সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে বিধানসভা নির্বাচন  জম্মু-কাশ্মীরের ভোটের মাঠে জামায়াত, জনসমাগম বিস্ময়কর

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০২:৩১:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪
  • / ২১৪ Time View

Indian Flag

 

ভারতের জাতীয় পতাকাছবি: এএফপি

ভারতের জম্মু–কাশ্মীরের বিধানসভা নির্বাচন পুরোপুরি নতুন মোড় নিয়েছে। বিশেষ মর্যাদা হারানো এই রাজ্যের ভোট এবার নতুন চমকের আশা জাগিয়েছে। ১০ বছর পর বিধানসভার নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যা সর্বশেষ হয়েছিল ২০১৪ সালে। সেই সময় বিজেপি এবং পিডিপি মিলে সরকার গঠন করলেও, ২

০১৮ সালে সেই জোটের পতন ঘটে। এরপর জম্মু–কাশ্মীর শুধু রাজ্যের মর্যাদা হারায়নি, তার বিশেষ সাংবিধানিক অধিকারও খারিজ হয়, যা ছিল সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ।

তুলনামূলকভাবে এবার নির্বাচনের দৃশ্য পুরোপুরি ভিন্ন। ৩৭ বছর পর এই প্রথম জামায়াতে ইসলামির (জেআই) সাবেক নেতারা বিধানসভার ভোটে প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াচ্ছেন। এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং অনেকে মনে করছেন, এটি বিজেপির ক্ষমতা কৌশলের একটি নতুন চাল।

প্রধান আকর্ষণ এবার জামায়াত। তারা সর্বশেষ ১৯৮৭ সালে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, যখন মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্টের (এমইউএফ) ব্যানারে প্রার্থী দেয়। তবে সেই নির্বাচনকে ব্যাপক কারচুপির নিদর্শন বলে গণ্য করা হয়। তখন তারা ১৮.৯ শতাংশ ভোট পেয়েও মাত্র ৪টি আসনে জয়লাভ করে, যেখানে কংগ্রেস ও ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) যথাক্রমে ২৬টি ও ৪০টি আসন জেতে।

জম্মু-কাশ্মীর

 

পরে জামায়াত হুরিয়ত কনফারেন্সের সঙ্গে যোগ দেয় এবং ভোট বর্জনের আহ্বান জানায়। বর্তমানে তারা নিষিদ্ধ দল হিসেবে থেকে গেলেও, এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, যা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

জম্মু–কাশ্মীরের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেছে। এনসি, কংগ্রেস ও পিডিপির প্রভাব খর্ব করতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রথমে জামায়াতে ইসলামির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। শর্ত ছিল, তারা ভারতীয় সংবিধান মেনে নির্বাচনে অংশ নেবে। জামায়াত সম্মতি জানিয়েছিল এবং হুরিয়ত কনফারেন্সের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে আসে। তবে আরএসএসের আপত্তিতে সেই নিষেধাজ্ঞা তোলার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে অংশ নিচ্ছে। প্রথম ধাপে তিন সাবেক নেতা—তালাত মজিদ, সায়ার আহমেদ রেশি ও নাজির আহমেদ মনোনয়ন পেয়েছেন। পাশাপাশি, পিডিপির টিকিট না পাওয়া আজাজ আহমেদকেও তারা সমর্থন জানিয়েছে। এই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ঘিরেই উপত্যকার প্রথম ধাপের ভোটে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

এই নির্বাচনে আরও এক চমক হিসেবে রয়েছেন পরিচিত কারাবন্দী ইঞ্জিনিয়ার রশিদ। দিল্লির তিহার জেলে বন্দী থেকেও লোকসভা ভোটে তিনি সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও এনসির সহসভাপতি ওমর আবদুল্লাহকে পরাজিত করেছিলেন, যা উপত্যকার রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছিল। ২ লাখের বেশি ভোটে জয় লাভ করা রশিদের এই সাফল্য জামায়াত ও অন্যান্য বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে উৎসাহিত করেছে, যারা এতদিন মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে ছিল।

