সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিবাদী বানাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষকদের ও সাবেক শিক্ষার্থীদের ভূমিকা

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ০৯:৪০:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪
  • / ১৮৫ Time View

University of DHAKA

University of Dhaka

শেখ হাসিনা, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী ছিলেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি ইডেন কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন শেখ হাসিনা।

বর্তমানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ওবায়দুল কাদের। তিনি টানা তৃতীয় মেয়াদে এই পদে রয়েছেন। দলের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দীর্ঘদিন সড়ক যোগাযোগ, পরিবহন এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। हालফলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ছাত্রলীগকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানোর নির্দেশ দেয়ার জন্য ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী সম্পর্কে অভিযোগ রয়েছে যে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কলুষিত করে তোলার কাজেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।

গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। শেখ হাসিনা সরকারের কর্তৃত্ববাদী কাঠামো নির্মাণ ও তা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন রাজনীতিবিদ, আমলা, ও বিচারকদের একটি বড় অংশও, যাদের অনেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাদের মধ্যে কিছু শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

অন্যদিকে, ব্যবসায়ী অলিগার্কদের একটি বড় অংশও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে দলীয়করণের মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন প্রয়াত হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচটি ইমাম)। তার তত্ত্বাবধানে প্রশাসনের ব্যাপক দলীয়করণ ঘটে, যা নির্বাচনে জয়লাভের জন্য একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এইচটি ইমাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে ১৯৫৮ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রয়াত আবুল মাল আব্দুল মুহিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি টানা ১০ বছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ছিলেন। ১৯৫৪ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক এবং পরের বছর একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বানোয়াট পরিসংখ্যান তৈরির ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল)। ২০১৪ সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর তিনি পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। তার মন্ত্রীত্বের সময়ে দেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায়, এবং মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে একটি সিন্ডিকেট জড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকের তথ্য মিথ্যা উপস্থাপনের অভিযোগ ওঠে, যার ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে পরিসংখ্যানগত অমিল বাড়তে থাকে।

এই প্রবণতা আওয়ামী লীগ সরকারের পরবর্তী মেয়াদগুলোতেও অব্যাহত থাকে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সাড়ে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বেশি দেখানো হয়েছিল। ২০১৮ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর মিথ্যা তথ্য তৈরির জন্য পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে ২০১৯ সালে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে নিযুক্ত করেন শেখ হাসিনা। এর পর দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অবস্থা আরও বেশি নাজুক হয়ে পড়ে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ সালে বাণিজ্যে স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৯৬৮ সালে অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থাকে আইনি সুরক্ষা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। ২০১৪ সাল থেকে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। আনিসুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন এবং বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন।

আনিসুল হকের পাশাপাশি, দেশের ইতিহাসে সর্বাধিক মেয়াদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বিরোধী দল এবং বিরুদ্ধ মত দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে দলের কর্মী হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র।

২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত টানা এক দশক শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নুরুল ইসলাম নাহিদ। দেশের শিক্ষা খাতের বর্তমান দুর্দশার পেছনে তাকে অন্যতম দায়ী হিসেবে দেখা হয়। নুরুল ইসলাম নাহিদের মেয়াদে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, এবং চাকরির পরীক্ষায় নিয়মিত প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলের প্রায় পুরো সময় জুড়ে নানা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দলটির ‘ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন’ ছাত্রলীগ। গত দেড় দশকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সব সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন শেখ হাসিনার মাধ্যমে।

বর্তমানে দেশের অর্থনীতি ও আর্থিক খাত মারাত্মক সংকটে রয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুণ্ঠন ও কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। কারসাজির মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অন্তত ১ লাখ কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) দুর্নীতিবাজদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই আর্থিক দুরবস্থার জন্য কয়েকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে দায়ী করা হয়।

২০০৯ সালের ১ মে থেকে ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ড. আতিউর রহমান। তার মেয়াদে দেশের ব্যাংক খাতে বেসিক ব্যাংক লুণ্ঠন এবং সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো একাধিক বড় কেলেঙ্কারি ঘটে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর তিনি গভর্নর পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন। ড. আতিউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

