সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানের মানসিক অবস্থা বুঝে পাশে থাকুন

সাজেদা আক্তার
  • Update Time : ১০:৪৭:২১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪
  • / ২৩২ Time View

বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানের মানসিক অবস্থা বুঝে পাশে থাকুন

বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানের মানসিক অবস্থা বুঝে পাশে থাকুন

বয়ঃসন্ধিকাল সন্তানের মানসিক বিকাশের একটি সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে সন্তানের মনোযোগ ও আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়, যা বাবা-মায়ের জন্য বাড়তি নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে। বিশেষত, যারা একটু খিটখিটে বা অস্থির স্বভাবের, তাদের সামলাতে বাবা-মাকে আরও ধৈর্য্যশীল হতে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘বয়ঃসন্ধির সময় শরীরে হরমোনের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে, যা ছেলেমেয়েদের মেজাজ ও মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে। এই সময় যৌন হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায় এবং শরীর ধীরে ধীরে যৌবনের দিকে অগ্রসর হয়। ফলে ছেলে-মেয়ে উভয়ের শরীরে ও মনোজগতে পরিবর্তন আসে। এই সময় কিছু নিউরনের সংযোগেও পরিবর্তন হয়, যা মস্তিষ্ক এবং আবেগের ওপর প্রভাব ফেলে।’

বয়ঃসন্ধিতে সন্তানের মানসিক অবস্থা বোঝা ও সহানুভূতিশীল সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা

বয়ঃসন্ধি একটি জটিল মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তনের সময়। এই সময়ে সন্তানের শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে তাদের মেজাজ ও আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয়, যা বাবা-মায়ের জন্য বাড়তি দায়িত্ব সৃষ্টি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বয়ঃসন্ধিকালে সেরোটোনিন নামক এক ধরনের নিউরোহরমোন মেজাজের ওপর প্রভাব ফেলে। যদি এই হরমোন সঠিকভাবে কাজ না করে, তাহলে সন্তানদের মেজাজ খারাপ থাকতে পারে, যার ফলে তারা চিৎকার, হতাশা বা বিরক্তি প্রদর্শন করতে পারে।’

এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের কী করা উচিত? তিনি কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:

১. ভারসাম্যপূর্ণ প্যারেন্টিং অপরিহার্য

সন্তানের মেজাজ পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে বাবা-মা নিজেও রাগান্বিত হতে পারেন। এটি এড়িয়ে চলা জরুরি। সন্তানের আচরণকে শান্তভাবে বোঝার চেষ্টা করা উচিত এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে, অথবা নিজেই মনোযোগ দিয়ে পরিস্থিতি গুছিয়ে নিতে হবে।

সন্তানের কার্যকলাপের দিকে নজর রাখতে হবে, তবে তাকে কিছুটা স্বাধীনতাও দিতে হবে। এর মানে এই নয় যে তাকে পুরো স্বাধীনতা দিয়ে নজরদারি ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হবে। ছোটবেলা থেকে যদি অভিভাবকত্বের ভারসাম্য বজায় রাখা হয়, তাহলে বয়ঃসন্ধির সময় অস্থিরতা কম থাকবে। অনেক সময় সন্তানের সমস্যার পেছনে বাবা-মায়ের মধ্যে সুসম্পর্কের অভাব বা নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে, যা সন্তানের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

২. নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা

যদি সন্তান চিৎকার বা অসন্তোষ প্রকাশ করে, তখন বাবা-মাকে আগে শান্ত থাকতে হবে। উত্তেজনার মুহূর্তে কথা না বাড়িয়ে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হলে সন্তানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করা উচিত, কী ঘটেছে বা তার কী সমস্যা হচ্ছে। বাবা-মা যদি সন্তানের পাশে থেকে তাকে নির্ভরতার অনুভূতি দিতে পারেন, তবে সন্তান তার সমস্যা নিয়ে সহজেই তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে, যা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

 ৩. নিজেকে সন্তানের জায়গায় কল্পনা করা

বাবা-মা হিসেবে আপনিও এক সময় এই বয়স পার করেছেন, তাই সন্তানের মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা উচিত। কখনো কখনো অভিভাবকের কঠোর আচরণ সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূরত্ব তৈরি করে। তবে সন্তানের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা জরুরি যেখানে সে নির্ভয়ে সবকিছু খুলে বলতে পারে।

যদি সন্তান বুঝতে পারে যে, বাবা-মা তার যেকোনো সমস্যায় পাশে থাকবে এবং সহানুভূতিশীল মনোভাব নিয়ে শুনবে, তবে সে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং বয়ঃসন্ধিকালের জটিলতাগুলো আরও সহজভাবে মোকাবিলা করতে পারবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

