সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা সংস্কার আনতে প্রাথমিকভাবে ৬ কমিশন গঠন, কাজ শুরু অক্টোবরেই

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:২৭:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪
  • / ১৯৪ Time View

DR MUHAMMAD YUNUS 2024

জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

 

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বার্তা ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য জাতীয়ভাবে সংস্কার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। এ লক্ষ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে প্রাথমিকভাবে ৬টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। কমিশনগুলো তাদের কার্যক্রম শুরু করবে আগামী ১ অক্টোবর থেকে।

বুধবার (১১ সেপ্টেম্বর) অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের এক মাস পূর্তি উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে এবং হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটেছে। এই গণঅভ্যুত্থানের বার্তা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করার এক অনন্য সুযোগ এসেছে আমাদের সামনে। এর বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঝুঁকি ঠেকানোর জন্য জাতীয়ভিত্তিক কিছু জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সুশাসনের প্রতিষ্ঠা এ সংস্কারের প্রধান লক্ষ্য।

তিনি বলেন, “আমরা যেহেতু জনগণের ভোটাধিকার ও জনগণের মালিকানায় বিশ্বাস করি, তাই আমাদের সংস্কার ভাবনায় নির্বাচনব্যবস্থার উন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের নামে সংখ্যাগরিষ্ঠতার একাধিপত্য বা দুঃশাসন জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, কিংবা এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর কাছে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টাকে আমরা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে করি না। এই আশঙ্কাগুলো রোধ করতে নির্বাচন কমিশনসহ নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার অত্যন্ত জরুরি বলে আমরা মনে করি।”

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, “নির্বাচনব্যবস্থার সুষ্ঠুতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রশাসন, বিচার প্রশাসন, এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার অপরিহার্য। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার শুধু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রেই নয়, বরং একটি জনমালিকানা ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এছাড়াও, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব ও স্বার্থ নিশ্চিত করতে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্তাকে বাস্তবায়িত করতে সাংবিধানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও আমরা অনুভব করছি।”

এসব বিষয়ে সংস্কার কার্যক্রমের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ছয়টি কমিশন গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “প্রতিটি কমিশনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ছয়জন বিশিষ্ট নাগরিককে দায়িত্ব দিয়েছি, যারা এসব কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এরপর আমরা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখব।”

প্রধান উপদেষ্টা আরও জানান, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ড. বদিউল আলম মজুমদার, পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে সরফরাজ চৌধুরী, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান হবেন ড. ইফতেখারুজ্জামান, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ড. শাহদীন মালিক।

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, “এসব কমিশনের অন্য সদস্যদের নাম কমিশন প্রধানদের সাথে আলোচনা করে ঠিক করা হবে। কমিশনগুলোর আলোচনা ও পরামর্শসভায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, ছাত্র-শ্রমিক-জনতা আন্দোলনের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।”

ড. ইউনূস জানান, “পূর্ণাঙ্গভাবে গঠিত হওয়ার পর কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে তার কাজ আগামী পহেলা অক্টোবর থেকে শুরু করতে পারবে বলে আশা করছি। আমরা ধারণা করছি, কমিশন তাদের কাজ পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করবে। কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার পরবর্তী পর্যায়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে পরামর্শসভার আয়োজন করবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে ছাত্র সমাজ, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও সরকারের প্রতিনিধি নিয়ে তিন থেকে সাত দিনব্যাপী একটি বৃহৎ পরামর্শসভার আয়োজন করা হবে, যেখানে সংস্কার ভাবনার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে। এ পরামর্শসভায় এই রূপরেখা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তারও একটি স্পষ্ট ধারণা প্রদান করা হবে।”

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, “এই আয়োজন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্তা বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র পুনঃনির্মাণের তাগিদের ঐক্যবন্ধনে গোটা জাতিকে শক্তিশালী ও আশাবাদী করে তুলবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।”

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা সংস্কার আনতে প্রাথমিকভাবে ৬ কমিশন গঠন, কাজ শুরু অক্টোবরেই

Update Time : ১০:২৭:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪
জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

 

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বার্তা ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য জাতীয়ভাবে সংস্কার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। এ লক্ষ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে প্রাথমিকভাবে ৬টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। কমিশনগুলো তাদের কার্যক্রম শুরু করবে আগামী ১ অক্টোবর থেকে।

বুধবার (১১ সেপ্টেম্বর) অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের এক মাস পূর্তি উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে এবং হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটেছে। এই গণঅভ্যুত্থানের বার্তা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করার এক অনন্য সুযোগ এসেছে আমাদের সামনে। এর বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঝুঁকি ঠেকানোর জন্য জাতীয়ভিত্তিক কিছু জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সুশাসনের প্রতিষ্ঠা এ সংস্কারের প্রধান লক্ষ্য।

তিনি বলেন, “আমরা যেহেতু জনগণের ভোটাধিকার ও জনগণের মালিকানায় বিশ্বাস করি, তাই আমাদের সংস্কার ভাবনায় নির্বাচনব্যবস্থার উন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের নামে সংখ্যাগরিষ্ঠতার একাধিপত্য বা দুঃশাসন জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, কিংবা এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর কাছে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টাকে আমরা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে করি না। এই আশঙ্কাগুলো রোধ করতে নির্বাচন কমিশনসহ নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার অত্যন্ত জরুরি বলে আমরা মনে করি।”

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, “নির্বাচনব্যবস্থার সুষ্ঠুতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রশাসন, বিচার প্রশাসন, এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার অপরিহার্য। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার শুধু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রেই নয়, বরং একটি জনমালিকানা ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এছাড়াও, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব ও স্বার্থ নিশ্চিত করতে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্তাকে বাস্তবায়িত করতে সাংবিধানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও আমরা অনুভব করছি।”

এসব বিষয়ে সংস্কার কার্যক্রমের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ছয়টি কমিশন গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “প্রতিটি কমিশনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ছয়জন বিশিষ্ট নাগরিককে দায়িত্ব দিয়েছি, যারা এসব কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এরপর আমরা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখব।”

প্রধান উপদেষ্টা আরও জানান, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ড. বদিউল আলম মজুমদার, পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে সরফরাজ চৌধুরী, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান হবেন ড. ইফতেখারুজ্জামান, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ড. শাহদীন মালিক।

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, “এসব কমিশনের অন্য সদস্যদের নাম কমিশন প্রধানদের সাথে আলোচনা করে ঠিক করা হবে। কমিশনগুলোর আলোচনা ও পরামর্শসভায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, ছাত্র-শ্রমিক-জনতা আন্দোলনের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।”

ড. ইউনূস জানান, “পূর্ণাঙ্গভাবে গঠিত হওয়ার পর কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে তার কাজ আগামী পহেলা অক্টোবর থেকে শুরু করতে পারবে বলে আশা করছি। আমরা ধারণা করছি, কমিশন তাদের কাজ পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করবে। কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার পরবর্তী পর্যায়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে পরামর্শসভার আয়োজন করবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে ছাত্র সমাজ, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও সরকারের প্রতিনিধি নিয়ে তিন থেকে সাত দিনব্যাপী একটি বৃহৎ পরামর্শসভার আয়োজন করা হবে, যেখানে সংস্কার ভাবনার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে। এ পরামর্শসভায় এই রূপরেখা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তারও একটি স্পষ্ট ধারণা প্রদান করা হবে।”

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, “এই আয়োজন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্তা বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র পুনঃনির্মাণের তাগিদের ঐক্যবন্ধনে গোটা জাতিকে শক্তিশালী ও আশাবাদী করে তুলবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।”