সূত্রঃ বণিক বার্তা

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিবাদী বানাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষকদের ও সাবেক শিক্ষার্থীদের ভূমিকা

Update Time : ০৯:৪০:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪
University of Dhaka

শেখ হাসিনা, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী ছিলেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি ইডেন কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন শেখ হাসিনা।

বর্তমানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ওবায়দুল কাদের। তিনি টানা তৃতীয় মেয়াদে এই পদে রয়েছেন। দলের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দীর্ঘদিন সড়ক যোগাযোগ, পরিবহন এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। हालফলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ছাত্রলীগকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানোর নির্দেশ দেয়ার জন্য ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী সম্পর্কে অভিযোগ রয়েছে যে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কলুষিত করে তোলার কাজেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।

গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। শেখ হাসিনা সরকারের কর্তৃত্ববাদী কাঠামো নির্মাণ ও তা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন রাজনীতিবিদ, আমলা, ও বিচারকদের একটি বড় অংশও, যাদের অনেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাদের মধ্যে কিছু শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

অন্যদিকে, ব্যবসায়ী অলিগার্কদের একটি বড় অংশও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে দলীয়করণের মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন প্রয়াত হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচটি ইমাম)। তার তত্ত্বাবধানে প্রশাসনের ব্যাপক দলীয়করণ ঘটে, যা নির্বাচনে জয়লাভের জন্য একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এইচটি ইমাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে ১৯৫৮ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রয়াত আবুল মাল আব্দুল মুহিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি টানা ১০ বছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ছিলেন। ১৯৫৪ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক এবং পরের বছর একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বানোয়াট পরিসংখ্যান তৈরির ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল)। ২০১৪ সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর তিনি পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। তার মন্ত্রীত্বের সময়ে দেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায়, এবং মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে একটি সিন্ডিকেট জড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকের তথ্য মিথ্যা উপস্থাপনের অভিযোগ ওঠে, যার ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে পরিসংখ্যানগত অমিল বাড়তে থাকে।

এই প্রবণতা আওয়ামী লীগ সরকারের পরবর্তী মেয়াদগুলোতেও অব্যাহত থাকে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সাড়ে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বেশি দেখানো হয়েছিল। ২০১৮ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর মিথ্যা তথ্য তৈরির জন্য পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে ২০১৯ সালে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে নিযুক্ত করেন শেখ হাসিনা। এর পর দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অবস্থা আরও বেশি নাজুক হয়ে পড়ে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ সালে বাণিজ্যে স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৯৬৮ সালে অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থাকে আইনি সুরক্ষা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। ২০১৪ সাল থেকে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। আনিসুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন এবং বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন।

আনিসুল হকের পাশাপাশি, দেশের ইতিহাসে সর্বাধিক মেয়াদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বিরোধী দল এবং বিরুদ্ধ মত দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে দলের কর্মী হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র।

২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত টানা এক দশক শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নুরুল ইসলাম নাহিদ। দেশের শিক্ষা খাতের বর্তমান দুর্দশার পেছনে তাকে অন্যতম দায়ী হিসেবে দেখা হয়। নুরুল ইসলাম নাহিদের মেয়াদে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, এবং চাকরির পরীক্ষায় নিয়মিত প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলের প্রায় পুরো সময় জুড়ে নানা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দলটির ‘ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন’ ছাত্রলীগ। গত দেড় দশকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সব সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন শেখ হাসিনার মাধ্যমে।

বর্তমানে দেশের অর্থনীতি ও আর্থিক খাত মারাত্মক সংকটে রয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুণ্ঠন ও কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। কারসাজির মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অন্তত ১ লাখ কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) দুর্নীতিবাজদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই আর্থিক দুরবস্থার জন্য কয়েকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে দায়ী করা হয়।

২০০৯ সালের ১ মে থেকে ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ড. আতিউর রহমান। তার মেয়াদে দেশের ব্যাংক খাতে বেসিক ব্যাংক লুণ্ঠন এবং সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো একাধিক বড় কেলেঙ্কারি ঘটে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর তিনি গভর্নর পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন। ড. আতিউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

সূত্রঃ বণিক বার্তা