ব্যাংক খাত সংস্কারে ১৭৫ কোটি ডলারের ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি
- Update Time : ১২:০৮:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪
- / ১৯৬ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংকট উত্তরণের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) মিলে প্রায় ১৭৫ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ প্রদানের পরিকল্পনা করেছে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে এই ঋণ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিশেষত, দেশের দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকগুলোকে পুনর্মূলধন হিসেবে ব্যবহার করে এ খাতকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করা হবে।
এডিবির ১৩০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা
এডিবি তিন ধাপে মোট ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ প্রদানের আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রথম ধাপে ৫০ কোটি, দ্বিতীয় ধাপে আরও ৫০ কোটি এবং শেষ ধাপে ৩০ কোটি ডলার ঋণ প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে। এই ঋণ সহায়তার মাধ্যমে দেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্মূলধনের মাধ্যমে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা চলছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের উন্নতির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বব্যাংকের ৪৫ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাথমিকভাবে ৪০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণের জন্য বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছিল। তবে বর্তমানে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৪৫ কোটি ডলার করার জন্য আলোচনা চলছে। এই অর্থ ব্যাংক খাতের সংস্কারের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের আধুনিকায়ন এবং কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যয় করা হবে। এছাড়া নতুন প্রকল্প গ্রহণের জন্যও এই ঋণ সহায়তা কাজে লাগানো হতে পারে।
আইএমএফের কারিগরি সহায়তা
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকেও কারিগরি সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। আইএমএফের কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আরও কার্যকরভাবে সংস্কার প্রকল্প পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। এতে ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জনের সম্ভাবনা বাড়বে।
নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ৫ আগস্ট থেকে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগের পরপরই ব্যাংকিং খাতের ১০টি ব্যাংক এবং একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। এসব ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে, যেগুলোর ওপর থেকে ২ লাখ কোটি টাকা ঋণ সংক্রান্ত চাপ কমানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
ব্যাংকিং খাতের সংকট
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করছে, যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২৩ সালের জুন মাস শেষে দেশের মোট ঋণের ১২.৫৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অথচ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় এই পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের এই বৃদ্ধি ব্যাংকিং খাতকে সংকটাপন্ন অবস্থায় নিয়ে গেছে।
টাস্কফোর্স গঠনের পরিকল্পনা
নতুন অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাত সংস্কারের জন্য কমিশন গঠনের পরিবর্তে দ্রুত তিনটি টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একটি টাস্কফোর্স খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা, আরেকটি বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্তিশালী করার জন্য, এবং তৃতীয়টি পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কাজে নিয়োজিত হবে। এগুলোতে দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিদেশি সহায়তা ও ভবিষ্যৎ আশা
বিশ্বব্যাংক এবং এডিবির যৌথ ঋণ সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং পুনর্গঠনের উদ্যোগকে আরও কার্যকর করার প্রচেষ্টা চলছে। টাস্কফোর্সগুলোর কার্যকর ভূমিকা এবং আইএমএফের কারিগরি সহায়তা নিয়ে দেশের ব্যাংক খাতকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে করে ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা এবং তারল্য সংকটের সমাধান আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংক্ষেপে, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির এই ঋণ সহায়তা দেশের ব্যাংক খাতকে সংকটমুক্ত করার একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এটি কার্যকর হতে গেলে টাস্কফোর্সগুলোর সফল কার্যক্রম এবং দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন, যাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো আর্থিক স্বচ্ছতা এবং স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যেতে পারে।











