সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আয়নাঘর পরিদর্শনের ক্ষমতা পেল গুমের তদন্ত কমিশন

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৫২:১৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪
  • / ২৩০ Time View

প্রতীকী ছবি আয়না ঘর

প্রতীকী ছবি আয়না ঘর

বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধানে এবং এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে গঠিত তদন্ত কমিশনকে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা। এ ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে যেকোনো স্থানে, এমনকি বিতর্কিত ‘আয়নাঘর’ সহ যেসব স্থানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের আটকে রাখা হয়েছিল, সেসব স্থান পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তলব ও জিজ্ঞাসাবাদ করার ক্ষমতা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রোববার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত ক্ষমতা নিশ্চিত করেছে। কমিশনকে ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

২৭ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ঘটে যাওয়া জোরপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো তদন্ত করাই এই কমিশনের মূল দায়িত্ব। রবিবার জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপনে কমিশনের কার্যপরিধি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আগের প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হলেও কমিশনের সদস্যদের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

কমিশনের কার্যপরিধি:

প্রজ্ঞাপনে কমিশনের কার্যপরিধি নিম্নরূপে নির্ধারণ করা হয়েছে:

১. ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বলপূর্বক গুমের ঘটনা এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান করা।

২. গুমের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা।

৩. গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের অবহিত করা।

৪. অন্য কোনো সংস্থার পরিচালিত গুমের তদন্ত থেকে প্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহ।

৫. গুম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের সুপারিশ প্রদান।

কমিশনের সদস্যরা:

তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে রয়েছেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। অন্যান্য সদস্যরা হলেন: অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, মানবাধিকার কর্মী নূর খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাবিলা ইদ্রিস, এবং মানবাধিকার কর্মী সাজ্জাদ হোসেন।

এই কমিশনকে গঠিত করা হয়েছে কমিশনস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্টের ৩ ধারার ক্ষমতাবলে। কমিশনকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বাহিনী ও সংস্থার সহায়তায় গুমের তদন্ত কার্য সম্পাদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।

গুমের ঘটনা অনুসন্ধান ও প্রতিরোধের পদক্ষেপ:

গুমের ঘটনা অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে কমিশনের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনকে শুধু গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান করাই নয়, বরং এই ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, সংস্থা, কিংবা প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তাদের অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে কমিশনকে সুপারিশ প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে। গুমের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কমিশন সুপারিশ করবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা যায় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।

তাছাড়া, কমিশনকে বলপূর্বক গুম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের সুপারিশও দিতে বলা হয়েছে। আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে এই অপরাধের মূল কারণগুলো দূর করা এবং আইনের ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করা হবে। বর্তমান আইন কতটা কার্যকর এবং কীভাবে তা আরও শক্তিশালী করা যায়, সেই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে কমিশন সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। বিশেষ করে, গুমের ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে, সেজন্য আইনি কাঠামোর শক্তিশালীকরণ, সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা, এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারব্যবস্থা চালু করার বিষয়গুলো নিয়ে কমিশন কাজ করবে।

এছাড়াও, কমিশন এমন আইন প্রস্তাব করবে, যা বলপূর্বক গুমের শিকারদের পরিবারকে যথাযথ ন্যায়বিচার প্রদানের পাশাপাশি, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। আইন সংস্কারের মাধ্যমে শুধু বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি নয়, বরং গুমের ঘটনা যাতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসন্ধান করা যায় এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সঠিক বিচার নিশ্চিত করা যায়, সেটাও এই কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এই পদক্ষেপগুলো গুমের মতো মারাত্মক অপরাধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আইনগত ও নৈতিক ভিত্তি তৈরির উদ্দেশ্যে প্রণীত হবে, যা মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি নিরাপদ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আয়নাঘর পরিদর্শনের ক্ষমতা পেল গুমের তদন্ত কমিশন

Update Time : ১০:৫২:১৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪
প্রতীকী ছবি আয়না ঘর

বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধানে এবং এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে গঠিত তদন্ত কমিশনকে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা। এ ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে যেকোনো স্থানে, এমনকি বিতর্কিত ‘আয়নাঘর’ সহ যেসব স্থানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের আটকে রাখা হয়েছিল, সেসব স্থান পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তলব ও জিজ্ঞাসাবাদ করার ক্ষমতা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রোববার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত ক্ষমতা নিশ্চিত করেছে। কমিশনকে ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

২৭ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ঘটে যাওয়া জোরপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো তদন্ত করাই এই কমিশনের মূল দায়িত্ব। রবিবার জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপনে কমিশনের কার্যপরিধি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আগের প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হলেও কমিশনের সদস্যদের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

কমিশনের কার্যপরিধি:

প্রজ্ঞাপনে কমিশনের কার্যপরিধি নিম্নরূপে নির্ধারণ করা হয়েছে:

১. ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বলপূর্বক গুমের ঘটনা এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান করা।

২. গুমের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা।

৩. গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের অবহিত করা।

৪. অন্য কোনো সংস্থার পরিচালিত গুমের তদন্ত থেকে প্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহ।

৫. গুম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের সুপারিশ প্রদান।

কমিশনের সদস্যরা:

তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে রয়েছেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। অন্যান্য সদস্যরা হলেন: অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, মানবাধিকার কর্মী নূর খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাবিলা ইদ্রিস, এবং মানবাধিকার কর্মী সাজ্জাদ হোসেন।

এই কমিশনকে গঠিত করা হয়েছে কমিশনস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্টের ৩ ধারার ক্ষমতাবলে। কমিশনকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বাহিনী ও সংস্থার সহায়তায় গুমের তদন্ত কার্য সম্পাদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।

গুমের ঘটনা অনুসন্ধান ও প্রতিরোধের পদক্ষেপ:

গুমের ঘটনা অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে কমিশনের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনকে শুধু গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান করাই নয়, বরং এই ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, সংস্থা, কিংবা প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তাদের অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে কমিশনকে সুপারিশ প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে। গুমের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কমিশন সুপারিশ করবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা যায় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।

তাছাড়া, কমিশনকে বলপূর্বক গুম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের সুপারিশও দিতে বলা হয়েছে। আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে এই অপরাধের মূল কারণগুলো দূর করা এবং আইনের ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করা হবে। বর্তমান আইন কতটা কার্যকর এবং কীভাবে তা আরও শক্তিশালী করা যায়, সেই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে কমিশন সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। বিশেষ করে, গুমের ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে, সেজন্য আইনি কাঠামোর শক্তিশালীকরণ, সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা, এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারব্যবস্থা চালু করার বিষয়গুলো নিয়ে কমিশন কাজ করবে।

এছাড়াও, কমিশন এমন আইন প্রস্তাব করবে, যা বলপূর্বক গুমের শিকারদের পরিবারকে যথাযথ ন্যায়বিচার প্রদানের পাশাপাশি, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। আইন সংস্কারের মাধ্যমে শুধু বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি নয়, বরং গুমের ঘটনা যাতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসন্ধান করা যায় এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সঠিক বিচার নিশ্চিত করা যায়, সেটাও এই কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এই পদক্ষেপগুলো গুমের মতো মারাত্মক অপরাধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আইনগত ও নৈতিক ভিত্তি তৈরির উদ্দেশ্যে প্রণীত হবে, যা মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি নিরাপদ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।