একটি সুন্দরী প্রতিযোগিতা যেভাবে কুৎসিত হয়ে উঠল
- Update Time : ১২:৫৫:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪
- / ৪০১ Time View

ফিজির পার্ল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পাতে দেশের সেরা সুন্দরী নির্বাচন প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়েছিল। ৩০ আগস্ট রাতে সবকিছু মসৃণভাবেই এগোচ্ছিল। মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা মানশিকা প্রসাদের হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেওয়ার পরপরই তাঁকে বিজয়ী ঘোষণা করে সেরা সুন্দরীর মুকুট পরানো হলো।
কিন্তু বিচারক প্যানেলের একজনের মতে, বিজয়ীর মুকুট পরানোর পরই প্রতিযোগিতার ঘটনাপ্রবাহ অন্যদিকে মোড় নেয় এবং বিষয়গুলো দ্রুতই কুৎসিত হয়ে ওঠে।
আসলে, ঘটনাটি যতটা কুৎসিত হয়েছে তা বললেও কম হবে। কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা গেল, মুকুট ছিনিয়ে নেওয়া, ভিত্তিহীন অভিযোগ আর একজন প্রতিযোগীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা রহস্যময় একজন ব্যক্তির আগমন।
বিজয়ী ঘোষণার দু’দিন পর, আয়োজক সংস্থা মিস ইউনিভার্স ফিজি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সবকিছু ওলট-পালট করে দেয়। এতে জানানো হয়, প্রতিযোগিতায় গুরুতর নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে এবং শিগগিরই সংশোধিত ফল প্রকাশ করা হবে।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মানশিকাকে জানানো হয়, তিনি আর মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবেন না। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন প্রতিযোগিতার রানারআপ নাদিন রবার্টস, যিনি সিডনির বাসিন্দা ও ফিজির নাগরিকত্বধারী মায়ের মেয়ে
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, প্রতিযোগিতায় সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি এবং ভোট কারচুপি হয়েছে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রতিযোগীকে আর্থিক সুবিধা দিতে মানশিকাকে বিজয়ী করা হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় হতবিহ্বল মানশিকা জানান, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কিছুদিনের জন্য বিরতি নেবেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, পুরো ঘটনা সম্পর্কে অনেক কিছু সাধারণ মানুষের জানা নেই।
অন্যদিকে, নতুন বিজয়ী নাদিন রবার্টস নিজের ইনস্টাগ্রামে মিস ইউনিভার্স ফিজিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এ ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব আমাদের সবার ওপর পড়েছে।’
তবে প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই এখনো সন্তুষ্ট নন, কারণ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশিত হয়নি।
যেভাবে কুৎসিত রূপ নেয় প্রতিযোগিতাটি
সাতজন বিচারকের মধ্যে একজন ছিলেন মেলিসা হোয়াইট। তিনি জানান, প্রতিযোগিতা স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। আরেক বিচারক জেনিফার চান বলেন, মানশিকা প্রসাদ স্পষ্টভাবে বিজয়ী ছিলেন এবং তাঁকে ৪-৩ ভোটে সেরা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
তবে চানের মতে, মানশিকা যখন মুকুট পরে মঞ্চে দাঁড়ান, তখন বিচারকেরা বুঝতে পারছিলেন কিছু একটা ভুল হচ্ছে। মঞ্চে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রানারআপ নাদিন রবার্টসকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি ক্ষুব্ধ।