সাজেদা আক্তার

সাজেদা আক্তার একজন বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী এবং দক্ষ কলামিস্ট, যিনি সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বিডিবো নিউজে, তিনি সমাজ, পরিবার এবং জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে লেখেন। একজন অভিজ্ঞ কলামিস্ট হিসেবে, তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় সমাজিক বিষয়, পারিবারিক গতিশীলতা এবং বিভিন্ন জীবনধারা সম্পর্কিত ভাবনাপ্রসূত বিষয়গুলি নিয়ে লেখেন। সামাজিক প্রবণতাগুলি বিশ্লেষণ ও প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তার দক্ষতা তাকে এই ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্থান দিয়েছে। সাজেদা আক্তারের কাজ শুধু পাঠকদের তথ্য প্রদান করে না, বরং তাদের অনুপ্রাণিতও করে, যা তাকে সাংবাদিকতা এবং সমাজবিজ্ঞানের জগতে সম্মানিত একটি কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানের মানসিক অবস্থা বুঝে পাশে থাকুন

Update Time : ১০:৪৭:২১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪
বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানের মানসিক অবস্থা বুঝে পাশে থাকুন

বয়ঃসন্ধিকাল সন্তানের মানসিক বিকাশের একটি সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে সন্তানের মনোযোগ ও আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়, যা বাবা-মায়ের জন্য বাড়তি নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে। বিশেষত, যারা একটু খিটখিটে বা অস্থির স্বভাবের, তাদের সামলাতে বাবা-মাকে আরও ধৈর্য্যশীল হতে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘বয়ঃসন্ধির সময় শরীরে হরমোনের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে, যা ছেলেমেয়েদের মেজাজ ও মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে। এই সময় যৌন হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায় এবং শরীর ধীরে ধীরে যৌবনের দিকে অগ্রসর হয়। ফলে ছেলে-মেয়ে উভয়ের শরীরে ও মনোজগতে পরিবর্তন আসে। এই সময় কিছু নিউরনের সংযোগেও পরিবর্তন হয়, যা মস্তিষ্ক এবং আবেগের ওপর প্রভাব ফেলে।’

বয়ঃসন্ধিতে সন্তানের মানসিক অবস্থা বোঝা ও সহানুভূতিশীল সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা

বয়ঃসন্ধি একটি জটিল মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তনের সময়। এই সময়ে সন্তানের শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে তাদের মেজাজ ও আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয়, যা বাবা-মায়ের জন্য বাড়তি দায়িত্ব সৃষ্টি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বয়ঃসন্ধিকালে সেরোটোনিন নামক এক ধরনের নিউরোহরমোন মেজাজের ওপর প্রভাব ফেলে। যদি এই হরমোন সঠিকভাবে কাজ না করে, তাহলে সন্তানদের মেজাজ খারাপ থাকতে পারে, যার ফলে তারা চিৎকার, হতাশা বা বিরক্তি প্রদর্শন করতে পারে।’

এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের কী করা উচিত? তিনি কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:

১. ভারসাম্যপূর্ণ প্যারেন্টিং অপরিহার্য

সন্তানের মেজাজ পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে বাবা-মা নিজেও রাগান্বিত হতে পারেন। এটি এড়িয়ে চলা জরুরি। সন্তানের আচরণকে শান্তভাবে বোঝার চেষ্টা করা উচিত এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে, অথবা নিজেই মনোযোগ দিয়ে পরিস্থিতি গুছিয়ে নিতে হবে।

সন্তানের কার্যকলাপের দিকে নজর রাখতে হবে, তবে তাকে কিছুটা স্বাধীনতাও দিতে হবে। এর মানে এই নয় যে তাকে পুরো স্বাধীনতা দিয়ে নজরদারি ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হবে। ছোটবেলা থেকে যদি অভিভাবকত্বের ভারসাম্য বজায় রাখা হয়, তাহলে বয়ঃসন্ধির সময় অস্থিরতা কম থাকবে। অনেক সময় সন্তানের সমস্যার পেছনে বাবা-মায়ের মধ্যে সুসম্পর্কের অভাব বা নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে, যা সন্তানের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

২. নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা

যদি সন্তান চিৎকার বা অসন্তোষ প্রকাশ করে, তখন বাবা-মাকে আগে শান্ত থাকতে হবে। উত্তেজনার মুহূর্তে কথা না বাড়িয়ে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হলে সন্তানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করা উচিত, কী ঘটেছে বা তার কী সমস্যা হচ্ছে। বাবা-মা যদি সন্তানের পাশে থেকে তাকে নির্ভরতার অনুভূতি দিতে পারেন, তবে সন্তান তার সমস্যা নিয়ে সহজেই তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে, যা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

 ৩. নিজেকে সন্তানের জায়গায় কল্পনা করা

বাবা-মা হিসেবে আপনিও এক সময় এই বয়স পার করেছেন, তাই সন্তানের মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা উচিত। কখনো কখনো অভিভাবকের কঠোর আচরণ সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূরত্ব তৈরি করে। তবে সন্তানের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা জরুরি যেখানে সে নির্ভয়ে সবকিছু খুলে বলতে পারে।

যদি সন্তান বুঝতে পারে যে, বাবা-মা তার যেকোনো সমস্যায় পাশে থাকবে এবং সহানুভূতিশীল মনোভাব নিয়ে শুনবে, তবে সে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং বয়ঃসন্ধিকালের জটিলতাগুলো আরও সহজভাবে মোকাবিলা করতে পারবে।