বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে সজীব ওয়াজেদ জয়ের অদৃশ্য ভূমিকা
- Update Time : ১২:৪০:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪
- / ২২৩ Time View

তিন মাস আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের কক্ষে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে একটি জরুরি সভা চলছিল। ওই সভাটি ডাকা হয়েছিল ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স নিয়ে আলোচনার জন্য। বৈঠকের সময় হঠাৎ এক নির্বাহী পরিচালকের (ইডি) মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। গভর্নর জানতে চান, ‘কে ফোন করেছে?’ নির্বাহী পরিচালক জবাব দেন, ‘সজীব ওয়াজেদ জয়।’ এই উত্তরে উপস্থিত কর্মকর্তারা একে অপরের দিকে তাকাতে শুরু করেন। এরপর নির্বাহী পরিচালক ফোন রিসিভ করে সভাকক্ষ ত্যাগ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এই ধরনের ঘটনা নতুন কিছু ছিল না। কেনাকাটা, নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান, বিতর্কিত শিল্প গোষ্ঠীর খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বড় অংকের ঋণ অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতেন শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। কখনো সরাসরি গভর্নরকে ফোন করে নির্দেশনা দিতেন তিনি, আবার কখনো ডেপুটি গভর্নর বা নির্বাহী পরিচালকদের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করতেন। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মাধ্যমেও জয়ের হস্তক্ষেপের নজির ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, জয়ের নির্দেশনা সাধারণত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আসত। তিনি হোয়াটসঅ্যাপ, স্কাইপের মতো অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন, ফলে নির্দেশনার কোনো লিখিত প্রমাণ থাকত না। ড. আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি গভর্নর থাকাকালীন নিজে থেকেই প্রতি মাসে জয়ের কাছে কর্মতৎপরতার প্রতিবেদন পাঠাতেন, এবং গভর্নরের পদ শেষে অর্থমন্ত্রী হওয়ার লোভও তার ছিল।
গত দেড় দশকে বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যার কিছু অংশ এসেছে বিশ্বব্যাংক থেকে, তবে বেশিরভাগ ব্যয় হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে। সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার কেনার ক্ষেত্রে ভেন্ডর নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও জয়ের হস্তক্ষেপ থাকত।
২০০৯ সালের ১ মে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ড. আতিউর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। প্রথম মেয়াদ শেষ হলে ২০১২ সালে শেখ হাসিনার সরকার তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে পুনর্নিয়োগ দেয়। তবে ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর সমালোচনার মুখে আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন।
আতিউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, রিজার্ভ চুরির বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে না জানালেও তিনি সজীব ওয়াজেদ জয়কে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। জয় পরামর্শ দিয়েছিলেন ভারতীয় নাগরিক রাকেশ আস্তানার প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়ে রিজার্ভ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে। তবে সেই সময় তেমন কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, বরং তথ্যপ্রমাণ ধ্বংসের অভিযোগ ওঠে।
আতিউর রহমানের সময়ে ২০১৩ সালে একসঙ্গে নয়টি বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। এসব ব্যাংকের মধ্যে ফারমার্স ব্যাংক (যার নাম পরে পদ্মা ব্যাংক হয়), মেঘনা, মিডল্যান্ড, মধুমতি, এনআরবি, এনআরবি কমার্শিয়াল, এনআরবি গ্লোবাল (পরে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক), সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক ছিল। লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতসহ প্রভাবশালীরা জোর তদবির করেন। তবে সবচেয়ে বেশি চাপ আসে সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যাংক লাইসেন্সের বিপক্ষে অনেক কর্মকর্তা থাকলেও আতিউর রহমান তাদের পক্ষ সমর্থন করেননি। তিনি দলীয় সমাবেশেও সক্রিয় ছিলেন, যার ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা অনিয়ম ও দুর্নীতির দিকে ঝুঁকেছিলেন। তার সময়ে বেসিক ব্যাংক লুট, সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি, জনতা ব্যাংকে বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও ক্রিসেন্ট কেলেঙ্কারির মতো বড় দুর্নীতির ঘটনা ঘটে।
ড. আতিউর রহমান তার মন্তব্যে বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের কিংবা মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকে কিছু চাপ ছিল, তবে তিনি চেষ্টা করেছিলেন সেই চাপ মোকাবিলা করতে। তিনি উল্লেখ করেন যে, তিনি নতুন ব্যাংক অনুমোদনের প্রয়োজন নেই বলেছিলেন, কিন্তু অর্থমন্ত্রী তখন রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক অনুমোদন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এছাড়া, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক দুই আইনে চলার বিষয়ে তার আপত্তি থাকলেও তার পরামর্শ উপেক্ষা করা হয়েছিল। তিনি জানান, যখন তিনি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছিলেন না এবং প্রকাশ্যে সমালোচনার মুখে পড়েন, তখন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। তবে তিনি বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা তার পরিবারের কাছ থেকে কোনো অন্যায় চাপ অনুভব করেননি।
আতিউর রহমানের পদত্যাগের পর ফজলে কবির বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান। তার সময়ে ২০১৮ সালে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ‘নগদ’ চালু হয়, যদিও সেবাটি চালুর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়নি। পরে নগদের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, এবং সজীব ওয়াজেদ জয়কে নগদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা যায়। ফজলে কবিরও স্বীকার করেছেন যে, নগদের লাইসেন্স ইস্যুতে সজীব ওয়াজেদ জয় তার সঙ্গে ভার্চুয়ালি কথা বলেছেন।
২০১৬ সালের পর থেকে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক, যেমন ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক এস আলম গ্রুপের দখলে যায়। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আখতারুজ্জামান বাবুর পরিবার ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) এবং সালমান এফ রহমান আইএফআইসি ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ নেন। এভাবে, অন্তত দুই ডজন বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদে পরিবারতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
ফজলে কবিরের পর ২০২২ সালে গভর্নর হিসেবে আব্দুর রউফ তালুকদার নিয়োগ পান, তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি পলাতক হন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে তিনি একমাত্র গভর্নর, যিনি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পালিয়ে গেছেন।
গত জুন মাসের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে ‘নগদ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি’র লাইসেন্স ইস্যু করে। তবে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সজীব ওয়াজেদ জয়ের হস্তক্ষেপ ছিল বলে সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার রাজনৈতিক কর্মীর মতোই সরকারের নির্দেশনা অনুসারে কাজ করতেন এবং সজীব ওয়াজেদ জয়ের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। নগদ ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স অনুমোদনেও জয়ের ভূমিকা ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. আহসান এইচ মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি ১১টি বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেন এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’-এর ওপর প্রশাসক নিয়োগ দেন। তিনি একই সঙ্গে নগদকে দেয়া ডিজিটাল ব্যাংকিং লাইসেন্সও স্থগিত করেন।
২২ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “নগদের মালিকানা ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত ডিজিটাল অর্থ তৈরি করেছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যাতে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় ও কেউ প্রতারিত না হন, সে জন্য প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে।”
সুত্রঃ বনিক বার্তা