বিজেপি এই নির্বাচনে মুসলিম ভোটারদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে এই প্রার্থীদের টেনে এনেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইঞ্জিনিয়ার রশিদ তাঁর নিজস্ব দল আওয়ামি ইত্তেহাদ পার্টি (এআইপি) প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তাঁর ভাই খুরশিদ আহমেদ শেখ এবার সরকারি চাকরি ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করছেন।

এই কৌশলকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন ওমর আবদুল্লাহ। তিনি শ্রীনগরে গান্দারবাল কেন্দ্রে এক জনসভায় বলেন, বিজেপি উপত্যকায় জাতীয়তাবাদী দলগুলোকে হারাতে জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। বিজেপির লক্ষ্য, জম্মুর হিন্দু সমর্থন এবং উপত্যকার এই শক্তি মিলিয়ে প্রথম হিন্দু মুখ্যমন্ত্রী উপহার দেওয়া।

দক্ষিণ কাশ্মীরের কুলগাম কেন্দ্রে জামায়াতের স্বতন্ত্র প্রার্থী সায়াদ আহমেদ রেশি এনসি-কংগ্রেসের সমর্থিত সিপিএম নেতা এম ওয়াই তারিগামির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। রেশি বলেছেন, এতদিনের প্রচলিত রাজনীতি উপত্যকায় গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে, যা তাঁরা পূরণ করতে চান। বোগাম গ্রামে তাঁর জনসভায় বিপুল জনসমাগম দেখা গেছে, যা নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিজেপি বলছে, যারা অস্ত্র ছেড়ে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরতে চায়, তাদের সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু বিরোধীরা প্রতিটি জনসভায় প্রশ্ন তুলছে, কেন এতদিন রক্তপাত ঘটানোদের সমর্থন দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার? এর পেছনে আসল উদ্দেশ্য কী?

এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে অক্টোবরে, যখন তিন ধাপের নির্বাচন শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ভারতে বিধানসভা নির্বাচন  জম্মু-কাশ্মীরের ভোটের মাঠে জামায়াত, জনসমাগম বিস্ময়কর

Update Time : ০২:৩১:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪

 

ভারতের জাতীয় পতাকাছবি: এএফপি

ভারতের জম্মু–কাশ্মীরের বিধানসভা নির্বাচন পুরোপুরি নতুন মোড় নিয়েছে। বিশেষ মর্যাদা হারানো এই রাজ্যের ভোট এবার নতুন চমকের আশা জাগিয়েছে। ১০ বছর পর বিধানসভার নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যা সর্বশেষ হয়েছিল ২০১৪ সালে। সেই সময় বিজেপি এবং পিডিপি মিলে সরকার গঠন করলেও, ২

০১৮ সালে সেই জোটের পতন ঘটে। এরপর জম্মু–কাশ্মীর শুধু রাজ্যের মর্যাদা হারায়নি, তার বিশেষ সাংবিধানিক অধিকারও খারিজ হয়, যা ছিল সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ।

তুলনামূলকভাবে এবার নির্বাচনের দৃশ্য পুরোপুরি ভিন্ন। ৩৭ বছর পর এই প্রথম জামায়াতে ইসলামির (জেআই) সাবেক নেতারা বিধানসভার ভোটে প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াচ্ছেন। এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং অনেকে মনে করছেন, এটি বিজেপির ক্ষমতা কৌশলের একটি নতুন চাল।

প্রধান আকর্ষণ এবার জামায়াত। তারা সর্বশেষ ১৯৮৭ সালে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, যখন মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্টের (এমইউএফ) ব্যানারে প্রার্থী দেয়। তবে সেই নির্বাচনকে ব্যাপক কারচুপির নিদর্শন বলে গণ্য করা হয়। তখন তারা ১৮.৯ শতাংশ ভোট পেয়েও মাত্র ৪টি আসনে জয়লাভ করে, যেখানে কংগ্রেস ও ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) যথাক্রমে ২৬টি ও ৪০টি আসন জেতে।