পরদিন মানশিকা বিচারকদের সঙ্গে নৌভ্রমণে যান, যদিও তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বিজয় নিশ্চিত করা হয়নি। সেই ভ্রমণে বিচারক রিরি ফেবরিয়ানি অনুপস্থিত ছিলেন, যিনি লাক্স প্রজেক্টসের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানটি মিস ইউনিভার্স ফিজির লাইসেন্স কিনেছিল।
বিচারক মেলিসা হোয়াইট বলেন, তাঁর কাছে বিষয়টি অদ্ভুত ঠেকেছিল। ফেবরিয়ানি বলেছিলেন যে তাঁর অনেক কাজ করতে হবে এবং বসের সঙ্গে কথা বলতে হবে, এ কারণে তিনি নৌভ্রমণে যাননি। তবে মেলিসা লক্ষ্য করেন, ফেবরিয়ানি নিয়মিতভাবে ফোনে ‘জ্যামি’ নামের একজনের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান ও কথা বলছিলেন।
ফেবরিয়ানি লাক্স প্রজেক্টসের প্রতিনিধি হলেও ভোটের ফলাফল নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি খুশি ছিল না। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, প্রতিযোগিতার লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠানের একটি ভোট থাকা উচিত ছিল এবং আয়োজক গ্র্যান্ট ডোয়ার সেই ভোট গুনতে ব্যর্থ হয়েছেন। লাক্স প্রজেক্টস যদি নাদিনকে ভোট দিত, তাহলে ফলাফল ৪-৪ সমতায় থাকত এবং লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠানের নির্ধারক ভোট নাদিনকে জয়ী করত।
বিচারক জেনিফার চান বলেন, প্রতিযোগিতার কোনো পর্যায়েই তাঁদের অষ্টম বিচারক বা অনুপস্থিত বিচারকের বিষয়ে জানানো হয়নি। তিনি বলেন, ‘এটা কোথাও উল্লেখ ছিল না, এমনকি ওয়েবসাইটেও না। একজন অনুপস্থিত বিচারক কীভাবে ভোট দিতে পারেন?’
মেলিসা হোয়াইট আরও বলেন, তিনি অনুসন্ধান করে দেখেন যে, লাক্স প্রজেক্টসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জ্যামি ম্যাকইন্টায়ার নামে এক অস্ট্রেলিয়ান ব্যবসায়ী যুক্ত ছিলেন। তিনি নাদিনের স্বামী, যাঁর সঙ্গে ২০২২ সাল থেকে তাঁর বৈবাহিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৬ সালে প্রতারণামূলক আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগের কারণে জ্যামির ওপর অস্ট্রেলিয়ায় ব্যবসা করার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
এমন বিতর্ক নতুন কিছু নয়
সুন্দরী প্রতিযোগিতা নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রতিযোগিতাকে ঘিরে নানা রকম নাটকীয়তা এবং বিতর্ক দেখা গেছে। হিলারি লেভি ফ্রিডম্যান, যিনি ‘হেয়ার শি ইজ: দ্য কমপ্লিকেটেড রেইন অব দ্য বিউটি প্যাজেন্ট ইন আমেরিকা’ বইয়ের লেখক, বলেন, ‘সুন্দরী প্রতিযোগিতা সবসময়ই বিতর্কে ভরা থাকে এবং অনেকেই মনে করেন এগুলো পূর্বনির্ধারিত।’ তাঁর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এ ধরনের ঘটনা আরও বেশি নজরে আসছে।
অবশেষে মানশিকা প্রসাদের জন্য বিষয়টি ভালোভাবেই শেষ হলো। গত শুক্রবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক পোস্টে তিনি ঘোষণা দেন, মিস ফিজি ২০২৪-এর মুকুট আবারও তাঁর মাথায় ফিরেছে। ইনস্টাগ্রামে তিনি লেখেন, ‘এটা ছিল এক অবিশ্বাস্য যাত্রা!’
মিস ইউনিভার্স অর্গানাইজেশন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে বিবিসির মতে, ফিজির ঘটনায় সংস্থাটি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট ছিল। সত্য উদঘাটনের পর, সংস্থাটি মানশিকাকে সেরা সুন্দরীর মুকুট ফিরিয়ে দিতে কঠোর পরিশ্রম করেছে।
মুকুট ফিরে পাওয়ায় মানশিকার জন্য যেমন আনন্দ, তেমনি বিচারকদের জন্যও যেন এটি ছিল স্বস্তির বিষয়।











