করেছে ১৭৯ টাকা ৫৯ পয়সা।

সপ্তাহের ব্যবধানে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ২৯০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে, গত এক মাসে চালের দামও ৩ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। সব ধরনের সবজির সরবরাহ থাকলেও, তাদের দাম এখনও আগের মতো চড়া। বাজারে বিভিন্ন সবজির মূল্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিম, ফুলকপি, পাতাকপি, মুলা, ঢেঁড়স, বেগুন, পটোল, ঝিঙা, করলা, টমেটো, শসা এবং গাজরের দাম বেড়ে গেছে, এবং ৫০ টাকার নিচে প্রায় কোনো সবজিই মিলছে না।

পিয়াজের দাম বর্তমানে ১১০ থেকে ১২০ টাকা, দেশি আদার দাম ৫০০ টাকা, এবং দেশি রসুন ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

ডিমের দাম বৃদ্ধির পেছনে কাদের হাত রয়েছে?

ডিমের দাম বৃদ্ধির জন্য বহুজাতিক কোম্পানি এবং রাজধানীর তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতিকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি এসোসিয়েশন (বিপিএ)। সংগঠনটির সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেন, সারা দেশে ডিমের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে ডিম ও মুরগির দাম সরকার নির্ধারণ করেছে। তবে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কোনো প্রান্তিক খামারিকে দাম নির্ধারণের ওয়ার্কিং গ্রুপ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেনি। তারা শুধুমাত্র কর্পোরেট গ্রুপগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করেছে, যা এই সমস্যার সৃষ্টি করেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, ফিড ও মুরগির বাচ্চার উৎপাদনকারী কোম্পানি এবং তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতি সহ আরো অনেক শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। সুমন হাওলাদার বলেন, যদি ডিম ও মুরগির বাজারে স্বস্তি আনতে পোল্ট্রি ফিড এবং মুরগির বাচ্চার সিন্ডিকেট ভেঙে ডিম-মুরগির উৎপাদন খরচ কমানো যায়, তাহলে বাজার দ্রুত সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে।

বাজার বিশ্লেষকরা যা বলছেন

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তাদের মতে, অসৎ ব্যবসায়ী ও মধ্যস্থতাকারীদের কারসাজির কারণেই মূলত পণ্যমূল্য বাড়ছে। কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন মানবজমিনকে জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে অনেক পণ্যের দাম কমলেও বাংলাদেশের বাজারে তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। বরং, বেশির ভাগ পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, “ব্যবসায়ীদের মতে, পরিবহন চাঁদাবাজি কমেছে। তাহলে কেন এই পরিস্থিতির প্রভাব বাজারে নেই?” তিনি আরও জানান, ২৯টি পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানোর পরও সেই পরিবর্তনের প্রভাব বাজারে প্রতিফলিত হয়নি। আগের মতোই বাজারের কার্যক্রম চলছে।

এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না। ট্যারিফ কমিশন ব্যবসায়ীদের পক্ষে কাজ করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করছে, এবং প্রতিযোগিতা কমিশন কার্যত অকার্যকর। এ ছাড়া, পুলিশ প্রটেকশন না পাওয়ার কারণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে না। এর ফলে, বাজার এখনো নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় রয়েছে, যা ভোক্তাদের জন্য জীবনযাপনকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো যা বলছেন

বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো বর্তমানে দেশে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি করছে। এই উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো এবং তাদের কার্যক্রমের লক্ষ্য সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন (বিপিসি) বাজারে পণ্যের কেনাবেচায় প্রতিযোগিতা উৎসাহিত করতে কাজ করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির সদস্য মো. হাফিজুর রহমান মানবজমিনকে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছে, যা বাজার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি পানির দাম বৃদ্ধির কারণে কমিশন একটি মামলা দায়ের করেছে, যার ফলে বাজারে ইতিমধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। হাফিজুর রহমান জানান, তারা ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে বাজারে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন এবং দ্রব্যমূল্যের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা করছেন।

 ট্যারিফ কমিশনের ভূমিকা

এদিকে, পণ্যের দাম বাড়ানোর জন্য ট্যারিফ কমিশনের কাছে যৌক্তিক কারণ উপস্থাপন করা প্রয়োজন। কোনো কোম্পানি যদি পণ্যের দাম বাড়াতে চায়, তবে তাদের সঠিক যুক্তি ও তথ্য সরবরাহ করতে হবে। অভিযোগ উঠেছে যে, অনেক কোম্পানি ট্যারিফ কমিশনকে অবহিত না করেই আমদানির পণ্যের দাম বৃদ্ধি করছে, যা বাজারে অস্থিরতার সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মইনুল খান মানবজমিনকে জানিয়েছেন, সরকার দ্রব্যমূল্যের বিষয়ে তাদের পরামর্শ নিয়েছে এবং তারা দ্রুত পরিবর্তনের আশাবাদী। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কমিশন বাজার পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

 ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে ব্যবসায়ীরা বন্যার অজুহাত দেখাচ্ছেন, যদিও বাজারে সাধারণত এমন অজুহাতের ভিত্তিতে মূল্য বৃদ্ধির কোনও যৌক্তিকতা নেই।

এছাড়া, তিনি উল্লেখ করেন যে, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, যদিও পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে। এই কারণে, মধ্যস্বত্বভোগীরা পণ্যের সংকট তৈরি করে দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে, যা ভোক্তাদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সার্বিক চিত্র

বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের কার্যক্রম ও পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ভোক্তাদের জীবনে বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারের এই অস্থিরতা মোকাবেলার জন্য সরকার এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। ভোক্তাদের সুরক্ষার জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে, পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভোক্তা অধিকারকে প্রভাবিত করবে।

এছাড়া, বাজারের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হলে, ব্যবসায়ীরা যদি অযৌক্তিক দাম বাড়ানোর প্রবণতা থেকে বিরত থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য পণ্যের দাম সহনীয় হতে পারে।

সূত্রঃমানব জমিন