জম্মু-কাশ্মীর

 

পরে জামায়াত হুরিয়ত কনফারেন্সের সঙ্গে যোগ দেয় এবং ভোট বর্জনের আহ্বান জানায়। বর্তমানে তারা নিষিদ্ধ দল হিসেবে থেকে গেলেও, এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, যা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

জম্মু–কাশ্মীরের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেছে। এনসি, কংগ্রেস ও পিডিপির প্রভাব খর্ব করতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রথমে জামায়াতে ইসলামির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। শর্ত ছিল, তারা ভারতীয় সংবিধান মেনে নির্বাচনে অংশ নেবে। জামায়াত সম্মতি জানিয়েছিল এবং হুরিয়ত কনফারেন্সের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে আসে। তবে আরএসএসের আপত্তিতে সেই নিষেধাজ্ঞা তোলার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে অংশ নিচ্ছে। প্রথম ধাপে তিন সাবেক নেতা—তালাত মজিদ, সায়ার আহমেদ রেশি ও নাজির আহমেদ মনোনয়ন পেয়েছেন। পাশাপাশি, পিডিপির টিকিট না পাওয়া আজাজ আহমেদকেও তারা সমর্থন জানিয়েছে। এই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ঘিরেই উপত্যকার প্রথম ধাপের ভোটে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

এই নির্বাচনে আরও এক চমক হিসেবে রয়েছেন পরিচিত কারাবন্দী ইঞ্জিনিয়ার রশিদ। দিল্লির তিহার জেলে বন্দী থেকেও লোকসভা ভোটে তিনি সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও এনসির সহসভাপতি ওমর আবদুল্লাহকে পরাজিত করেছিলেন, যা উপত্যকার রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছিল। ২ লাখের বেশি ভোটে জয় লাভ করা রশিদের এই সাফল্য জামায়াত ও অন্যান্য বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে উৎসাহিত করেছে, যারা এতদিন মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে ছিল।

বিজেপি এই নির্বাচনে মুসলিম ভোটারদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে এই প্রার্থীদের টেনে এনেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইঞ্জিনিয়ার রশিদ তাঁর নিজস্ব দল আওয়ামি ইত্তেহাদ পার্টি (এআইপি) প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তাঁর ভাই খুরশিদ আহমেদ শেখ এবার সরকারি চাকরি ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করছেন।

এই কৌশলকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন ওমর আবদুল্লাহ। তিনি শ্রীনগরে গান্দারবাল কেন্দ্রে এক জনসভায় বলেন, বিজেপি উপত্যকায় জাতীয়তাবাদী দলগুলোকে হারাতে জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। বিজেপির লক্ষ্য, জম্মুর হিন্দু সমর্থন এবং উপত্যকার এই শক্তি মিলিয়ে প্রথম হিন্দু মুখ্যমন্ত্রী উপহার দেওয়া।

দক্ষিণ কাশ্মীরের কুলগাম কেন্দ্রে জামায়াতের স্বতন্ত্র প্রার্থী সায়াদ আহমেদ রেশি এনসি-কংগ্রেসের সমর্থিত সিপিএম নেতা এম ওয়াই তারিগামির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। রেশি বলেছেন, এতদিনের প্রচলিত রাজনীতি উপত্যকায় গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে, যা তাঁরা পূরণ করতে চান। বোগাম গ্রামে তাঁর জনসভায় বিপুল জনসমাগম দেখা গেছে, যা নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিজেপি বলছে, যারা অস্ত্র ছেড়ে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরতে চায়, তাদের সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু বিরোধীরা প্রতিটি জনসভায় প্রশ্ন তুলছে, কেন এতদিন রক্তপাত ঘটানোদের সমর্থন দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার? এর পেছনে আসল উদ্দেশ্য কী?

এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে অক্টোবরে, যখন তিন ধাপের নির্বাচন শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হবে।